গত মঙ্গলবার দুপুর ১টায় নিখোঁজ হয় ফুটফুটে জায়হান। চারদিকে খোঁজাখুঁজি, মাইকিং, স্বজনদের আহাজারি, কোনো কিছুতেই সন্ধান মিলছিল না তার। অবশেষে দু-দিন পর, আজ বৃহস্পতিবার ভোরে অবসান ঘটে সব অপেক্ষার। তবে সেই অবসান যে এত নির্মম হবে, তা ভাবেনি কেউ। বাড়ির পাশের প্রতিবেশীর ঘরের পেছনের একটি ময়লার ভাগাড়ে বস্তাবন্দি অবস্থায় পাওয়া যায় জায়হানের নিথর দেহ। হাতুড়ি দিয়ে আঘাত করে তাকে হত্যা করা হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করছে পুলিশ।

নৃশংস এই হত্যাকাণ্ডের চেয়েও বড় ধাক্কাটি এসেছে যখন জানা গেছে খুনিদের পরিচয়। এই ঘটনায় পুলিশ একই পরিবারের পাঁচ সদস্যকে আটক করেছে, যারা আর কেউ নন, জায়হানদের ঘরের ঠিক পাশের প্রতিবেশী এবং সম্পর্কে চাচা-ফুপু।

নিহত জায়হানের মা জোবায়দা আক্তার মুক্তা বিলাপ করতে করতে বলেন, ‘নিখোঁজ হওয়ার দিন প্রতিবেশী নিহা আমাদের ঘরে এসে জিজ্ঞেস করেছিল জায়হান কোথায়। আমার ছেলেকে নিখোঁজ হওয়ার ঠিক আগেই আমি আম খাইয়েছিলাম। নিহা আমাদের ঘরে এসে চা খেতে চেয়েছিল। আমি তাকে চা না দিয়ে ভাত খেতে বলেছিলাম। এরপর আমার ছেলেটা বাইরে খেলতে চলে যায়। আর সেই যে খেলতে গেল, এরপর থেকেই সে নিখোঁজ ছিল। আমি তখনো বুঝতে পারিনি নিহার মনে এত বড় শয়তানি ছিল!’

অভিযুক্তদের শাস্তির দাবিতে এলাকাবাসীর বিক্ষোভ

স্বজনদের দাবি, অভিযুক্ত পরিবারের সঙ্গে তাদের প্রকাশ্য কোনো বিরোধ ছিল না। একসঙ্গে ওঠাবসা, সুখে-দুঃখে পাশে থাকা, সব মিলিয়ে তাদের ওপর ছিল অগাধ বিশ্বাস। বিশ্বাস আর ভালোবাসার এমন নির্মম প্রতিদান দেখে স্তম্ভিত পুরো এলাকা।

ঘটনাটি ঘিরে গ্রামটিতে এখন থমথমে পরিস্থিতি। স্থানীয় এক বাসিন্দা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, একটি ৫ বছরের নিষ্পাপ শিশু কারও কী ক্ষতি করতে পারে? ঘরের পাশের মানুষ যদি এমন রাক্ষস হয়ে ওঠে, তবে আমরা বিশ্বাস করব কাকে?

নিখোঁজের পর পরিবার পটিয়া থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করলে তদন্তে নামে পটিয়া থানা পুলিশ ও জেলা গোয়েন্দা শাখা। এরই মধ্যে পরিবারের কাছে ৩ লাখ টাকা দাবি করে একটি হুমকি সংবলিত চিরকুট ফেলে যায় দুর্বৃত্তরা। টাকা না দিলে শিশুকে মেরে ফেলার হুমকি দেওয়া হয় এবং বাড়ির সামনের একটি পরিত্যক্ত দোকানে টাকা রাখতে বলা হয়। ফেসবুকে বিষয়টি জানাজানি হলে একটি প্রতারক চক্রও ফোন দিয়ে টাকা দাবি করে।

বৃহস্পতিবার বিকেলে এক সংবাদ সম্মেলনে চট্টগ্রামের পুলিশ সুপার (এসপি) মাসুদ আলম বলেন, পুলিশ বেশ কিছু ‘ক্লু’ ধরে কয়েকটি বাড়িতে গোপনে তল্লাশি চালায়। একপর্যায়ে প্রতিবেশী ওই বাড়ির ভেতরে ঠিক একই রকমের একটি প্যাড বা কাগজ পাওয়া যায়, যেটিতে মুক্তিপণের চিরকুট লেখা হয়েছিল। এমনকি সেখানে চিরকুট লেখার খসড়া বা ড্রাফটের একটি অংশও মেলে। এরপরই নিশ্চিত হওয়া যায় যে, এই বাড়ি থেকেই চিরকুটটি লেখা হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, পুলিশ তাৎক্ষণিকভাবে ওই বাড়ির গৃহবধূ, তার ছেলে এবং মেয়ে সাদিয়া আক্তার নেহাকে (নিহা) জিজ্ঞাসাবাদের জন্য থানায় নিয়ে আসে। পরে আটক করা হয় নেহার বাবা ও আরেকজনকেও।

থানায় এনে পাঁচজনকে আলাদাভাবে চিরকুটের লেখাটি লিখতে দেওয়া হলে তরুণী সাদিয়া আক্তার নেহার হাতের লেখার সঙ্গে চিরকুটের লেখার মিল পাওয়া যায়। নিবিড় জিজ্ঞাসাবাদের মুখে একপর্যায়ে নেহা স্বীকার করেন যে, ঘটনাটি তিনি নিজেই ঘটিয়েছেন।

পুলিশ জানায়, নেহা পেশায় চট্টগ্রামের শেভরন হাসপাতালের একজন নার্স। তবে ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষা দেওয়ার জন্য ছুটি নিয়ে তিনি বাড়িতেই ছিলেন। ঘটনার দিন বেলা সাড়ে ১২টা থেকে ১টার দিকে ভাতিজা জায়হানের সাথে ফুটবল খেলছিলেন নেহা। নেহার দাবি, জায়হানের বাবা শাহজাহানের সঙ্গে অতীতে তার কিছু মানসিক দ্বন্দ্ব ছিল এবং শাহজাহান বিভিন্ন সময় তার সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করেছিলেন। সেই ক্ষোভ থেকেই একা পেয়ে তিনি শিশুটিকে ঘরের ভেতরে নিয়ে হাতুড়ি দিয়ে আঘাত করেন।

পুলিশের ধারণা, শাসন করার কথা বললেও মূলত ক্ষোভ থেকেই শিশুটিকে হত্যা করা হয়। হত্যার পর মাত্র এক ঘণ্টার মধ্যে লাশটি দুটি বস্তায় ভরে নিজের ঘরের পেছনের অন্ধকারের মতো স্যাঁতসেঁতে অংশে, টয়লেটের পাশে ময়লা-আবর্জনা ও গর্তের নিচে লুকিয়ে রাখা হয়। পরে নেহার স্বীকারোক্তি অনুযায়ী আজ ভোরে সেখান থেকেই গলিত অবস্থায় শিশুটির মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।

পুলিশ সুপার মাসুদ আলম আরও জানান, হত্যার পর মূল আসামি নেহা মুক্তিপণের নাটক সাজাতে চিরকুট লিখলেও, তার বাবা-মা বিষয়টি পরে জানতে পারেন। তবে মেয়েকে বাঁচাতে তারা পুলিশকে না জানিয়ে উল্টো লাশ ও আলামত গোপন করতে সহযোগিতা করেন। এ কারণে পুরো পরিবারকে এই মামলায় আইনের আওতায় আনা হচ্ছে। লাশ ময়নাতদন্তের জন্য মর্গে পাঠানো হয়েছে এবং মামলা দায়েরের প্রক্রিয়া চলছে।

এদিকে দুপুরের দিকে ব্যানার-প্ল্যাকার্ড হাতে নিয়ে পটিয়া থানা ঘেরাও করে বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করেন স্থানীয় এলাকাবাসী। তারা দোষীদের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি জানান। পরিস্থিতি সামাল দিতে পটিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জিয়াউল হক স্থানীয়দের আশ্বস্ত করে বলেন, ‘বাচ্চাটির মৃত্যু খুবই দুঃখজনক। দ্রুততম সময়ে মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।’

এমএম