শুক্রবার (১৪ আগস্ট) সকালে সিরাজগঞ্জের বেলকুচি উপজেলার দুর্গম চরাঞ্চলের বড়ধুল ইউনিয়নের ক্ষিদ্রচাপিয়া 'হাওয়া ভবন' সংলগ্ন যমুনা নদীর পাড়ে এই বিশাল মানববন্ধনের আয়োজন করা হয়। কর্মসূচিতে সিরাজগঞ্জের বেলকুচি, চৌহালী এবং পাশাপাশি টাঙ্গাইল সদর উপজেলার চরবেল, পুংলি, কাকুয়া, জাঙ্গালিয়া, কলাবাগান, মহেষপুরসহ আশপাশের ২৭টি গ্রামের হাজার হাজার নারী-পুরুষ, বৃদ্ধ ও নৌ-পরিবহন কর্মীরা ব্যানার-ফেস্টুন হাতে অংশ নিয়ে চরম ক্ষোভ ও প্রতিবাদ প্রকাশ করেন।

রাতে সশস্ত্র মহড়া, দিনে প্রকাশ্যে চাঁদা দাবি: আতঙ্কের নৌরুট

মানববন্ধনে অংশ নেওয়া ভুক্তভোগী নৌযান মালিক ও স্থানীয় অধিবাসীরা জানান, সিরাজগঞ্জ-ঢাকা গুরুত্বপূর্ণ এই নৌরুট দিয়ে প্রতিদিন শত শত বাল্কহেড (বালুবাহী নৌযান), মালবাহী ট্রলার, যাত্রী পারাপারের নৌকা ও বিভিন্ন ধরনের ইঞ্জিনচালিত নৌযান চলাচল করে। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে এই রুটটিকে নিজেদের অভয়ারণ্যে পরিণত করেছে একটি কুখ্যাত চাঁদাবাজ ও সন্ত্রাসী চক্র।

বক্তারা অভিযোগ করে বলেন, স্থানীয় চিহ্নিত সন্ত্রাসী সালাম ও তার সহযোগীরা একটি সশস্ত্র বাহিনী গড়ে তুলেছে। দিনের বেলা ও গভীর রাতে তারা আধুনিক নৌযান নিয়ে যমুনা নদীর বিভিন্ন পয়েন্টে সশস্ত্র মহড়া দেয়। এরপর চলাচলরত বাল্কহেড ও নৌযানগুলোর গতিপথ রোধ করে আগ্নেয়াস্ত্র ও দেশীয় অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে মোটা অঙ্কের টাকা চাঁদা দাবি করে।

ভীতি ও নিপীড়নের চিত্র:

চাঁদা দিতে সামান্যতম দ্বিমত বা অস্বীকৃতি জানালেই নৌযানের সুকানি, চালক ও সাধারণ শ্রমিকদের ওপর নেমে আসে অমানবিক নির্যাতন। চাঁদা না দিলে সরাসরি নৌযানের কর্মীদের বেধড়ক মারধর, শারীরিক নির্যাতন, মালামাল লুটপাট এবং ক্ষেত্রবিশেষে নদী থেকে কর্মীদের অপহরণ করে মুক্তিপণ দাবি করা হয়। ফলে বর্তমানে সিরাজগঞ্জ-ঢাকা নৌরুটে নৌযান চালানো চরম ঝুঁকিপূর্ণ ও জীবনপণ ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে।

২৭ গ্রামের রুটি-রুজিতে টান, প্রশাসনিক পদক্ষেপর আকুল আবেদন

যমুনা নদীকে কেন্দ্র করেই চরাঞ্চলের হাজার হাজার পরিবার ও নৌযান শ্রমিকদের জীবিকা নির্বাহ হয়। কিন্তু এই অরাজক পরিস্থিতির কারণে অনেক চালক ও মালিক এখন নদীতে নৌযান নামাতে ভয় পাচ্ছেন। ফলে একদিকে যেমন চরম অর্থনৈতিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন নৌযান ব্যবসায়ীরা, অন্যদিকে চরাঞ্চলের হাজার হাজার পরিবারে খাদ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য পরিবহনেও তৈরি হয়েছে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা।

মানববন্ধনে সভাপতির বক্তব্যে আবু সাইদ বলেন,

"যমুনা নদী কোনো একক ব্যক্তির সম্পত্তি নয়। এটি রাষ্ট্রীয় নৌরুট। অথচ সালাম ও তার বাহিনীর সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের কাছে আজ পুরো নৌরুটের হাজার হাজার নৌযান মালিক-শ্রমিক জিম্মি হয়ে পড়েছে। আমরা দিনের পর দিন মালামাল নিয়ে ভয়ে ভয়ে যাতায়াত করছি। বহু শ্রমিক মার খেয়ে হাসপাতালে দিন কাটাচ্ছেন। প্রশাসন যদি এখনই এদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা না নেয়, তবে আমরা সমস্ত নৌরুট স্তব্ধ করে দিতে বাধ্য হব।"

মানববন্ধনে আরও বক্তব্য রাখেন স্থানীয় সচেতন ব্যক্তিত্ব ও প্রতিনিধি ইউসুফ মোল্লা, কছির উদ্দিন, সুমন এবং বক্কার মোল্লাসহ অন্যান্য চরাঞ্চলবাসী।

বক্তারা একযোগে জানান, এই চাঁদাবাজ ও সন্ত্রাসী বাহিনীর বিরুদ্ধে একাধিকবার স্থানীয়ভাবে প্রতিবাদ করেও কোনো ফল পাওয়া যায়নি। তাদের অপরাধের মাত্রা দিন দিন বেড়েই চলেছে। যদি অবিলম্বে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা এই বাহিনীর মূলহোতা সালাম ও তার সঙ্গীদের গ্রেফতার না করে এবং নৌপথে স্থায়ী নৌ-পুলিশ ফাঁড়ি বা টহল জোরদার না করে, তবে আগামীতে তিন উপজেলার মানুষকে সাথে নিয়ে আরও কঠোর ও বৃহত্তর কর্মসূচি গ্রহণ করা হবে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতি ২৭ গ্রামের স্পষ্ট দাবি

মানববন্ধন থেকে তিন উপজেলার ২৭ গ্রামের হাজার হাজার মানুষের পক্ষ থেকে প্রশাসনের নিকট নিম্নোক্ত প্রধান দাবিগুলো জোরেশোরে তুলে ধরা হয়:

চাঁদাবাজ ও সন্ত্রাসী সালাম বাহিনীর দ্রুত গ্রেফতার: যমুনা নদীজুড়ে গড়ে ওঠা চিহ্নিত চাঁদাবাজ সালাম ও তার সহযোগী সন্ত্রাসীদের অবিলম্বে গ্রেফতার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনতে হবে।

নৌপথে নিয়মিত টহল ও নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ: সিরাজগঞ্জ-ঢাকা নৌরুটে নৌ-পুলিশ ও কোস্টগার্ডের নিয়মিত ভিজিল্যান্স বা টহল জোরদার করতে হবে, যাতে রাতে বা দিনে কোনো সন্ত্রাসী দল নৌযানে হানা দিতে না পারে।

অপহৃতদের উদ্ধার ও নির্যাতন বন্ধ: চাঁদাবাজদের হাত থেকে নৌযান শ্রমিকদের সুরক্ষা দিতে এবং পূর্বের সহিংসতার বিচার বিভাগীয় তদন্ত নিশ্চিত করতে হবে।

ঝুঁকিমুক্ত নৌরুট গঠন: সিরাজগঞ্জ, টাঙ্গাইল ও পার্শ্ববর্তী জেলার নদীপথে বাণিজ্যিক ও সাধারণ মানুষের যাতায়াত নির্বিঘ্ন করতে স্থায়ী নিরাপত্তা চৌকি স্থাপন করতে হবে।

মানববন্ধন শেষে ক্ষুব্ধ চরাঞ্চলবাসী ও নৌযান কর্মীরা নৌপথে নিরাপদ পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে দ্রুততম সময়ের মধ্যে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, নৌ-পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং সিরাজগঞ্জ জেলা প্রশাসনের কঠোর ও সরাসরি হস্তক্ষেপ কামনা করেন।

এমএম