অভিযোগ উঠেছে, আব্দুল আউয়াল মিন্টুর দ্বৈত নাগরিকত্ব ত্যাগের আবেদন গৃহীত হওয়ার প্রমাণপত্র না দেখেই শুধুমাত্র আবেদনপত্র দেখে তাঁর মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা করেছেন জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তা ও জেলা প্রশাসক মনিরা হক।
মূলত দ্বৈত নাগরিকত্ব বাতিল করলেও হলফনামার সঙ্গে তার প্রমাণ উল্লেখ না করায় জামায়াতে ইসলামীর কুড়িগ্রাম-৩ আসনের প্রার্থী মাহবুব আলম সালেহী ও চট্টগ্রাম-৯ আসনের প্রার্থী ডা. এ কে এম ফজলুল হকের মনোনয়নপত্র বাতিল করেছেন স্ব স্ব আসনের জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তারা।
কিন্তু একই পদ্ধতি অবলম্বন করলেও ফেনী-৩ আসনের বিএনপি মনোনীত প্রার্থী আব্দুল আউয়াল মিন্টুর মনোয়নপত্র গ্রহণ করায় জেলা প্রশাসকের নিরপেক্ষতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
গত কয়েকদিন ধরে দ্বৈত নাগরিকত্ব ত্যাগ না করায় আব্দুল আউয়াল মিন্টুর প্রার্থীতা বাতিল হতে পারে, এমন গুঞ্জন উঠেছিল। বিশেষ করে রবিবার (৪ জানুয়ারি) মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাইয়ের শেষদিনে শুনানির সময় পেছানোয় এই গুঞ্জন আরও ডালপালা মেলে।
এদিন ফেনী-৩ আসনের মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাইয়ের জন্য সময় নির্ধারন করা হয়েছিল দুপুর ১টা। সেটি পিছিয়ে বেলা আড়াইটা এবং সর্বশেষ ৩টায় নিয়ে যাওয়া হয়। এরপর শুনানি শুরু হয়।
শুনানি চলাকালীন জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তা মনিরা হক প্রার্থীকে নিয়ে কোন প্রশ্ন আছে কিনা জিজ্ঞেস করেন।
তখন আব্দুল আউয়াল মিন্টুর যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব নিয়ে প্রশ্ন তোলেন জেলা জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি মোহাম্মদ আব্দুর রহিম। তিনি সংশ্লিষ্ট প্রার্থী দ্বৈত নাগরিকত্ব ত্যাগ করেছে কিনা জানতে চান।
জবাবে জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তা মনিরা হক জানান, আব্দুল আউয়াল মিন্টু হলফনামায় উল্লেখ করেছেন, তিনি মার্কিন দূতাবাসে নাগরিকত্ব ত্যাগ করার আবেদন দাখিল করেছেন।
পরে আব্দুল আউয়াল মিন্টুর মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা করে রিটার্নিং কর্মকর্তা বলেন, সংবিধানের বলা হয়েছে- দ্বৈত নাগরিকত্ব গ্রহণের ক্ষেত্রে বিদেশি রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব ত্যাগ করলে এ অনুচ্ছেদের উদ্দেশ্য সাধনকল্পে তিনি বিদেশি নাগরিকত্ব অর্জন করেছেন বলে গণ্য হইবে না। এতে তাঁরর মনোনয়নপত্র গ্রহণ করা যায়। এজন্য তাঁর মনোনয়নপত্র গ্রহণ করা হয়েছে।
এদিকে মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণার পর আব্দুল আউয়াল মিন্টুর অনুসারী বিএনপির নেতা-কর্মীদের হাততালি দিয়ে উচ্ছাস প্রকাশ করতে দেখা গেলেও সেখানে উপস্থিত অনেককেই বিস্ময় প্রকাশ করতে দেখা গেছে। এমনকি এই ঘোষণার পরপর একজন পুলিশ কর্মকর্তার হাততালি দেওয়ার ঘটনাও জেলাজুড়ে সমালোচনার জন্ম দিয়েছে।
শুনানির সময় আব্দুল আউয়াল মিন্টু যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব ত্যাগের আবেদন মঞ্জুরের কোনো সনদ জমা দিয়েছেন কিনা, সেটি জানানো হয়নি। রিটার্নিং কর্মকর্তা বিষয়টি স্পষ্ট করেননি। উল্টো অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও আব্দুল আউয়াল মিন্টুর মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা করে রিটার্নিং কর্মকর্তা প্রার্থীর পক্ষ নিয়েছেন বলে অভিযোগ জামায়াত সংশ্লিষ্টদের।

রাজনীতি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কোনো প্রার্থীর দ্বৈত নাগরিকত্ব থাকলে তাকে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার আগেই সেটি ত্যাগ করার আবেদন করতে হয়। আবেদন মঞ্জুর হওয়ার পর যে সনদ (এক্সেপ্টেন্স লেটার) দেওয়া হয়, সেটি মনোনয়নপত্রের সঙ্গে জমা দিতে হয়। হলফনামায়ও বিষয়টির উল্লেখ থাকতে হয়। যদি এর ব্যত্যয় ঘটে, তাহলে প্রার্থীর বিরুদ্ধে আপিল করলে যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে প্রার্থিতা পর্যন্ত বাতিল হতে পারে।
আব্দুল আউয়াল মিন্টু হলফনামায় তাঁর দ্বৈত নাগরিকত্ব থাকার বিষয়টি স্বীকার করেছেন এবং গত মাসে নাগরিকত্ব ত্যাগের আবেদন করেছেন বলে উল্লেখ করেছেন। তবে সেটি গ্রহণ হয়েছে কিনা, সেটি এখনও স্পষ্ট নয়।
আব্দুল আউয়াল মিন্টু যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব ত্যাগের বিষয়ে কি প্রমাণপত্র দেখিয়েছেন, জানতে চাইলে জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তা মনিরা হক বলেন, তিনি দূতাবাসে ইমেইল পাঠানো এবং এ সংক্রান্ত কথোপকথনের তথ্য ও দুটো ফার্মের মতামত জমা দিয়েছেন। এরপর এ বিষয়ে পাবলিক প্রসিকিউটরের পরামর্শ নেওয়া হয়েছে।
নিজেরও কিছুটা ভুল হতে পারে বলে উল্লেখ করেন মনিরা হক। তিনি বলেন, কেউ চাইলে এ বিষয়ে আপিল করতে পারে।
বাংলাদেশের সংবিধানের ৬৬ (২) (গ) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি যদি বিদেশের নাগরিকত্ব অর্জন করেন অথবা কোনো বিদেশি রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করেন, তবে তিনি সংসদ সদস্য হওয়ার অযোগ্য বিবেচিত হন।
যুক্তরাষ্ট্রে নাগরিকত্ব ত্যাগের প্রক্রিয়া সবচেয়ে কঠোর ও নথিভিত্তিক। এটি করতে হয় বিদেশে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাস বা কনস্যুলেটে, কনসুলার অফিসারের সামনে শপথ নিয়ে। প্রক্রিয়া শেষে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর অনুমোদন দিলে ইস্যু হয় Certificate of Loss of Nationality (CLN)। এই CLN ছাড়া কেউ যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব ত্যাগ করেছেন, এমন দাবি আইনগতভাবে ভিত্তিহীন। এই মূল সনদটি ছাড়া নাগরিকত্ব ত্যাগের কোনো মৌখিক ঘোষণা আন্তর্জাতিক আইন ও বাংলাদেশের আদালতে গ্রহণযোগ্য নয়।
যুক্তরাষ্ট্রের কেউ একবার স্বেচ্ছায় নাগরিকত্ব ত্যাগ করলে তা পুনরুদ্ধার প্রায় অসম্ভব। সাধারণত নতুন করে অভিবাসন ও নাগরিকত্ব প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়।
জনপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও), ১৯৭২ অনুযায়ী, হলফনামায় ভুল তথ্য দিলে প্রার্থিতা বাতিল এবং বিজয়ী হলে সংসদ সদস্য পদ শূন্য হওয়ার বিধান রয়েছে।
দণ্ডবিধির ১৯১ ও ১৯৩ ধারা অনুযায়ী মিথ্যা সাক্ষ্য দেওয়া বা মিথ্যা হলফনামা দাখিল করা একটি ফৌজদারি অপরাধ, যার শাস্তি জেল ও জরিমানা।
এনএইচ