তিনজন ঢোকার অভিযোগ, দুজন পালালেও ধরা পড়েন একজন; আনসার সদস্যদের বিরুদ্ধে বেধড়ক পিটুনির অভিযোগ ময়নাতদন্তের জন্য মরদেহ মর্গে পাঠানো হয়েছে।
মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) সকালে তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানাধীন সাতরাস্তার বিটিসিএল অফিসের ভেতরে এ ঘটনা ঘটে বলে জানা গেছে। পরে গুরুতর আহত অবস্থায় অচেতন ওই যুবককে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে নেওয়া হলে জরুরি বিভাগের চিকিৎসক পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
নিহত যুবককে হাসপাতালে নিয়ে আসা বিটিসিএলের অফিস সহকারী মো. সাইফুলের ভাষ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবার সকালে তিনজন যুবক চুরির উদ্দেশ্যে বিটিসিএল কার্যালয়ের ভেতরে প্রবেশ করেন। বিষয়টি টের পেয়ে আনসার সদস্যরা তাদের ধাওয়া করলে দুজন দেয়াল টপকে পালিয়ে যেতে সক্ষম হন। অপর একজন পালাতে ব্যর্থ হলে তাকে আটক করেন কার্যালয়ের আনসার সদস্যরা।
সাইফুলের অভিযোগ, আটকের পর ওই যুবককে আনসার সদস্যরা বেধড়ক মারধর করেন। একপর্যায়ে গুরুতর আহত হয়ে তিনি অচেতন হয়ে পড়েন। পরে তাকে উদ্ধার করে চিকিৎসার জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়।
হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
ঘটনাটি ঘিরে স্থানীয়দের মধ্যে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। তবে ওই যুবক সত্যিই চুরির উদ্দেশ্যে বিটিসিএল কার্যালয়ে প্রবেশ করেছিলেন কি না, কিংবা তাকে কারা এবং কীভাবে মারধর করেছেন—এসব বিষয়ে এখনো পুলিশি তদন্তে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ পরিদর্শক মো. হাবিবুর রহমান জানান, অচেতন অবস্থায় ওই যুবককে হাসপাতালে আনা হয়েছিল। জরুরি বিভাগের চিকিৎসক পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে তাকে মৃত ঘোষণা করেন। পরে মরদেহটি ময়নাতদন্তের জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে রাখা হয়েছে।
তিনি আরও জানান, ঘটনাটি সংশ্লিষ্ট থানা পুলিশকে জানানো হয়েছে।
পুলিশ ও হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, নিহত যুবকের শরীরে আঘাতের চিহ্ন রয়েছে কি না, তার মৃত্যুর প্রকৃত কারণ কী এবং মৃত্যুর আগে তাকে কতক্ষণ মারধর করা হয়েছে—এসব বিষয় ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনের পর আরও স্পষ্ট হতে পারে।
এদিকে, ঘটনাটিকে কেন্দ্র করে বেশ কিছু প্রশ্নও সামনে এসেছে। চুরির অভিযোগে কাউকে আটক করার পর আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে মারধর করা হয়েছিল কি না, আনসার সদস্যদের দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ করা হয়েছে কি না—এসব বিষয় তদন্তের মাধ্যমে খতিয়ে দেখার দাবি উঠেছে।
প্রত্যক্ষদর্শী ও সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য অনুযায়ী, সকালে তিনজন ব্যক্তি বিটিসিএল কার্যালয়ের ভেতরে প্রবেশ করেছিলেন। তাদের গতিবিধি সন্দেহজনক মনে হলে আনসার সদস্যরা বিষয়টি বুঝতে পারেন। এরপর তাদের ধাওয়া করা হয়। দুজন পালিয়ে গেলেও একজনকে ধরে ফেলা হয়।
তবে ওই যুবককে আটকের পর ঠিক কী ঘটেছিল, তা নিয়ে এখনো ভিন্ন ভিন্ন তথ্য সামনে আসতে পারে। ফলে ঘটনার পূর্ণাঙ্গ চিত্র পেতে প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য, কার্যালয়ের নিরাপত্তা ব্যবস্থার তথ্য এবং সম্ভব হলে সিসিটিভি ফুটেজ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
নিহতের পরিচয় শনাক্ত করাও এখন পুলিশের অন্যতম প্রধান কাজ। পরিচয় শনাক্ত হলে তার পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হবে এবং ঘটনার বিষয়ে আরও বিস্তারিত তথ্য জানা যেতে পারে।
এ ঘটনায় নিহতের পরিবারের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত কোনো অভিযোগ বা মামলা হয়েছে কি না, তাৎক্ষণিকভাবে তা জানা যায়নি। একইভাবে অভিযুক্ত আনসার সদস্যদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কি না, সে বিষয়েও বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের মতে, কোনো ব্যক্তি অপরাধের সঙ্গে জড়িত থাকার সন্দেহে আটক হলেও তাকে মারধর বা শারীরিকভাবে নির্যাতন করার সুযোগ নেই। অভিযোগের সত্যতা যাচাই ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের।
তেজগাঁওয়ের ব্যস্ত সাতরাস্তা এলাকায় অবস্থিত বিটিসিএল কার্যালয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ সরকারি প্রতিষ্ঠানে এমন ঘটনার অভিযোগ ওঠায় বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। একজন সন্দেহভাজন ব্যক্তির মৃত্যু এবং তার পরিচয়হীন অবস্থায় মর্গে পড়ে থাকা ঘটনাটির সুষ্ঠু তদন্তের প্রয়োজনীয়তা আরও বাড়িয়েছে।
এদিকে, ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার পর যুবকের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যাবে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। পাশাপাশি পুলিশি তদন্তে ওই যুবক কীভাবে কার্যালয়ে প্রবেশ করেছিলেন, তার সঙ্গে অন্য কারা ছিলেন, তাদের পরিচয় কী এবং আটকের পর কী ধরনের পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল—এসব বিষয়ও সামনে আসতে পারে।
সব মিলিয়ে চোর সন্দেহে বিটিসিএল কার্যালয়ে আটক এক অজ্ঞাত যুবকের মৃত্যুর ঘটনায় প্রশ্ন উঠেছে নিরাপত্তা, দায়িত্বশীলতা এবং আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার বিষয়ে। এখন ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন ও পুলিশি তদন্তের ফলাফলের দিকেই নজর সংশ্লিষ্টদের।
ঘটনার প্রকৃত কারণ এবং দায়ীদের বিষয়ে তদন্তের পরই স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাবে।
এমএম