প্রিন্ট,ইলেকট্রনিক ,অনলাইন-পত্রিকা ও বার্তা সংস্থার সাংবাদিকদের কঠোর হস্তে নিয়ন্ত্রণের পাশি দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) কর্মকর্তাদের উপর এ প্রতিষ্ঠানের বর্তমান সচিবের অযাচিত হস্তক্ষেপে অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, গত ৬ আগস্ট সরকারের অতিরিক্ত সচিব মাকসুদুল হাসান খান দুদকের ভারপ্রাপ্ত সচিব হিসেবে নিয়োগ পান।
এর সপ্তাহ পরই তিনি দুদকের ভারপ্রাপ্ত সচিব হিসেবে যোগদান করেন। একের পর এক মৌখিক ফরমান জারি শুরু করেন।
এমনকি দুদকের পক্ষ থেকে দুর্নীতিবাজ ও বিপুল পরিমান অবৈধ সম্পদের মালিকদের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান, মামলা, চার্জশিট এবং ফাইনাল রিপোর্টের অনুমোদন ও দাখিলের তথ্য সাংবাদিকদের না দেয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নির্দেশনা দেন।
দুদকের সচিবের নিজস্ব আইনের পরিবর্তে তিনি মন্ত্রণালয়ের সচিবদের মতো ক্ষমতা ব্যবহারের চেষ্টায় রয়েছেন।
বিভিন্ন সার্কুলার অফিস আদেশের বাইরেও অনুসন্ধান, তদন্ত, তদন্ত কর্মকর্তা নিয়োগ, বদলি, মামলা অনুমোদন ইত্যাদি সিদ্ধান্তের অনুলিপি তাকে দিতে নির্দেশনা জারি করেন।
কার্যক্রমে স্বচ্ছতা দুদকের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলেও সাংবাদিকদের স্বাভাবিক তথ্যপ্রাপ্তির পথ রুদ্ধ করে দেন। দুদক কার্যালয়ে সাংবাদিক প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা আরোপে উদ্যোগী হন।
শুধু তাইনয় দুদকের জনসংযোগ কর্মকর্তার দফতটি মুল ভবন থেকে সরিয়ে ফোলার মাধ্যমে সাংবাদিকদের প্রবেশাধিকার নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ নেন সচিব মাকসুদুল হাসান খান।
এমনিক দুদক কর্মকর্তাদের নিয়ে ঘন্টার পর ঘন্টা মিটিংয়েও সাংবাদিকদের নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে আলোচনা করেন। যা দুদকের ইতিহাসে এক নজিরবিহীন ঘটনা।
তিনি মিডিয়ার সাংবাদিকদের নিয়ন্ত্রণের জন্য দুদক কার্যালয়ে প্রবেশাধিকার, দুদকের দৈনন্দিন কার্যক্রমের তথ্য গোপন রাখার জন্য বিশেষ কৌশল অবলম্বন করেন।
জানা যায়, দুদক সচিব মাকসুদুল হাসান খান চাপ প্রয়োগের মাধ্যমে তদন্ত প্রতিবেদন থেকে অভিযুক্তদের নাম বাদ দিতে বলেন।
তিনি সার্বক্ষনিক দুর্নীতিবাজ আমলা-স্বার্থ রক্ষায় ব্যস্ত থাকেন। তিনি যোগদানের পরই বিপিসির পৌনে ২ শত কোটি টাকা দুর্নীতি মামলার আসামি চার আমলারপক্ষে ফাইনাল রিপোর্ট প্রদানে বলিষ্ট ভূমিকা রাখেন।
সাচিবিক দায়িত্বের এখতিয়ার বহিভুত তিনি নির্দেশনা দিয়ে দুর্নীতির অনুসন্ধান ও তদন্তে অযাচিত হস্তক্ষেপের ফলে আসামির তালিকা থেকে সরকারি কর্মকর্তাদের নাম বাদ দিতে বাধ্য হচ্ছেন দুদক কর্মকর্তারা।
সচিবের অযাচিত তদবির থেকে বাঁচতে দুদক কর্মকর্তারা অফিসের বাইরে থেকেও মামলা ড্রাফট করাতে বাধ্য হচ্ছেন এমন অভিযোগও উঠছে।
তার (সচিব) প্রত্যাশা অনুযায়ী অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিয়ে অভিযোগটি নথিভুক্ত করার জন্য চেষ্টা চালান।
তিনি ইতোমধ্যে রাজউকের প্লট জালিয়াতি ৩ মামলার আসামি ও বিপুল অবৈধ সম্পদের মালিক সচিব ড. খন্দকার শওকত হোসেনসহ সংশ্লিষ্ট রাজউক কর্মকর্তা আতাউল হক মোল্লা, মোহাম্মদ মুসাসহ অর্ধ ডজন আমলার পক্ষ নিয়েছেন।
এ প্রেক্ষাপটে মাকসুদুল হাসান খানকে দুদক থেকে প্রত্যাহারে সরকারকে অনুরোধ জানানো হবে বলে জানা গেছে।
তবে গণমাধ্যমের প্রতি কমিশনের ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির ফলে সচিবের উদ্যোগটি শেষ পর্যন্ত আর সফল হয়নি। একটি ব্রিফিংয়ে তার রাজউক থেকে প্লট গ্রহণের বিষয়ে প্রশ্ন করা হয়।
অধিক স্বচ্ছতার প্রশ্নে তিনি নিজেও স্বেচ্ছায় সম্পদ বিবরণী দাখিল করবেন কিনা জানতে চাওয়া হয়। এরপর নিয়মিত মাসিক ব্রিফিংও তিনি বন্ধ করে দেন।
নাম না প্রকাশের শর্তে দুদকের একাধিক কর্মকর্তা জানান, দুদকের বর্তমান সচিব মাকসুদুল হাসান খানের তদবির ও সুপারিশের প্রেক্ষিতে পদস্থ সরকারি কর্মকর্তাদের নাম আসামির তালিকা থেকে বাদ দিতে হচ্ছে।
তার মৌখিক অনুমতি ও নির্দেশনা ছাড়া তলবি নোটিশ পাঠিয়েও জিজ্ঞাসাবাদ করা যাবে না।
ফলে দুদক সচিবের অযাচিত হস্তক্ষেপ থেকে বাঁচতে কঠোর গোপনীয়তার মধ্য দিয়ে দুদকের উপ পরিচালক এবং সহকারি পরিচালকদের কাজ করতে হচ্ছে। দুদকের মামলায় সরকারের উপ-সচিব, যুগ্ম-সচিব, অতিরিক্ত সচিব এবং সচিব পর্যায়ের কোনো আসামি থাকলেই তদন্ত কর্মকর্তাদের বিশেষ কৌশল অবলম্বন করতে হয়।
আসামিদের বিরুদ্ধে মামলা করার ক্ষেত্রে কমিশনের সিদ্ধান্ত থাকলেও যদি মামলা রুজুর আগ মুহূর্তে সচিব জেনে যেতে পারেন-তাহলে কোনো না কোনো ভাবে তিনি ওই মামলা ঠেকিয়ে দেন।
সচিব যাতে জানতে পারেন সেই লক্ষ্যে বহু মামলার ড্রাফট দুদক কার্যালয়ের বাইরে থেকে করা হয় বলে জানা যায়।
তিনি কৌশলে দুদকের নিজস্ব জনবল বাইরে প্রেষণে বদলি করিয়ে বাইরের আমলাদের দুদকে প্রেষণে আনার জন্য বিশেষ উদ্যোগী হন এমন অভিযোগও উঠেছে।
ফলে গত মাসে দুদকের নিজস্ব জনবল একজন পরিচালক ও একজন উপ-পরিচালকে প্রেষণে বদলিতে করেন।
এদিকে সচিব মাকসুদুল হাসান খানের বিরুদ্ধে উত্থাপিত নানা অভিযোগের প্রেক্ষিতে গতকাল সোমবার দুদক চেয়ারম্যান মোঃ বদিউজ্জামান তাকে ডেকে পাঠান বলে জানা গেছে।
অন্য দুদক কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতেই চেয়ারম্যান তাকে ভৎসনা করেন। দুদক আইন অনুসারে কার্যক্রম পরিচালনার পরামর্শ দেন বলে সূত্র জানায়।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে দুদক চেয়ারম্যান মোঃ বদিউজ্জামান সাংবাদিকদের বলেন, কাউকে নোটিস করলে, কারো সম্পদ বিবরণী চাইলে সেটির কপি দিয়ে সচিবকে অবহিত করার নিয়ম।
এটি করতে গেলে যদি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার কোনো ভুল হয়ে থাকে সে বিষয়ে সচিব নির্দেশনা দিতে পারেন। এর বাইরে মামলা রুজু, প্রতিবেদন দাখিল ইত্যাদি বিষয়ে তিনি আইনতঃ নির্দেশনা দিতে পারেন না। তবে এরকম কিছু ঘটে থাকলে কেউ আমার নলেজে এখনো দেয়নি।
এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে সচিব মাকসুদুল হাসান খান বলেন, সোমবার বিকেল ৫টা ৮ মিনিটে সাংবাদিকদের বলেন, এখন ব্যস্ত আছি।
কথা বলতে পারবো না। পরে ফোন করেন। পরে সন্ধ্যা সোয়া ৬টা পর্যন্ত একাধিকবার ফোন করা হলেও ফোন ধরেননি দুদক সচিব।
একে/এসএইচ





