গত ২৪ আগস্ট মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের ঢাকা বিভাগীয় গোয়েন্দা দল সাইবার পেট্রোলিংয়ের মাধ্যমে অনলাইনে নিয়ন্ত্রিত রাসায়নিক পদার্থের খুচরা বিক্রির তথ্য পায়। তথ্য যাচাই করে দেখা যায়, ই-কেম নামের একটি প্রতিষ্ঠান তাদের অনলাইন প্ল্যাটফর্মে বিভিন্ন ধরনের রাসায়নিক বিক্রির বিজ্ঞাপন দিয়ে অর্ডার নিচ্ছে। বুধবার (২৬ আগস্ট) এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানিয়েছে ডিএনসি।
ডিএনসি জানায়, গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে বিষয়টি যাচাই করতে অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে ই-কেমের অনলাইন প্ল্যাটফর্মে ৫০০ মিলিলিটার এসিটিক অ্যানহাইড্রাইডের অর্ডার করা হয়। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এসিটিক অ্যানহাইড্রাইড মরফিন থেকে হেরোইন উৎপাদনের প্রক্রিয়ায় ব্যবহার হতে পারে। অর্ডার নেওয়ার সময় ক্রেতার কাছ থেকে নিয়ন্ত্রিত রাসায়নিক কেনার প্রয়োজনীয় অনুমোদন, লাইসেন্স বা ব্যবহারের উদ্দেশ্যসংক্রান্ত কোনো নথি চাওয়া হয়নি। পরে অর্ডার করা পণ্য ঢাকার নিকেতন এলাকায় পৌঁছালে সেখানে অভিযান চালায় গোয়েন্দা দল।
আরও জানায়, অভিযানে ই-কেমের সরবরাহ করা পার্সেল থেকে ৫০০ মিলিলিটার এসিটিক অ্যানহাইড্রাইড ও ১ লিটার এসিটোন জব্দ করা হয়। পরে ডেলিভারিম্যানকে জিজ্ঞাসাবাদ করে প্রতিষ্ঠানটির কার্যালয় কুড়িলের প্রগতি সরণি এলাকায় বলে জানতে পারে গোয়েন্দা দল। এরপর ২৪ আগস্টই কুড়িলের প্রগতি সরণি এলাকায় ই-কেমের কার্যালয়ে অভিযান চালিয়ে প্রতিষ্ঠানের আইটি ম্যানেজার মো. আব্দুল মোমিন পাটোয়ারীকে গ্রেপ্তার করা হয়। সেখানে কোনো ধরনের যাচাই-বাছাই ছাড়াই নিয়ন্ত্রিত প্রিকারসর কেমিক্যাল বিক্রির কাগজপত্র পাওয়া যায়। অভিযানে সর্বমোট ৬ লিটার রাসায়নিক পদার্থ জব্দ করা হয়।
এ ঘটনায় প্রতিষ্ঠানের মালিকসহ আরও কয়েকজনকে আসামি করা হয়েছে। তাদের মধ্যে কয়েকজন পলাতক রয়েছেন।
ডিএনসির দাব, প্রিকারসর কেমিক্যাল এমন রাসায়নিক পদার্থ, যেগুলোর বৈধ শিল্প ও বাণিজ্যিক ব্যবহার রয়েছে। তবে একইসঙ্গে এসব রাসায়নিক অবৈধ মাদক উৎপাদন বা প্রক্রিয়াজাতকরণে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন অনুযায়ী, প্রিকারসর কেমিক্যাল বলতে এমন রাসায়নিক পদার্থকে বোঝায়, যা ক বা খ শ্রেণির কোনো মাদকদ্রব্য উৎপাদন অথবা প্রক্রিয়াজাতকরণে অত্যাবশ্যকীয় উপাদান বা উপকরণ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। একই আইনের তফসিলের ক শ্রেণির ৮ নম্বর ক্রমিকে প্রিকারসর কেমিক্যালের তালিকা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
ডিএনসি জানায়, এসিটিক অ্যানহাইড্রাইড হেরোইন তৈরির প্রক্রিয়ায় এবং পটাশিয়াম পারম্যাঙ্গানেট কোকেন তৈরির প্রক্রিয়ায় ব্যবহৃত হতে পারে। একইভাবে এসিটোন, ইথাইল ইথার, হাইড্রোক্লোরিক এসিড, মিথাইল ইথাইল কিটোন ও টলুইনের মতো রাসায়নিকও অবৈধ মাদক উৎপাদনের বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় ব্যবহৃত হতে পারে। এসব রাসায়নিকের বৈধ ব্যবহার থাকলেও অবৈধ মাদক উৎপাদনে ব্যবহারের কারণে এগুলোর সরবরাহ ও ব্যবহার আন্তর্জাতিকভাবেও নজরদারির আওতায় রয়েছে। বৈধ শিল্পকারখানা ও গবেষণাগারে ব্যবহৃত রাসায়নিক যেন অবৈধ মাদক তৈরির কাজে চলে না যায়, সেজন্য সরবরাহের উৎস, ক্রেতা, পরিমাণ এবং ব্যবহারের উদ্দেশ্য সম্পর্কে যথাযথ নজরদারি গুরুত্বপূর্ণ।
জাতিসংঘের মাদকদ্রব্য ও অপরাধবিষয়ক কার্যালয় এবং আন্তর্জাতিক মাদক নিয়ন্ত্রণ বোর্ডের মাধ্যমে বিভিন্ন প্রিকারসর কেমিক্যালের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও সরবরাহের ওপর নজরদারি, তথ্য বিনিময় এবং সন্দেহজনক লেনদেন শনাক্তের ব্যবস্থা রয়েছে।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর জব্দ করা রাসায়নিক, উদ্ধার করা নথিপত্র ও অন্যান্য আলামত পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছে। একইসঙ্গে অনলাইন প্ল্যাটফর্মে এসব রাসায়নিকের উৎস, সরবরাহ ব্যবস্থা, ক্রেতা এবং সম্ভাব্য ব্যবহার শনাক্তে তদন্ত করা হচ্ছে।
মাদক নিয়ন্ত্রণের কার্যক্রম শুধু তৈরি মাদক উদ্ধার বা মাদক ব্যবসায়ীদের গ্রেপ্তারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। মাদক তৈরির কাঁচামাল কোথা থেকে আসছে, কীভাবে সংগ্রহ হচ্ছে এবং বৈধ বাজারের কোন পথ ব্যবহার করে এসব রাসায়নিক অবৈধ কাজে চলে যাচ্ছে—সেই উৎস ও সরবরাহ ব্যবস্থাকে শনাক্ত করাও এর গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বিশেষ করে সাইবার পেট্রোলিংয়ের মাধ্যমে অনলাইনে ডিজিটাল সাপ্লাই চেইন পর্যবেক্ষণকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
এমএম