শামীমা র্যাবের হাতে গ্রেফতারের পর প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে দাবি করেছে, এই হত্যার অন্যতম পরিকল্পনাকারী নিহতের বন্ধু জরেজ। তার পরিকল্পনায় হানি ট্রাপে ফেলে আশরাফুলকে রংপুর থেকে ঢাকায় আনেন শামীমা। এরপর শরবতের সঙ্গে ঘুমের ওষুধ খাইয়ে তাকে অচেতন করে হত্যার পর লাশ নিজ হাতে ২৬ টুকরো করে বন্ধু জরেজ। এরপর সেই ঘরে শামীমা ও জরেজ দৈহিক সম্পর্কে মিলিত হয়। যা কোনো সিনেমার গল্পকেও হার মানায়।
যদিও শামীমারা দাবি করেছে, এই হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে তাদের আশরাফুলের কাছ থেকে ১০ লাখ টাকা নেওয়ার পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু র্যাব বলছে, এমন নৃশংস হত্যাকাণ্ড পূর্বের কোনো ক্ষোভ ছাড়া সম্ভব না। তবে এ বিষয়ে তারা নিহতের বন্ধু জরেজের সঙ্গে এখনও কথা বলতে পারেনি। তবে হত্যাকাণ্ডের সময় শামীমা বাধা দিয়েছে বলে জানিয়েছে। ফলে বিষয়টি নিয়ে ধোঁয়াশা রয়েছে।
শামীমা আরও জানিয়েছে, হত্যাকাণ্ডের পর মালয়েশিয়া যাওয়ার পরিকল্পনা ছিল জরেজের। এজন্য পাসপোর্টও তৈরি করতে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তার আগেই জরেজ ও শামীমা গ্রেফতার হন।
শনিবার সকালে রাজধানীর কারওয়ানবাজারে র্যাবের মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান র্যাব-৩ এর অধিনায়ক লে. ক. ফায়েজুল আরেফীন।
সংবাদ সম্মেলনে তিনি জানান, গ্রেফতারকৃত শামীমা আক্তার ওরফে কোহিনুরের তথ্যমতে, জরেজের সঙ্গে তার এক বছর ধরে প্রেমের সম্পর্ক চলছিল। জরেজ শামীমাকে জানায় তার এক বন্ধুকে প্রেমের ফাঁদে ফেলে ব্লাকমেইল করে ১০ লাখ টাকা আদায় করা যাবে। যা থেকে জরেজ ৭ লাখ ও শামীমা ৩ লাখ টাকার ভাগ পাবেন। এই শর্তে শামীমা আগে আশরাফুল ইসলামের সঙ্গে একমাস আগে থেকে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ শুরু করেন ও তাকে প্রেমের ফাঁদে ফেলেন। মোবাইল ফোনে তাদের নিয়মিত অডিও এবং ভিডিও কলে কথা চলতো।
পরে গত ১১ নভেম্বর জরেজ ও আশরাফুল রংপুর থেকে ঢাকায় রওনা হন। ঢাকায় আসার পর গত ১২ নভেম্বর জরেজ ও আশরাফুল শামীমার সঙ্গে দেখা করেন। তারা শনির আখড়ার নূরপুর এলাকায় একটি ভাড়া করা বাসায় তিনজন ওঠেন। রংপুর থেকে আসার আগেই জরেজ শামীমাকে জানায় যে আশরাফুলের সঙ্গে অন্তরঙ্গ ভিডিও ধারণ করতে হবে এবং পরে সেই ভিডিও দেখিয়ে তারা তার কাছ থেকে ১০ লাখ টাকা আদায় করবে। সেই মোতাবেক ঢাকার বাসায় নিয়ে শামীমা শরবতের সঙ্গে ঘুমের ট্যাবলেট মিশিয়ে দেয়।
এরপর শামীমা ও আশরাফুলের অন্তরঙ্গ ভিডিও ধারণ করে জরেজ। পরে আশরাফুল অচেতন হয়ে পড়লে তার হাত দড়ি দিয়ে বেঁধে ফেলে এবং মুখ কসটেপ দিয়ে আটকে দেন জরেজ। জরেজ অতিরিক্ত ইয়াবা সেবন করে উত্তেজিত হয়ে অচেতন থাকা আশরাফকে হাতুড়ি দিয়ে এলোপাতাড়ি আঘাত করতে থাকেন। এসময় শামীমা তাকে বলতে থাকেন কেন তিনি আশরাফুলকে মারছেন এবং তিনি বাধা দেন। এতে জরেজ তাকেও মারধর করতে থাকেন। এক পর্যায়ে অতিরিক্ত আঘাত এবং মুখ কসটেপ দিয়ে আটকানো থাকায় শ্বাস না নিতে পারায় ঘটনাস্থলেই আশরাফুল মারা যান।
এরপর লাশ একই ঘরে রেখে জরেজ ও শামীমা রাত্রীযাপন করেন এবং তারা শারিরিক সম্পর্কে লিপ্ত হন। পরদিন আশরাফুলের মৃতদেহ গুম করার জন্য স্থানীয় বাজার থেকে চাপাতি ও ড্রাম কিনে আনেন। এরপর সেই চাপাতি দিয়ে আশরাফুলের মরদেহটি ২৬ টুকরো করে ড্রামে ভরা হয়। পরে একটি সিএনজি ডেকে নিয়ে তাতে তোলেন। পথে আরও একটি সিএনজি পাল্টানো হয়। শেষে লাশ ভর্তি ড্রামদুটি হাইকোর্টের পানির পাম্প সংলগ্ন প্রধান সড়কের পাশে একটি বড় গাছের নিচে ফেলে তারা দ্রুত হাইকোর্ট এলাকা হতে একটি অটোযোগে সায়েদাবাদ চলে যান। সায়েদাবাদ যাওয়ার পর জরেজ শামীমাকে কুমিল্লায় তার নিজ বাড়িতে চলে যেতে বলেন এবং তিনি রংপুর তার নিজের বাড়িতে চলে যাবেন বলে শামীমাকে জানায়। শামীমা কুমিল্লায় তার নিজ বাড়িতে চলে যান। এরপর জরেজের সঙ্গে তার যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন শামীমা।
এ ঘটনায় শামীমার দেওয়া তথ্যমতে, আশরাফুলের রক্তমাখা সাদা রংয়ের পায়জামা-পাঞ্জাবিসহ হত্যার কাজে ব্যবহৃত দড়ি, কসটেপ, একটি গোলগলা গেঞ্জি এবং একটি হাফ প্যান্ট একটি বস্তার ভেতর মুখবাঁধা অবস্থায় শনির আখড়াস্থ নূরপুর এলাকা থেকে উদ্ধার করা হয়।
র্যাব-৩ এর অধিনায়ক লে. ক. ফায়েজুল আরেফীন বলেন, ‘শামীমার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী ব্লাকমেইল করে টাকা উপার্জন করাই তাদের মূল উদ্দেশ্য ছিল। তবে এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের পেছনে পূর্বশত্রুতা আছে কিনা তা মূল আসামি জরেজকে জিজ্ঞাসাবাদে বেরিয়ে আসবে।
এমএম