অর্থনীতি ও বাণিজ্য বিশ্লেষকদের মতে, ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান ধরে রাখতে উৎপাদন ব্যয় নিয়ন্ত্রণ, পণ্য সরবরাহের সময় কমানো এবং রপ্তানিতে বৈচিত্র্য আনা জরুরি। বিশেষ করে কাঁচামাল আমদানিনির্ভরতা ও দীর্ঘ সরবরাহ সময় বাংলাদেশের প্রতিযোগিতার সক্ষমতায় প্রভাব ফেলতে পারে।
ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান
ইউরোপের পোশাক বাজারে চীনের পরই বাংলাদেশের অবস্থান। বাজারের প্রায় ২৭ শতাংশ চীনের দখলে, আর বাংলাদেশের অংশ প্রায় সাড়ে ২২ শতাংশ। তৃতীয় অবস্থানে থাকা তুরস্কের বাজার অংশ প্রায় সাড়ে ১০ শতাংশ। অন্যদিকে, প্রায় ৫ শতাংশ অংশ নিয়ে তালিকায় রয়েছে ভারত।
সাধারণ পোশাক সরবরাহে বাংলাদেশ ইউরোপের অন্যতম প্রধান দেশ। শুল্কসুবিধা কাজে লাগিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বাজারটিতে শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে দেশের তৈরি পোশাকশিল্প।
তবে ভারত-ইইউ মুক্তবাণিজ্য চুক্তি কার্যকর হলে প্রতিযোগিতার চিত্র বদলাতে পারে। চুক্তির আওতায় ভারতীয় পণ্য শুল্কসুবিধা পেলে বাংলাদেশের রপ্তানিকারকদের জন্য বাজার ধরে রাখা আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, গত বছর ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশ ২ লাখ ৬৮ হাজার ৭৫০ কোটি টাকার পণ্য রপ্তানি করেছে। নতুন প্রতিযোগিতার পরিবেশে এই বাজার ও রপ্তানি প্রবৃদ্ধি ধরে রাখাই হবে দেশের পোশাকশিল্পের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ।
উৎপাদন ব্যয় ও সরবরাহের সময় নিয়ে উদ্বেগ
চট্টগ্রামভিত্তিক পোশাকশিল্প প্রতিষ্ঠান এশিয়ান গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এম এ সালামের মতে, শুল্কসুবিধার ক্ষেত্রে প্রতিযোগী দেশগুলোর মধ্যে সমতা তৈরি হলে বাংলাদেশের রপ্তানিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। তবে এর মাত্রা নির্ভর করবে সরকারি নীতিসহায়তা ও শিল্পের প্রস্তুতির ওপর।
তিনি মনে করেন, প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে শ্রমিকদের দক্ষতা উন্নয়ন এবং প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদনব্যবস্থা সম্প্রসারণ করতে হবে। কেবল কম মজুরির ওপর নির্ভর করে দীর্ঘ মেয়াদে বাজার ধরে রাখা সম্ভব নয়।
এম এ সালাম ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে মুক্তবাণিজ্য চুক্তি নিয়ে আলোচনা দ্রুত এগিয়ে নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। একই সঙ্গে স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বাংলাদেশের উত্তরণ তিন বছর পিছিয়ে দেওয়ার বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এবং সে অনুযায়ী বাস্তবসম্মত কর্মপরিকল্পনা গ্রহণের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি।
শিল্পসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের অন্যতম সীমাবদ্ধতা হলো দীর্ঘ লিড টাইম বা অর্ডার পাওয়ার পর পণ্য তৈরি করে ক্রেতার কাছে পৌঁছানোর সময়। দেশে ব্যবহৃত ওভেন কাপড় ও সিনথেটিক ফাইবারের প্রায় ৭০ শতাংশ কাঁচামাল চীন ও ভারত থেকে আমদানি করতে হয় বলে সংশ্লিষ্টদের দাবি। এতে উৎপাদনপ্রক্রিয়ায় অতিরিক্ত সময় যুক্ত হয়।
তাঁদের হিসাব অনুযায়ী, বাংলাদেশ থেকে ইউরোপের ক্রেতার কাছে পোশাক পৌঁছাতে সাধারণত ৬০ থেকে ৮০ দিন সময় লাগে। বিপরীতে, তুলা থেকে সুতা ও কাপড় উৎপাদন পর্যন্ত সমন্বিত শিল্পব্যবস্থা থাকায় ভারত প্রায় ৩০ থেকে ৪০ দিনের মধ্যে পণ্য সরবরাহ করতে পারে।
ফলে দুই দেশের পণ্য একই ধরনের শুল্কসুবিধা পেলে দ্রুত সরবরাহের সক্ষমতা ভারতের জন্য বাড়তি সুবিধা তৈরি করতে পারে।
পরিবহন ও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা
বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানিতে পরিবহনব্যবস্থাও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। চট্টগ্রাম বন্দর থেকে ইউরোপগামী অনেক চালান সিঙ্গাপুর বা কলম্বো বন্দরে স্থানান্তরের পর বড় জাহাজে ইউরোপে পাঠানো হয়। এই প্রক্রিয়ায় পণ্য পৌঁছাতে অতিরিক্ত সময় লাগতে পারে।
ভারতের বন্দর, কাঁচামাল সরবরাহ এবং উৎপাদনব্যবস্থার সমন্বিত সুবিধা দেশটির রপ্তানিকারকদের দ্রুত পণ্য পাঠাতে সহায়তা করতে পারে। ফলে শুধু উৎপাদন ব্যয় নয়, পণ্য পরিবহনের সময় ও লজিস্টিকস ব্যয়ও প্রতিযোগিতায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
এ ছাড়া গ্যাস ও বিদ্যুতের মূল্য, জ্বালানির অনিয়মিত সরবরাহ, প্রশাসনিক জটিলতা এবং সুতা আমদানিতে বন্ড সুবিধা প্রত্যাহার নিয়ে শিল্পসংশ্লিষ্টদের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে। এসব কারণে উৎপাদন ব্যয় বাড়লে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের পোশাকের মূল্য প্রতিযোগিতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
ইউরোপে রপ্তানি বাড়াতে চায় ভারত
ভারত-ইইউ মুক্তবাণিজ্য চুক্তিকে সামনে রেখে ২০২৭ সালের মধ্যে ইউরোপের বাজারে ৮ বিলিয়ন ডলারের পোশাক রপ্তানির লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে ভারত বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। লক্ষ্য পূরণ হলে ইউরোপের বাজারে ভারতের অংশ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে।
বাংলাদেশের পাশাপাশি কম্বোডিয়া, পাকিস্তান, ভিয়েতনাম ও তুরস্কের মতো দেশও ইউরোপের পোশাক বাজারে প্রতিযোগিতা করছে। ভারত একই ধরনের শুল্কসুবিধা পেলে এসব দেশের সঙ্গে প্রতিযোগিতা আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেমের মতে, আগামী সময়ে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানিকে একাধিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কনীতির কারণে চীনা পণ্যের ইউরোপমুখী প্রবণতা বাড়লে প্রতিযোগিতা আরও তীব্র হতে পারে। এর পাশাপাশি ভিয়েতনামের অবস্থান এবং ভারতের নতুন শুল্কসুবিধাও বাংলাদেশের ওপর চাপ তৈরি করতে পারে।
তিনি ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে বাণিজ্যচুক্তি নিয়ে আলোচনা এগিয়ে নেওয়া, বিকল্প রপ্তানি বাজার খোঁজা এবং পণ্যের বৈচিত্র্য বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। এ ছাড়া এলডিসি উত্তরণকে কেন্দ্র করে সম্ভাব্য ঝুঁকি চিহ্নিত করতে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ে বিশেষায়িত কারিগরি দল গঠনের পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।
২০২৯ সালের পর রপ্তানি কমার ঝুঁকি
বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা (ডব্লিউটিও) ও জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়নবিষয়ক সংস্থা আঙ্কটাডের যৌথ গবেষণার বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, ২০২৯ সালের পর ইউরোপের বাজারে বাণিজ্যসুবিধা না থাকলে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি ২০ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে। এর ফলে বছরে ৫ থেকে ৭ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে।
ওভেন পোশাকের কয়েকটি বিভাগে ঝুঁকি বেশি হতে পারে। শার্ট, নারীদের সুতির পোশাক এবং মিশ্র কাপড়ের জ্যাকেটের অর্ডার ভারতীয় উৎপাদকদের কাছে চলে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। পাশাপাশি উচ্চমূল্যের ফ্যাশন পোশাক ও আধুনিক স্পোর্টসওয়্যারেও প্রতিযোগিতা বাড়তে পারে।
তবে বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের কিছু শক্তিশালী দিকও রয়েছে। বিপুল পরিমাণ মৌলিক পোশাক উৎপাদনের সক্ষমতা, দীর্ঘদিনের রপ্তানি অভিজ্ঞতা এবং দক্ষ ব্যবস্থাপনা এ খাতের গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ। পরিবেশবান্ধব কারখানার ক্ষেত্রেও বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্য অবস্থান রয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, বিশ্বের শীর্ষ ১০০ পরিবেশবান্ধব বা লিড-সার্টিফায়েড কারখানার অর্ধেকের বেশি বাংলাদেশে অবস্থিত।
শ্রম ব্যয়ের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশ কিছুটা সুবিধা পেয়ে থাকে। শিল্পসংশ্লিষ্টদের দাবি, বাংলাদেশের তুলনায় ভারতে পোশাকশ্রমিকদের মাসিক মজুরি প্রায় ২০ থেকে ৪০ ডলার বেশি। তবে দীর্ঘ মেয়াদে শুধু কম শ্রম ব্যয়ের ওপর নির্ভর না করে উৎপাদনশীলতা বাড়ানো প্রয়োজন বলে মনে করছেন তাঁরা।
বিশ্লেষকদের ধারণা, প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়া না হলে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি তাৎক্ষণিকভাবে বড় ধরনের পতনের মুখে না পড়লেও সময়ের সঙ্গে ইউরোপের বাজারে অংশ কমে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে চারটি করণীয়
ইউরোপের বাজারে অবস্থান ধরে রাখতে পোশাকশিল্পসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা চারটি বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন।
প্রথমত, সরবরাহের সময় কমানো। উৎপাদন থেকে পণ্য সরবরাহ পর্যন্ত সময় কমিয়ে ৩০ থেকে ৪০ দিনের মধ্যে নিয়ে আসার লক্ষ্য নির্ধারণ করা প্রয়োজন।
দ্বিতীয়ত, বন্দর ও কাস্টমস ব্যবস্থার উন্নয়ন। চট্টগ্রাম বন্দরের কার্যক্রমে দক্ষতা বাড়ানো এবং শুল্কায়ন ও পণ্য খালাসের জটিলতা কমিয়ে পরিবহন ব্যয় নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।
তৃতীয়ত, প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো। আধুনিক যন্ত্রপাতি, দক্ষ শ্রমশক্তি এবং উন্নত উৎপাদন ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে কম সময়ে মানসম্মত পোশাক তৈরির সক্ষমতা বাড়াতে হবে।
চতুর্থত, পণ্যে বৈচিত্র্য আনা। সাধারণ সুতির টি-শার্টের পাশাপাশি স্পোর্টসওয়্যার, টেকনিক্যাল টেক্সটাইল এবং উচ্চমূল্যের সংযোজিত পোশাক উৎপাদনে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান ধরে রাখতে শুল্কসুবিধার পাশাপাশি দ্রুত পণ্য সরবরাহ, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, রপ্তানি পণ্যে বৈচিত্র্য এবং কার্যকর নীতিসহায়তা নিশ্চিত করা জরুরি। ভারতসহ প্রতিযোগী দেশগুলোর সক্ষমতা বাড়ার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে পারলে বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের জন্য নতুন সুযোগও তৈরি হতে পারে।
এনএইচ
















