মানসম্মত শিক্ষার অভাবে দেশে বাড়ছে বেকারের সংখ্যা। কমছে বেসরকারি কর্মসংস্থান। কঠিন সঙ্কটে পড়েছেন বাংলাদেশের বেকাররা। সাম্প্রতি বাংলাদেশ ক্ষুদ্র কৃষক উন্নয়ণ ফাউন্ডেশন এর পরীক্ষায় অংশ নেওয়া বেকারদের সাথে কথা বলে এ তথ্য জানা যায়।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায় যে, সামান্য কটি পদের পরিবর্তে পরীক্ষা দিতে আসা হাজার হাজার পরীক্ষার্থীকে দেখে মনে হল আমি কি স্বপ্ন দেখছি নাকি সত্যি, যদিও দেখে অবাক হয়েছিলাম কিন্তু বাস্তব ছিল আসলে সত্যি।
রাজধানী মিরপুর গালর্স ল্যারেটরী ইনিস্টিটিউট এর সামনে অপেক্ষায় রয়েছে কয়েক হাজার শিক্ষার্থী। বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলা থেকে এরা এসেছে স্বপ্ন পুরণের জন্য আসলে কি তাদের স্বপ্ন পুরণ হবে।

বাংলাদেশে বিপুল সংখ্যক উচ্চশিক্ষিত তরুণ-তরুণী বেকার হয়ে ঘরে বসে আছেন।
অনেক জায়গায় পরীক্ষা দিয়েও কাঙ্ক্ষিত চাকরি না মেলায় অনেকের মধ্যেই হতাশা কাজ করছে।
দেশের শীর্ষস্থানীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো থেকে পাশ করেও দেখা যায় অনেকে ৩/৪ বছর ধরে বেকার ।
সমাজবিজ্ঞানে পাশ করা মোঃ. ফারুক হোসেন বলেন, “আমরা যারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ি সবারই বিসিএস’র প্রতি একটা অন্যরকম প্যাশন থাকে। কিন্তু এক্ষেত্রে এত বেশি দীর্ঘসূত্রিতা আমাদের অনেক সময় দিতে হচ্ছে। ৩৪তম বিসিএস শুরু থেকে গেজেট হওয়া পর্যন্ত সময় লেগেছে আড়াই বছর।”
মাদারীপুর থেকে আসা হাবিবুর রহমান বলেন, আমি অনার্স পাস করেছে ৪ বছর আগে কিন্তু চাকরির পরীক্ষা দিতে দিতে আমি হাফিয়ে গেছি আর পারছি না।

২০১১ সালে মাস্টার্স শেষ করে হন্যে হয়ে সরকারি-বেসরকারি চাকরি খুঁজছেন দেবাশীষ বিশ্বাস।
নিজের পরিস্থিতি তুলে ধরে তিনি বলেন, “সরকারি চাকরির জন্য একশোর মতো পরীক্ষা দিছি, প্রাইভেট চাকরিও দেড়শর মতো হয়ে গেছে। প্রাইভেট চাকরিতে রিটেন টেস্টেও টিকে যাচ্ছি। এর পর একটা পর্যায়ে এসে লোকে বলে, এখানে রেফারেন্স দেয়ার মতো কেউ কি আছে এখানে? পরিচিত না থাকলে আমাদের মতো সাধারণ ছাত্রদের জন্য চাকরি বাকরি পাওয়াটা ডিফিকাল্ট হয়ে গেছে।”
সরকারি কর্ম কমিশনের তথ্য অনুযায়ী ৩৭তম বিসিএস এর জন্য আবেদন পড়েছে ২ লাখ ৪৪ হাজার।
বিসিএস পরীক্ষায় আবেদনকারীর সংখ্যাই সরকারি চাকরির প্রতি আকর্ষণ এবং একই সাথে বেকারত্বের চিত্র তুলে ধরে।

ড. মো. সাদিক, চেয়ারম্যান, পিএসসি
পিএসসি চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ সাদিক বলেন, “যে কোনও দেশে সরকারি এবং বেসরকারি পর্যায়ে নিয়োগের মাধ্যমেই কিন্তু বেকারত্বের সমাধান হবে। সরকারের যেসব মন্ত্রণালয় বা বিভাগ আছে তাতেই সবাই নিয়োগ পাবেন তা নয়”।
তিনি বলেন, ২৭টি ক্যাডারে ৭৯ ক্যাটাগরির লোক নিয়োগ করা হয়। এটি সময় সাপেক্ষ কাজ। তবে এক বছরের মধ্যে একটি বিসিএস এর সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা তারা কাজ করছেন।
এদিকে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বেরিয়ে শিক্ষার্থীরা অধিকাংশই বেসরকারি নানা প্রতিষ্ঠানে যোগ দিচ্ছেন।
সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়েরও অনেকেও সরকারি চাকরি অপেক্ষায় বসে থাকতে চান না।
কিন্তু গবেষকরা দেখছেন, বেসরকারি খাতেও ইদানীং কর্মসংস্থান কমে যাচ্ছে।

ছেলেদের পাশাপাশি মেয়েরাও অপেক্ষার প্রহর গুনছে স্বপ্ন বাস্তবায়নের আশায়।
পরিসংখ্যান ব্যুরোর সর্বশেষ রিপোর্ট বলছে ২ লাখ ৫৫ হাজার গ্র্যাজুয়েট বাংলাদেশে সম্পূর্ণ বেকার।
কর্মসংস্থান এবং বেকারত্ব নিয়ে কাজ করছেন বিআইডিএস-এর গবেষণা পরিচালক রুশিদান ইসলাম রহমান।
বেকারত্বের পেছনে বাংলাদেশে মানসম্মত শিক্ষার অভাব একটি বড় কারণ উল্লেখ করে মিসেস রহমান বলেন, ভাল চাকরির আশা করে শিক্ষিত ছেলে মেয়েরা যে সময়টা নষ্ট করছে এটি দেশের শ্রমশক্তির বড় অপচয়।

পরীক্ষা হওয়ার কথা ২.৪৫ মিনিটে কিন্তু সেই পরীক্ষা হয়েছে এজন্য পরীক্ষা কেন্দ্রের ওয়ালের সাথে বসে অপেক্ষার প্রহর গুনছে এসব পরীক্ষার্থী।
শিক্ষাবিদ ড. মোহাম্মদ জাফর ইকবাল বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের হাতে জিপিএ-৫ তুলে দেওয়া হচ্ছে। শিক্ষার্থীরা এটা অর্জন করছে না। ফলে আমাদের জিপিএ-৫ প্রাপ্ত শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়ছে, মান বাড়ছে না।’
কলামিষ্ট রাজু আহম্মেদ বলেন, রাষ্ট্রকে নির্ধারণ করতে হবে, সে কেমন প্রজন্ম কামনা করছে এবং তাদের লক্ষ্য কি হবে । রাষ্ট্রের লক্ষ্য যদি সামগ্রিক কল্যান হয় তবে অন্তত শিক্ষাখাতকে সবধরণের দুর্নীতি থেকে মুক্ত রাখতে হবে এবং শিক্ষাক্রমকে সাজাতে হবে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনানুযায়ী ।
মাছরাঙা টেলিভিশনের যে ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের মূখ্য আলোচ্য বিষয় হয়েছে সে ভিডিওটি দর্শন করে যদি রাষ্ট্রে ঘুম না ভাঙ্গে তবে সেটা এ জাতির জন্য সত্যিই দুর্ভাগ্যের হবে । অন্তত আমার পক্ষ থেকে, আমি ঐ শিক্ষার্থীদেরকে মোটেও দোষারোপ করতে পারছি না ।
ব্যর্থের দিকে যদি আঙুল তুলতেই হয় তবে সেটা রাষ্ট্রের শিক্ষাব্যবস্থার ভগ্নদশার দিকেই প্রথমে তুলব । কেননা বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় বর্তমানে যে অরাজকতা চলছে এমনটা বোধহয় স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসে দ্বিতীয়বার ঘটেনি । বারবার পাঠ্যক্রম পরিবর্তন, পরীক্ষা পদ্ধতি নিয়ে নানামূখী ব্যর্থ পর্যবেক্ষণ, প্রশ্নপত্র ফাঁস, যে কোন উপায়ে শিক্ষার হার বাড়ানোর অঘোষিত উদ্যোগ, পরীক্ষার খাতা সঠিকভাবে মূল্যায়িত না হওয়াসহ নানাবিধ সমস্যা জর্জরিত গোটা শিক্ষাখাত ।
শিক্ষক ও শিক্ষার পরিবেশ দ্বারা অসম্ভব রকমের কোচিং মুখী হতে শিক্ষার্থী ও অভিভাবককে বাধ্য করণ এবং বাজারে নোট গাইডের সয়লাব শিক্ষার্থীদের সুপ্ত মেধাবিকাশকে ঘোর তিমিরে ছুঁড়ে ফেলেছে । রাষ্ট্র পরীক্ষার্থী উৎপাদন করতে পারলেও শিক্ষার্থী জন্ম দিতে ব্যর্থ হয়েছে তুমুলভাবে । মানহীন শিক্ষাদ্বারা জাতীয় উন্নতির প্রত্যাশা করা কল্পনায় বাসতুল্য ।
জাগরণ চাই, জ্ঞানীর জাগরণ জ্ঞান চর্চার পথে । একমাত্র রাষ্ট্রের কঠিন নীতিই পারে আমাদের স্বপ্নের বাস্তবায়ন । জিপিএ-৫ প্রাপ্ত কতিপয় শিক্ষার্থীর জ্ঞানের পরিধি দেখে আমরা যেটুকু লজ্জিত হয়েছি সেটুকু লজ্জার শঙ্কা যদি রাষ্ট্রের সূচনা থেকে থাকতো তবে শিক্ষা ব্যবস্থায় এমন ধ্বসের কোন আশঙ্কা থাকতো না । যাইহোক, আঘাতের মাধ্যমেই মানুষকে শিখতে হয় ।
রাষ্ট্র যদি এমন তিক্ত অভিজ্ঞতার দ্বারা তার সিদ্ধান্ত না বদলায় সেটা আত্মহত্যা তুল্য হবে বলে মনে করছি । রাষ্ট্রের উন্নতির স্বার্থে শিক্ষাব্যবস্থাকে নিয়ে নতুন করে ভাবুন । মাত্র একটি দশকের চেষ্টায় আমরা বদলে যাওয়া বাংলাদেশ উপহার পেতে পারি ।
রাষ্ট্র যদি স্বার্থক শিল্পীর মত শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যত গড়ে দিতে পারে তবে নিকট আগামীতেই আমরা স্বাক্ষী হব একদল দক্ষ জনশক্তির সাক্ষাৎ পেতে । পেয়ে যাবে দেশেপ্রেমের মন্ত্রে উদ্বুদ্ধ একদল তরুণ তুর্কী, যারা অকুতোভয়ী হয়ে বাংলাদেশের নামটি তুলে দিবে বিশ্ব মঞ্চে ।
এমন সোনার বাংলাদেশের স্বপ্ন কি রাষ্ট্র বাংলাদেশের নাই ? থাকলে, সময়টা বদলানোর সময় আমাদের মানসিকতার ও ইচ্ছার । সংস্কারের শুরুটা শিক্ষাখাত এবং এর সাথে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের থেকেই হোক । কেননা পরিবর্তন সূচিত হওয়ার এটাই গুরুত্বপূর্ণ আশ্রম ।
এমআর





