বাংলাদেশের ইতিহাসের ২০১৪ সালের জাতীয় নির্বাচন বহুল আলোচিত। ২০০০ সাল থেকে আমি পঞ্জিকা দেখা শিখেছি। আব্বুকে কাজে সহযোগিতা করা একদম ছোট বেলার অভ্যাস। আমার বাবা শিক্ষকতার পাশাপাশি দাদার রেখে যাওয়া এবং নিজের উপার্জনে কেনা জমির কিছু অংশ নিজেই আবাদ করেন। বিদ্যালয় থেকে ফিরে বিকেলে আব্বু মাঠে যাওয়ার সময় আমাকে সাথে নিয়ে যেত। খেলা বাদ দিয়ে মাঠে যেতে খারাপ লাগলেও আব্বুর সাথে মাঠে যেতাম।

অনেক জিজ্ঞাসা করত ‘ভাই, আজ কয় তারিখ?’ আব্বু হুট করে তারিখটা বলে দিত। চিন্তা করতাম কি করে সম্ভব। ঘরের পাঠ খড়ির বেড়ার সাথে একটা পঞ্জিকা ঝোলানো ছিল। মাঝে মাঝে চেয়ারে দাঁড়িয়ে চোখ বুলাতাম পঞ্জিকায়। জানুয়ারি, ফেব্রুয়ারি.....জুলাই.......মাসের নামগুলো উচ্চারণ করে পড়তাম। এভাবে একদিন পুরো পঞ্জিকার বিষয়টা বুঝে ফেললাম।

এরপর ২০০১ সাল থেকে নির্বাচন কী তা বুঝতে শিখি। ২০০১ সালে অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচন দিয়ে আমার জীবনে নির্বাচনী জ্ঞান অর্জন শুরু। আমাদের এলাকায় (পাবনা সদর) নির্বাচনের দিনে ভোটারদের ফ্রি পরিবহণের ব্যবস্থা থাকত। প্রাথমিক পর্যায়ে নির্বচন সম্পর্কে আমার ধারণা ছিল নির্বাচনের দিনে রিক্সা করে আম্মু-আব্বুরা ভোট দিতে যাবে আর আমি তাদের সাথে ভোট কেন্দ্রে যাব। গ্রামের মানুষ সে দিন কাজ-কর্ম বন্ধ রেখে নির্বাচনী কেন্দ্রে ভীড় জমাবে। সারাদিন ভোটা-ভুটি শেষে সন্ধ্যায় ফল ঘোষণা হবে।

২০০১ সালের নির্বাচন দেখার পর নির্বাচন সম্পর্কে উপরিক্ত ধারণা হয়। ধারণা হয় নির্বাচন মানে আমেজ। গ্রামের বাজার-ঘাটে মানুষের আলোচনার মধ্যমনি নির্বাচন। সর্বস্তরের মানুষের মধ্যে উত্তেজনা। নিজ দলের শ্রেষ্ঠতা তুলে ধরে মিছিল। সূর্য ঘুমাতে যাওয়ার আগমূহুর্তে বাজারে বাজারে জনসভায় নির্বাচনী বক্তব্যের উষ্ণ আওয়াজ। তবে ২০০৮ সলের ডিসেম্বর মাসের নির্বাচনে ধারণার বেশ খানিকটা পরিবর্তন আসল। আরো পরিবর্তন আসল ২০১৪ সলের জানুয়ারি’র নির্বাচন এবং নির্বাচনের আগে পরে ঘটে যাওয়া ঘটনা অবলোকন করে।

যারা ২০১৪ সালের নির্বাচন দিয়ে নির্বাচন কী? তা বোঝা শিখেছেন, তাদের কাছে মনে হয় নির্বাচন বিষয়ে খুব ভালো মন্তব্য আশা করা যায় না। সে যাই হোক, নির্বাচন যেমনই হোক আগামীর নির্বাচন হবে গণমানুষের জন্য। দেশের কল্যাণে, দশের কল্যাণে। এটাই কামনা।

গত নির্বাচনে সর্বাধিক আলোচিত ব্যক্তি ছিলেন বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসাইন মোহাম্মদ এরশাদ। নির্বাচনে নিজ দলের অবস্থান নিয়ে সকাল-বিকাল মত পরিবর্তনের কারণে তিনি সবচেয়ে বেশি আলোচিত হয়েছেন। ২০১৪ সালের নির্বাচন থেকে তিনি একটি উপাধী লাভ করেন। উপাধিটি ‘থুথু বাবা’শিরানামে উল্লেখ করা হয়েছে। দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে একটি দলের একজন কেন্দ্রীয় নেতা তাকে এ উপাধী দেন। তিনি তাকে ‘থুথু বাবা’উল্লেখ করার পাশাপাশি বলেন, ‘এরশাদের কথার কোন মূল্য নেই।’এ থেকে খুব সহজেই ধারণা করা যায় তিনি এরশাদের সকাল-বিকাল বাণী পরিবর্তনের কারণেই তাকে ‘থুথু বাবা’বলেছেন।

যাদের জীবনে নির্বাচনী ধারণা ২০১৪ সাল থেকে শুরু তাদের মনে ধারণা হতে পারে যে, নির্বাচন মানে কথার ডিগবাজি। হাস্য রস। পুলিশের ধর-পাকড়ের ভয়ে নিজ গৃহে ঘুমানো সুজোগ নেই। সর্বোপরি ভোট না দিয়েও নেতা পাওয়া যায় এবং ভোট না নিয়েও নেতা হওয়া যায়। যদি এই ধারণা থাকে তবে চাই না তার ধারাবাহিকতা হোক তাদের মনে। ফিরে যাক আগের সেই আমেজ আর উদ্দিপনাময় নির্বাচনী ধারণায়।

থুথু বাবা তার বাণী পরিবর্তন করেছে তার নিজের টাকা খরচ করে। তার দলীয় টাকা খরচ করে। দেশের মন্ত্রী-এমপিদের বেতন ভাতা আসে সাধারণ মানুষের ট্যাক্স থেকে। সংসদের সামনে মানুষের কাছে হাত পাতা বৃদ্ধা আর ফুটপাতে রাত কাটানো রহিমাদের কেনা লবণের ট্যাক্সের টাকাও আছে সংসদের এসির বাতাসের সাথে। যে সংসদ ঘামে ভেজা টাকার ট্যাক্সে সাংসদের শরীরের ঘাম ঝরানো বন্ধ করে সেই মহান সংসদে দাঁড়িয়ে ‘থুথু বাবা’সাজার কোন সুযোগ নেই।

২০১৮ সালের কোটা সংস্কার আন্দোলন শতভাগ শিক্ষিত মানুষের আন্দোলন। মুলা ঝুলিয়ে পবিত্র আত্মাদের (সাধারণ শিক্ষার্থী) ঠকানো যাবে না। আপনার প্রতিটি কথা বিশ্লেষণ করার ক্ষমতা আপনার সচিব বা মন্ত্রীদের না থাকলেও পবিত্র আত্মাদের সেই শক্তি আছে। কোটা আন্দোলনকে গলার কাঁটা না বানিয়ে দ্রুত সাধারণ শিক্ষার্থীদের ন্যায্য দাবি মেনে নিন। আপনাকে দেখে যেন আগামী প্রজন্মের মনে মুনাফিক শব্দটি মনে ভেসে না ওঠে।

তারুণ্যের একটা ধর্ম আছে। অন্যায়ের প্রতিবাদ মনে মনে ঘৃণা করেই ক্ষ্যান্ত হওয়া তারুণ্যের ধর্ম নয়। বরং মরণের ভয়কে পিছে ফেলে প্রতিবাদের চূড়ান্ত রূপে অবতীর্ণ হয় সে। আপনাকে ‘থুথু বাবা’জাতীয় একটি উপাধী দিয়েই ক্ষ্যান্ত হবে না। যদি আপনি বিপথ অনুসরণ করেন। এখানে বিপথ বলতে অন্যায্য। মনে মনে মুনাফিক উপাধী দিয়ে ঘৃণা নিয়ে বসে থাকবে না। তারুণ্যের চূড়ান্ত রূপ সম্পর্কে আপনার নিশ্চয় খুব ভালো ধারণা আছে। যদি ধারণায় মরিচা আছর করে তাহলে ৫২-এর ইতিহাসটা আরেক বার রিভিশন দিয়ে নিন। অথবা থুথু বাবাকে গৃহ শিক্ষক রেখে ৯২-এর অভিজ্ঞতা সম্পর্কে কিছু স্পষ্ট ধারা সঞ্চয় করুন। কোটা সংস্কারের দাবিটি কিন্তু মোটেও অন্যায্য নয়। ইতিহাস সাক্ষী, ছাত্রসমাজ কোন দিন অন্যায্য দাবি নিয়ে মাঠে নামেনি।

সাইফুল্লাহ হিমেল

সাংবাদিক ও শিক্ষার্থী, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়।