‘সবাইকে বলছি কাউকে ছাড় দিবি না। ছাত্রদল,বাম ,সাংস্কৃতিক জোট,সংবাদিক কাউকেই না’ গত মঙ্গলবার দুপুরে বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত এক সাংবাদিককে মারধরের নির্দেশ দেওয়ার পর নিজ সংগঠনের নেতা-কর্মীদের এভাবেই নির্দেশ দিয়েছেন জাবি শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক রাজীব আহমেদ রাসেল।
জানা যায়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা চলাকালীন প্রধান ফটকে ফজলে রাব্বি (২৩) নামে এক বহিরাগত বাস থেকে চাঁদা তুলছে এমন সংবাদের ভিত্তিতে সেখানে যান অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষার্থী ও দৈনিক কালবেলা’র বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি মো: মুসা। ঘটনার সত্যতা পেলে ওই বহিরাগতকে ধরে প্রক্টর অফিসে নিয়ে আসার সময় ছাত্রলীগের ভর্তি সহায়তা কেন্দ্রের সামনে আসলে অভিযুক্তকে ছিনিয়ে নিয়ে শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক রাজীব আহমেদ রাসেলের অনুসারীরা মারধর শুরু করে।
এ সময় মারধরের ছবি তুলতে গেলে রাজীবের নির্দেশে ছাত্রলীগের সাংগাঠনিক সম্পাদক মুরশিদুর রহমান আকন্দ, আইন বিষয়ক সম্পাদক আবু সুফিয়ান চঞ্চল, উপ-গণযোগাযোগ বিষয়ক সম্পাদক সাদ্দাম হোসেন, কার্যকরী সদস্য অভিষেক মন্ডল, আল-বেরুনী হল (সম্প্রসারিত ভবন) এর সভাপতি সুমন সরকার সহ ছাত্রলীগের ১২-১৫ জন নেতাকর্মী মুসাকে মারধর করে এবং মোবাইল কেড়ে নিয়ে ধারণকৃত ছবি ও ভিডিও ডিলিট করে দেয়।
“ছাত্রলীগ কী জিনিস আজ আমি তোকে দেখাব। আমার কাজে বাধা দিস? সাংবাদিক হয়েছিস? আমাদেরকে পুলিশের হাতে তুলে দিবি? তার আগে তোকে হাসপাতালে ভর্তির ব্যবস্থা করছি। ওই,ওকে পিটিয়ে চামড়া তুলে দে”গত ৮ জুন রাতে এক নারীকে অপহরণ চেষ্টায় বাধা দিলে এভাবেই বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যম অধ্যায়ন বিভাগের শিক্ষার্থী ও বিডিনিউজ টুয়েন্টিফোর ডটকমের বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি মো: শফিকুল ইসলামকে পেটাতে নির্দেশ দেন শাখা ছাত্রলীগের ধর্ম বিষয়ক সম্পাদক মহিতোষ রায় টিটু (ইতিহাস-৪০)। এমন নিদের্শের পরই রড-কাঠ-শিকল আর তালা দিয়ে পিটিয়ে জখম করে টিটুর নেতৃত্বে সহ-সম্পাদক ইকরাম উদ্দিন অমি (মার্কেটিং-৪০) ছাত্রলীগকর্মী ইকরাম আহমেদ নাহিদ (পরিসংখ্যান-৪৩) সহ ১২-১৪ জন নেতাকর্মী। এ ঘটনায়ও আইন বিষয়ক সম্পাদক আবু সুফিয়ান চঞ্চলের সম্পৃক্ততা ছিল।
এদিকে ২০১৪ সালে ইতিহাস বিভাগ সংসদ নির্বাচনে জাল ভোট দিতে বাঁধা দেয়ায় বাংলাদেশ প্রতিদিনের তৎকালীন প্রতিনিধি নাহিদুর রহমান হিমেলকে পিটিয়ে রক্তাক্ত করেছিলেন এই টিটু।
গত ৫ জুন সন্ধ্যায় বিশ্ববিদ্যালয়ের নাটক ও নাট্যতত্ত¡ বিভাগের শিক্ষার্থী এবং বিডিপ্রেস ডট নেটের ক্যাম্পাস প্রতিনিধি আবু রায়হানকে মারধর করে ছাত্রলীগ কর্মী শরীফ হোসেন লস্কর (নৃবিজ্ঞান-৪২) এবং রিয়াজুল ইসলাম (বাংলা-৪৪)।
তাদের সবার অপরাধ তারা ছাত্রলীগের কাজে বাঁধা দিয়েছে। সাংবাদিকরা হয়তো জানত না এসব ‘সোনার ছেলেদের’কাজে বাঁধা দেওয়ার পরিণতি কি! আর না জানার কারণেই গত ছয় মাসে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা তিনজন সাংবাদিকে পিটিয়ে বুঝিয়ে দিয়েছে তাদের কাজে বাঁধা দেওয়া যাবে না!
এসব ঘটনার পর সাংবাদিকরা মারধরের কারণ জানতে চাইলে তারা তাদের উদ্ধোত্যপূর্ণ বক্তব্য দিয়ে প্রমাণ করেছেন তারা কাউকে পরোয়া করে না । “ক্যাম্পাসে সবাইকে মারার ক্ষমতা রাখে ছাত্রলীগ” রাজীব আহমেদ রাসেল। “অনেক সাংবাদিক পিটাইছি, সাংবাদিক পেটালে কিছুই হয় না।” মহিতোষ রায় টিটু।
বাস্তবাতাও তাই, তাদের কিছুই হয় না। কোন ঘটনা ঘটলে সংগঠন থেকে ‘সাময়িক বহিষ্কার’করা হয় আবার সময়ের স্রোতে বহিষ্কারকারী-বহিষ্কৃত সবাই ভুলে যায়। ২০১৪ সালের মার্চে বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগ গুলাগুলির ঘটনায় মহিতোষ রায় টিটুকে একদফা ‘সাময়িক বহিষ্কার’করেছিল।
সেই বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার না করেই শফিকুল ইসলামকে মারধরের পরই আবার বহিষ্কার করে ছাত্রলীগ। অর্থাৎ মরা মানুষকে আবার মারা! শফিকুল ইসলাম ও আবু রায়হানকে মারধরের পৃথক ঘটনায় জাবি শাখা ছাত্রলীগের পাঁচ নেতাকে বিভিন্ন মেয়াদে বহিস্কার ও ক্যাম্পাসে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।
গত ২১ অক্টোবর রাতে অনুষ্ঠিত বিশেষ সিন্ডিকেট সভায় এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। তবে ঘোষণার একমাস পার হয়ে গেলেও এখনো প্রজ্ঞাপন জারি করেনি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। জানা গেছে, সামনে নতুন কমিটি দেওয়াকে কেন্দ্র করে বহিস্কৃত এসব নেতাদের ‘মৌখিক বহিস্কৃতাদেশ’প্রত্যাহার করাতে প্রশাসনে চলছে জোর তদবির।
এদিকে গত ৩১ জুলাই বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের উদ্যোগে কর্মীসভার আয়োজন করা হলে সেখানে ২০১৪ সালের ২১ আগস্ট মওলানা ভাসানী হলে হামলার ঘটনায় হল আজীবন বহিষ্কৃত মো. এ কে খায়রুজ্জামান সঞ্চয় ও বিভিন্ন মেয়াদে বহিষ্কৃত মহিতোষ রায় টিটুসহ বির্তকিত বেশ কয়েকজন নেতা-কর্মীকে উপস্থিত থাকতে দেখা গেছে।
এসব বিষয়ে জানতে জাবি শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি মাহমুদুর রহমান জনির সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ছাত্রলীগ আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। কেউ অপরাধ করলে অবশ্যই শাস্তি পাবে। তবে মূসাকে মারধরের বিষয়টিকে একটি ভূল বোঝাবোঝি উল্লেখ করে বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করে পরে জানানো হবে বলে জানান তিনি।
সমাজে সু-শাসনের অভাবেই একের পর এক হামলা হচ্ছে বলে মনে করেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ^বিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যম অধ্যয়ন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক শেখ আদনান ফাহাদ। তিনি বলেন, “সমাজে সু-শাসন প্রতিষ্ঠা করতে গেলে অবশ্যই সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। অন্যায়ের প্রতিবাদ করে থাকে বলে সবাই সাংবাদিকদের শত্রæ মনে করে। জাবিতে কর্মরত সাংবাদিকদের ক্ষেত্রেও এই কথাটি প্রযোজ্য। আমি চাই সাংবাদিকদের উপর হামলার বিষয়টিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে প্রশাসন অপরাধীদের সঠিক বিচার করবে।”
জাবি প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক তানজিদ বসুনিয়া বলেন, “সৎ ও বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে বরাবরই ক্ষমতাসীন ছাত্র সংগঠন এর বিরোদ্ধে ছিল। এরকম ন্যক্কারজনক ঘটনার সাথে যেসব সন্ত্রাসীরা জড়িত তাদের দ্রুত এবং উপযুক্ত বিচার দাবী করছি।”
সাংবাদিকদের মারধরের ঘটনায় প্রক্টর অধ্যাপক তপন কুমার সাহা বলেন, “অভিযোগ পত্র পেয়েছি। তবে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ চাওয়া হয়েছে। তা পেলেই তদন্ত সাপেক্ষে ব্যবস্থা নেয়া হবে।”
রাইয়ান/এআই





