আদমজী ক্যান্টমেন্ট কলেজের সাবেক শিক্ষার্থী ও ঝিনাইদহ জেলার মহেশপুর উপজেলার দরিদ্র পিতার একমাত্র ছেলে আব্দুন নূর অয়ন। অনেক দিনের স্বপ্ন ছেলেকে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াবেন।
আর সেই স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতেই চার লাখ টাকা তুলে দিয়েছিলেন জালিয়াতি চক্রের হাতে। চান্স পেয়ে স্বপ্ন বাস্তবায়নে অনেকদূর এগিয়েও গিয়েছিল। কিন্তু সেই স্বপ্নই যেন দু:স্বপ্ন হয়ে দেখা দিল বৃহস্পতিবার দুপুরে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘সি ইউনিট’ কলা ও মানবিক অনুষদের ২০১৬-২০১৭ শিক্ষাবর্ষের প্রথমবর্ষ স্নাতক (সম্মান) শ্রেণির ভর্তি পরীক্ষায় প্রত্নতত্ব বিভাগে ভর্তি হতে এসে ধরা পড়েছে সে।
এই ঘটনায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফলিত রসায়ন বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী তারিকুল ইসলাম তুশিনের জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া গেছে। সে অমর একুশে হলের আবাসিক শিক্ষার্থী।
মঙ্গলবার এই প্রতিবেদকের কাছে একটি অভিযোগ আসে, রোল নং- ৩৪০৯৮৯। পজিশন- ৪৪ তম (বিজ্ঞান বিভাগ) জালিয়াতির মাধ্যমে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পেয়েছে।
পরবর্তীতে তার প্রবেশ পত্র হাতে আসলে সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে তাকে ফোন করে কৌশলে বিভিন্ন তথ্য নেওয়া হয়। ক্যাম্পাসে এসে দেখা করতে বললে সে দেখা করতে অস্বীকৃতি জানায় এবং বলে বৃহস্পতিবার ভর্তি হতে এসে দেখা করবে।
তাৎক্ষাণিক অয়ন বিষয়টি ঢাবির শিক্ষার্থীকে জানালে সে বলে, “ও আমাদের লোক, বুয়েটে পড়ে। সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে তোমার কাছ থেকে টাকা নিতে চাইছে। তুমি চিন্তা করো না।” সেই রাতেই কুষ্টিয়া থেকে একটি বাংলালিংক নম্বও থেকে ফোন করে একাধিকবার জানতে চায়, “আপনি কে?
কোথাকার কত বড় সাংবাদিক হয়েছেন?” পরিচয় না দিয়ে তার পরিচয় জানতে চাইলে সে বলে, “ঠিক আছে, আপনি থাকেন আপনার মত, বিষয়টা আমি উপর থেকে হ্যান্ডেল করতেছি।”
বুধবার মৌখিক পরীক্ষার ফলাফল দিলে দেখা যায় অয়ন প্রত্নতত্ব বিভাগে চান্স পেয়েছে। বিষয়টি প্রত্নতত্ব বিভাগ ও ডীন অফিসকে জানালে তারা প্রয়োজনীয় সহযোগীতার আশ্বাস দেয়। ফলে আজকে ভর্তি হতে আসলে তাকে চ্যালেঞ্জ করে প্রত্নতত্ব বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক নুরুল কবির।
দেখা যায়, তার ওএমআর শিটের স্বাক্ষর,হাতের লেখা ও মায়ের নামের সাথে আজকের স্বাক্ষর, লেখা ও মায়ের নামের গড়মিল। পরে তাকে আরও যাচাই- বাছাই করেও বিভিন্ন বিষয়ে গড়মিল পেলে তাকে ডীন অফিসে নিয়ে যাওয়া হয়।
এবং একই প্রশ্নে আবারও তার পরীক্ষা নেওয়া হলে মাত্র ১৫টির সঠিক উত্তর দিতে পারে সে। তখন জিজ্ঞাসাবাদের একপর্যায়ে সে জালিয়াতির মাধ্যমে ভর্তির কথা স্বীকার করে বলে,‘ সাথে চার লাখ টাকায় চুক্তি করি। পরীক্ষার আগের দিন আমার কাছ থেকে প্রবেশ পত্র নিয়ে যায় এবং অন্য একজন পরীক্ষা দেয়।
কিন্তু কে কিভাবে পরীক্ষা দিয়েছে তা আমি জানি না। চান্স পাওয়ার পর মৌখিক পরীক্ষা দিয়ে যাই এবং আজকে ভর্তি হতে এসেছি।’ টাকা কোথায় দেওয়া হয়েছে জানতে চাইলে বলে, ‘আমি ও আমার বাবা অমর একুশে হলের গেস্ট রুমে টাকা দিয়ে আসি।’ বিকেলে তাকে ও তার বাবাকে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে।
কলা ও মানবিকী অনুষদের ডীন অধ্যাপক ড. মোজাম্মেল হক ও প্রত্নতত্ব বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক নুরুল কবির বলেন, ‘কিছু অসঙ্গতি পাওয়ায় ভাইবার সময়ই আমরা তাকে মার্ক করে রাখি। পরে বিভিন্ন মাধ্যমে আরও তথ্য পেলে আজকে আমরা তাকে চ্যালেঞ্জ করি। এতে অভিযোগ স্বীকার করলে আমরা তাকে প্রশাসনের হাতে তুলে দিয়েছি।’
তার পিতা মাসুদ রানার কাছে জানতে চাইলে বলেন, ‘আমাদের ভূল হয়ে গেছে। এরকম হবে বুঝতে পারিনি। ছেলের ভালোর জন্যই তো এমনটা করেছিলাম।’
এই বিষয়ে জানতে চাইলে ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে তুশিন বলেন, ‘বিষয়টি এত বড় হবে বুঝতে পারিনি। আমি শুধু অয়নের কাছ থেকে টাকা নিয়েছি বকিটা বড় ভাইয়েরা জানেন।
তবে বড় ভাইদের পরিচয় জানতে চাইলে তা জানাতে অস্বীকার করে এবং এ বিষয়ে সংবাদ প্রকাশ না করতে অনুরোধ জানান তিনি।’
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান নিরাপত্তা কর্মকর্তা সুদীপ্ত শাহীন বলেন, সে আমাদের কাছে জালিয়াতির কথা স্বীকার করেছে। আমারা তাদের দুজনকে আশুলিয়া থানা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করেছি।
আশুলিয়া থানার এসআই রাসেল মোল্লা বলেন, জিজ্ঞাসাবাদের পর তাদের বিরোদ্ধে পরীক্ষায় জালিয়াতি সংক্রান্ত আইন অনুযায়ী তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।
রাইয়ান/ মাহমুদ





