ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের আল-হাদিস এন্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের শিক্ষক, পিস টিভি বাংলার আলোচক ও বিশিষ্ট ইসলামী চিন্তাবিদ প্রফেসর ড. আ ন ম খন্দকার আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর (৫৫) ও তার ব্যক্তিগত গাড়ি চালক সেন্টু জোয়ার্দর (৪৫) সড়ক দূর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন।
বুধবার সকাল ৮টা ১০ মিনিটে মাগুরার পারনান্দুয়ালী ৩ নম্বর ব্রিজ এলাকায় তার ব্যক্তিগত প্রাইভেট কারের সাথে একটি কাভার্ট ভ্যানের মুখোমুখি সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।
এতে ঘটনাস্থলে গাড়ি চালক সেন্টু এবং গুরুতর আহত আবস্থায় ড. জাহাঙ্গীর কে মাগুড়া সদর হাসপাতালে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। এ ঘটনায় আহত দু’জনকে ঢাকায় পাঠানো হয়েছে।
এদিকে তিনি পরিকল্পিত হত্যার শিকার হয়েছেন কিনা এ নিয়ে ক্যাম্পাস ও কুষ্টিয়া, ঝিনাইদহ এলকায় ব্যাপক আলোচনা সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। পরিকল্পিতভাবে গাড়ি চাপা দিয়ে হত্যা করা হয়েছে এমন কথা মানুষের মুখে মুখে ছড়িয়ে পরেছে। তিনি দেশের এবং মুসলিম সমাজের বিরুদ্ধে খ্রিষ্টান মিশনারীর অবস্থান তুলে ধরে বিভিন্ন আলাচনা ও সভাসমাবেশ করতেন।
এবিষয়ে মাগুরার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার তরিকুল ইসলাম বলেন, যে কাভার্ট ভ্যনের সাথে সংঘর্ষ হয়েছে সেটাকে আমরা জব্দ করেছি”
তার মৃততে তার পরিবারে ও বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক শিক্ষার্থীদের মাঝে চলছে শোকের মাতম। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় ঝিনাইদহ কেন্দ্রীয় ঈদগাহ মাঠে তার জানাজা অনুষ্ঠিত হবে বলে নিহতের পরিবার সুত্রে জানা গেছে।
আল-হাদীস বিভাগের সভাপতি প্রফেসর ড. নাসির উদ্দিন দ্য রিপোর্টকে জানান, আমরা বাংলাদেশ থেকে একজন ইসলামী চিন্তাবিদ হারালাম। আমরা বিভাগের পক্ষ থেকে তার পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানাই ও নিহতের আত্মার মাগফিরাত কামনা করছি।
দেশে বিদেশে তারা অসংখ্য শুভাকাংঙ্খী ও ছাত্র রযেছে। তিনি এক ছেলে ও ৩ মেয়ে রেখে দুনিয়া ছেড়ে চলে গেলেন।
ড. আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীরের সংক্ষিপ্ত জীবনী :
১৯৬১ সালে ঝিনাইদহ ধোপডাঙ্গা, গোবিন্দপুরে খন্দকার আনোয়ারুজ্জামানের পরিবারে জন্ম গ্রহন করেন ড. জাহাঙ্গীর। ছোটবেলা থেকেই ছিলেন জ্ঞান পিপাসু ও তীক্ষ্ণমেধার অধিকারী।
ইসলামী শিক্ষার প্রতি ছোট বেলা থেকেই ছিলেন খুবই অনুরাগী। ছোটবেলা ঝিনাইদহ শহরের মাদরাসা তার প্রাথমিক শিক্ষা সমাপ্ত হয়।
এরপর তিনি ঝিনাইদহ আলিয়া মাদরাসা থেকে ১৯৭৩ সালে দাখিল, ৭৫ সালে আলিম ও ৭৭ সালে ফাস্ট ক্লাস নিয়ে সফলতার সাথে ফাযিল পাশ করেন।
১৯৭৯ সালে ঢাকা আলিয়া মাদরাসা থেকে আল-হাদীস বিভাগ থেকে ফ্স্ট ক্লাস নিয়ে কামিল পাস করেন।
ইসলামী শ্ক্ষিার পাশাপাশি তিনি জেনারেল শিক্ষার জন্য মাগুরার এইচ এস সোহরাওয়ার্দী কলেজ থেকে ১৯৮০ সালে এইচএসসি পাশ করেন।
এরপর সৌদি আরবের আল ইমাম মুহাম্মদ বিন সাউদ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৮৬ সালে আরবি ভাষা ও সাহিত্যর উপর ফাস্ট ক্লাস নিয়ে বিএ অনার্স শেষ করেন। এরপর ১৯৯২ সালে আরবি ব্যাকারণের উপর একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমএ পাস করেন এবং ১৯৯৮ সালে আরবি ব্যকারণের উপর ওই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন।
তিনি সৌদিতে থাকা অবস্থায় প্রতিদিন বাসে যাতায়াত করাকালে পবিত্র কুরআন মূখস্ত করেন। এসয় তিনি লেখা পড়ার পাশাপাশি বিভিন্ন গ্রন্থের ইংরেজী থেকে আরবি অনুবাদ করেন।
তিনি আরবির পাশাপাশি ইংরেজী, হিন্দি, উর্দু, বাংলা সমান পারদর্শী ছিলেন। তার প্রায় ১০টির বেশি গবেষণা কর্ম রয়েছে।
দেশে ফিরে এসে ১৯৯৮ সালে কুষ্টিয়ার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের আল-হাদীস এন্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের প্রভাষক হিসেবে যোগদান করেন। প্রভাষক থাকা অবস্থায় তিনি আইন ও আল ফিকহ বিভাগের পার্টটাইম হিসেবে শিক্ষককতা করেন। ২০০৯ সালে তিনি ওই বিভাগে অধ্যাপক হিসেবে যোগদান করেন। এছাড়াও পিস টিভি, ইসলামিক টিভি, এটিএন ও এনটিভিসহ বিভিন্ন টিভিতে ইসলামী টক শো করেন। এতে তিনি দেশে-বিদেশে ইসলামী চিন্তাবিদ হিসেবে ব্যাপক আলোচিত হয়ে ওঠেন।
সর্বশেষ তিনি গত মাসে তুরস্কের হাইরাত ডাকফি ফাউন্ডেশন আয়োজিত ‘এ লাইফ ডিভোটেড টু কোরান’শীর্ষক আর্ন্তজাতিক সেমিনারে অংশ গ্রহণ করেন। গত বছরে আরব আমিরাতে মাস ব্যাপী টিভি টক শোতে অংশগ্রহণ করেন। আমেরিকার ‘দ্য ইন্টারন্যাশনাল ইউনাইটেড শিরাহ কনভেনশন ২০১৩ তে অংশগ্রহণ করেন। লিবিয়া, ইতালি, মিশরসহ বিভিন্ন দেশের আমন্ত্রণে তিনি সেমিনার সিম্পোজিয়ামে অংশগ্রহণ করেন।
তার রচিত গ্রন্ত সমুহ :
তিনি ১৯৯৫ সালে সৌদিতে থাকা অবস্থায় ‘এ ওম্যান ফ্রম ডিসার্ট’২০০০ সালে কুরান সুন্নাহর আলোকে ইসলামী আকীদাহ, ইসলামে পর্দা, ২০০২ সালে বিখ্যাত ইহয়াউস সুনান, রাসুলের সুন্নাত পদ্ধতি, রাহে বেলায়েত, হাদীসের নামে জালিয়াতি, মুসলমানী নেসাব, বাংলাদেশে উশর ও যাকাতের গুরুত্ব, বুহুস ফি উলুমুল হাদীসসহ বিভিন্ন ভাষায় প্রায় অর্ধশত বই রচনা করে ইসলামের খেদমত করেছেন।
এছাড়ার তিনি ঝিনাইদহ বাস টার্মিনালের পাশে আস-সুন্নাহ ট্রাস্ট নামে একটি জনকল্যাণমূলক ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠা করেছেন, সেখানে তিনি দিনি ইলম, হাদীস, কুরান শিক্ষাসহ বিনামূল্যে চিকিৎসা প্রদান, গরীবদের সহায়তা, ইসলামের প্রচারাভিযান, খ্রিস্টান মিশনারির বিরুদ্ধে দেশের বিভিন্ন জেলায় গনজাগরণ, জন সচেতনতায় মাহফিল ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করে ইসলামের খেদমত করেছেন। আল্লাহ তাকে জান্নাতের সর্বোচ্চ মর্যদা দান করুন।
এমআইএস





