রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে চলমান সান্ধ্য কোর্স ও বর্ধিত ফি'র বিরুদ্ধে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের উপর হামলার ঘটনায় গত ০২ ফেব্রুয়ারি থেকে অনিদ্দিষ্ট কালের জন্য বন্ধ হয়ে যায় ক্যাম্পাস।
এছাড়াও ২০১৩ সালের শেষ দিকে গত নভেম্বর ও ডিসেম্বর মাস দুটিসহ বিভিন্ন সময়ে আনিয়ন্ত্রিত হরতাল-অবরোধে বেশির ভাগ সময় ক্যাম্পাস বন্ধ থাকে। এ নিয়ে প্রায় চার মাস ধরে শিক্ষার্র্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়মিত কার্যক্রম থেকে দুরে রয়েছে। এতে ক্যাম্পাস জীবনে অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় ৩০ হাজার নিয়মিত শিক্ষার্থী।
চলতি বছরে দুই মাসে ক্লাস হয়েছে মাত্র ৮ দিন। গত বছর ৩৬৫ দিনের মধ্যে ক্লাস-পরীক্ষা হয়েছে মাত্র ১১৩ দিন। জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বরের শেষ পর্যন্ত মোট ১৯৫ দিন কার্যদিবস ধরা হলেও ৮২ দিনই স্থানীয় ও জাতীয়ভাবে হরতাল-অবরোধে ক্লাসহীন ছিল ক্যাম্পাস। ফলে সেশনজট দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে।
শিক্ষার্থীদের গণআন্দোলনের প্রেক্ষিতে অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ করে দেয়া হয় বিশ্ববিদ্যালয়। বন্ধের ২৪ দিন পার হলেও রাবি খুলতে পারেনি প্রশাসন। দীর্ঘ দিন বন্ধ থাকায় প্রতিটি বিভাগ প্রবল সেশনজটে পড়ছে সকল শিক্ষার্থী। তবে ক্যাম্পাস খোলার পিছনে এখন সান্ধ্যকোর্স, শিবির-ছাত্রলীগ ও শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের নিয়ে প্রশাসনের বাধা রয়েছে বলে গোয়েন্দা সূত্রে নিশ্চিত হওয়া গেছে।
এর আগে রাবি উপাচার্য মুহম্মদ মিজানউদ্দিন গত ০২ ফেব্রুয়ারির ভাঙচুরের পর বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন একাডেমিক ভবন, আবাসিক হল ও শিক্ষকদের আবাসিক ভবনগুলো মেরামত করার পর ক্যাম্পাস খুলে দেয়া হবে বলে জানিয়েছিলেন।
তবে বন্ধের ২৪দিন পার হলেও বিশ্ববিদ্যালয় খুলে দেবার ব্যাপারে আজও তেমন কোন সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি প্রশাসন। অজুহাত হিসেবে সংস্কার করতে বিলম্বকে সামনে আনা হচ্ছে। কিন্তু বন্ধ ক্যাম্পাস না খোলার পেছনে প্রশাসনের অন্য কোন উদ্দেশ্য আছে কি না তা নিয়ে শিক্ষার্থীদের মনে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
জানা যায়, গত ২ ফেব্রুয়ারি বর্ধিত ফি প্রত্যাহার ও সান্ধ্যকোর্স বাতিলের দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের উপর হামলার পর ওই দিন সন্ধ্যায় জরুরী সিন্ডিকেট বৈঠকে ক্যাম্পাস বন্ধ ঘোষণা করা হয়। এর আগে ২০০৯ সালে শিবির নেতা শরীফুজ্জামান নোমানী হত্যার পর টানা ৮০ দিন বন্ধ ছিল ক্যাম্পাস। পাঁচ বছর পর আবারও গত ৩ ফেব্রুয়ারি ক্যাম্পাস অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয়। তবে ক্যাম্পাস খুলতে প্রশাসনের কোনো প্রতিবন্ধকতা না থাকলেও কয়েকটি সমস্যা তাদের সামনে এখন চরমে দেখা দিয়েছে।
বিশেষ করে নতুন ভবে চালুকৃত বাণিজ্যিক সান্ধ্যকোর্স নিয়ে প্রচন্ড দ্বি-মুখি চাপে রয়েছে রাবি প্রশাসন। শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের কারণে সকল প্রকার বর্ধিত প্রত্যাহার করা হলেও সান্ধ্যকোর্স এখনও বন্ধ করেনি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। বন্ধ বিশ্ববিদ্যালয় চালু করতে সান্ধ্যকেই এখন প্রধান হুমকি হিসেবে দেখছেন প্রশাসনের দায়িত্বরত ব্যক্তিরা। সান্ধ্যকোর্স নিয়ে তারা এখন শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের দ্বিমুখি চাপে পরেছেন।
২০০৭ সাল থেকে রাবিতে সান্ধ্যকোর্স চালু থাকলেও এ বছরের জানুয়ারি থেকে সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ৭টি বিভাগে নতুন করে চালু করা সেই কোর্স। সান্ধ্যকোর্স বন্ধের দাবি নিয়ে গণআন্দোলনে নামে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। এই আন্দোলনের পর ক্যাম্পাস বন্ধ হয়ে গেলেও চালুর পর আবারও তারা আন্দোলনে নামার হুমকি দিয়েছে বলে জানা গেছে। এদিকে সান্ধ্যকোর্স নিয়ে শিক্ষকদের সাথে প্রশাসনেরও দূরত্ব সৃষ্টি হয়েছে।
শিক্ষার্থীদের আন্দোলন চলাকালে গত ৩১ জানুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডীন অধ্যাপক মো. আনসার উদ্দিনসহ ৭টি বিভাগের সভাপতিদেরকে সান্ধ্যকোর্স স্থগিত বা বাতিল করতে বললেও তারা এর বিরোধিতা শুরু করে। পরের দিন থেকে তারা সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের সকল বিভাগের ক্লাস-পরীক্ষা বন্ধ ঘোষণা করে। এতে প্রশাসন চাপের মুখে পড়ে। তাদের দাবি, বিশ্ববিদ্যালয়ে অন্য বিভাগে সান্ধ্যকোর্স চালু থাকলে তারা ৭ বিভাগের কোনোটিতেই বন্ধ করবে না।
অবৈধভাবে প্রকাশ্যে অস্ত্র উচিয়ে গত ২ ফেব্রুয়ারি আন্দোলন দমাতে সাধারণ শিক্ষার্থীদের উপর সন্ত্রাসী হামলা চালায় ছাত্রলীগ। ফলে অনেকটাই কোনঠাসা হয়ে পরেছে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। তাদের বেশ কয়েক জনের বিরুদ্ধে মামলা হওয়ায় অনেক নেতাকর্মী গাঁ ঢাকা দিয়েছে। ক্যাম্পাস খোলা হলেও ছাত্রলীগের ২০ জনের বেশি নেতাকর্মী গ্রেফতারের ভয়ে ক্যাম্পাসে আসবে না বলে জানা গেছে।
আন্দোলনের পর থেকে শিক্ষকরা পাঠদানসহ বিভিন্ন একাডেমিক বিষয় উৎসাহ অনেকটাই হারিয়ে ফেলেছেন। তাই ক্লাসে ফিরে তাঁরা আগের মতো আর শিক্ষার্থীদের পাঠদান করাতে পারবেন না বলেই আশঙ্কা করছেন অনেকেই। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকেও শিক্ষকদের সাথে অনেকবার এসব বিষয় নিয়ে কথা বলা হয়েছে। শিক্ষকরাও আশঙ্কা করছেন শিক্ষার্থীরা হয়তো আগের মতো আর তাদেরকে সম্মান করবেন না। এছাড়াও বন্ধ ক্যাম্পাসে প্রথম বর্ষে শিক্ষার্থীদের ভর্তি কার্যক্রম চলছে। এসময় বিশ্ববিদ্যালয় খোলার পরে তাতে ব্যাঘাত ঘটতে পারে বলে আশঙ্কা করছে প্রশাসন।
এসব স্বীকার করে বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংযোগ দপ্তরের প্রশাসক মো. ইলিয়াস হোসেন বলেন, আন্দোলনের কারণে স্বাভাবিক ভাবেই ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্কে কিছুটা ভাটা পড়েছে। এ সম্পর্কের উন্নতি ঘটতে সময় লাগবে বলে জানান তিনি।
রাবি উপাচার্য অধ্যাপক মুহম্মদ মিজানউদ্দিন বলেন, বিভিন্ন ইস্যুতে বিশ্ববিদ্যালয়ে সেশনজটের সৃষ্টি হয়েছে। তবে শিক্ষকদের সাথে কথাও বলেছি আগামী গ্রীষ্মকালিন ছুটি বন্ধ করে শিক্ষার্থীদের ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে হবে।
ক্যাম্পাস খোলার বিষয়ে নির্দিষ্ট তারিখ বলা যাচ্ছে না উল্লেখ করে তিনি বলেন, সব কিছু ঠিক হতে মার্চের দ্বিতীয় সপ্তাহ্ পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। এরপর হয়তো ক্যাম্পাস খোলা হবে।
[b]ঢাকা, ২৭ ফেব্রুয়ারি (টাইমনিউজবিডি.কম)// এনএস[/b]
শিক্ষা
সেশনজটে অনিশ্চয়তায় রাবি শিক্ষার্থীরা
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে চলমান সান্ধ্য কোর্স ও বর্ধিত ফি'র বিরুদ্ধে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের উপর হামলার ঘটনায় গত ০২ ফেব্রুয়ারি থেকে অনিদ্দিষ্ট কালের জন্য বন্ধ হয়ে যায় ক্যাম্পাস।





