জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্মাণাধীন বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর হল। দেখতে দেখতে পাঁচ বছর পেরিয়ে গেছে। পাঁচবার সময় বৃদ্ধি করা হয়েছে। কিন্তু এখনো পযন্ত নির্মাণ কাজ শেষ করতে পারেনি নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান। সর্বশেষ গত ৩১শে ডিসেম্বর হল বুঝিয়ে দেওয়ার কথা থাকলেও তা দিতে ব্যর্থ হয়েছে তারা। ফলে আবারও সময় বৃদ্ধি করা হয়েছে। আর শেষ সময়ে এসে শুরু হয়েছে প্রশাসনের তোরজোর। তবে এই সময়ের মধ্যে দুইটি ছাত্রী হলের নির্মাণকাজ শেষ হয়ে গেছে। সংশ্লিষ্টদের সাথে কথা বলে জনা যায় প্রশাসনের অবহেলার কারণেই কাজ শেষ হতে এতো দেরি হচ্ছে। ফলে তীব্রআসন সংকটে পড়তে যাচ্ছে ২০১৬-১৭ শিক্ষাবর্ষের নবাগত শিক্ষার্থীরা।

বিশ্ববিদ্যালয় প্রকৌশল অফিস সূত্রে জানা যায়, ২০১২ সালের জানুয়ারি মাসে একনেকে অনুমোদিত একটি প্রকল্পের অধীনে এ হলের নির্মাণকাজ শুরু হয়। প্রকল্পের আওতায় হলটি নির্মাণের জন্য ২০১২ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর কার্যাদেশ অনুযায়ী ১২ কোটি ৭২ লক্ষ ৬৯ হাজার ৯ শত ৯ টাকা ৬০ পয়সা ব্যয়ে এ হলের নির্মাণকাজ শুরু করে ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান মেসার্স মল্লিক এন্টারপ্রাইজ।

কার্যাদেশ অনুয়াযী ৪৫০ দিনের মধ্যে অর্থাৎ ২০১৪ সালের ২ জানুয়ারী কাজ শেষ করার কথা ছিল। কিন্তু নির্ধারিত সময়ে কাজ সম্পূর্ণ না হওয়ায় ২০১৫ সালের ২০ ডিসেম্বর পর্যন্ত তিনবার সময় বৃদ্ধি করা হয়। তারপরেও কাজ শেষ না করতে পারায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ৪র্থ বারের মতো ২০১৬ সালের ৩১ডিসেম্বর পর্যন্ত মেয়াদ বৃদ্ধি করে। কিন্তু ঐ মেয়াদেও কাজ শেষ না হলে আবারও মার্চের ১৫ তারিখ পর্যন্ত (অলিখিত) মেয়াদ বৃদ্ধি করে প্রশাসন। আর হল পুরোপুরি ভাবে প্রস্তুত হতে এখনো প্রায় আড়াই মাস লাগবে বলে জানিয়েছে প্রকৌশল অফিস। অন্যদিকে প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে ২০১৬ সালের জুন মাসেই।

Ju Hall 2

                    দ্বিতীয় তলার সংযোগ অংশের কাজ শুরু না হওয়ায় এভাবেই পড়ে আছে।      ছবি: পিযূষ ভৌমিক

সরেজমিনে দেখা যায়, হলের কয়েকটি অংশের ঢালাইরে কাজ এখনো শেষ হয়নি। দরজা- জানালার রংয়ের কাজ চলতেছে। অন্যদিকে নির্মাণ কাজ শেষ না হতেই কয়েকটি রুমের দেয়ালের রং উঠে যাচ্ছে। হলের সামনের সংযোগ সড়কের টেন্ডার সবে মাত্র হয়েছে। টাকা না পাওয়ায় এখনো কাজ শুরু হয়নি। এটি শেষ হতে প্রায় একমাস লাগবে বলে জানা গেছে।

অন্যদিকে হলের সামনের অংশটি খেলার মাঠ হওয়ার কথা থাকলেও সেখানে দীর্ঘদিন মাটি ফেলে রাখার কারণে তা শক্ত হয়ে স্তুপাকৃতি ধারণ করেছে। আর্থিক সংকট থাকার ফলে বর্তমানে মাঠের কোন পরিকল্পনা নেই প্রশাসনের। কোনরকমে মাটি সমান করে রাখা হবে। পরবর্তীতে টাকা আসলে মাঠের কাজ করা হবে। এখনো পর্যন্ত বিদ্যুৎ ও পানির সংযোগ আনা হয়নি। কোথা থেকে আনা হবে তারও কোন পরিকল্পনা হয়নি। আর আপাতত গ্যাস সংযোগ পাওয়ার কোন সম্ভবনা নেই। এমনটাই জানালেন সংশ্লিষ্ট কর্তাব্যক্তিরা।

JU Hall 3

                                                                   নির্মাণ কাজে ব্যস্ত শ্রমিকরা। সম্প্রতি তোলা ছবি।        ছবি: পিযূষ ভৌমিক

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের নিয়োজিত তদারক মো. ফরিদ বলেন, ‘প্রশাসনের অবহেলা আর দক্ষ তদারকির অভাবেই কাজ শেষ হতে দেরি হচ্ছে। সময়মতো টাকা না আসায় আমরা কাজ করতে পারিনি। এমনকি একটি বিল পাস করতে তিন- চার মাস পর্যন্ত সময় নিয়েছে প্রশাসন। ফলে কাজ ধীর গতিতে এগিয়েছে। আর আগামী ১৫ই মার্চের মধ্যে কাজ শেষ করতে বলেছে, এর আগেই আমরা কাজ বুঝিয়ে দিতে পারব।’

এদিকে যথাসময়ে হলের কাজ সম্পূর্ণ না হওয়ায় ২০১৬-১৭ শিক্ষাবর্ষে প্রথম বর্ষ স্নাতক (সম্মান) শ্রেণীতে ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থীরা চরম আসন সংকটে পড়বে। আগামী ৯ মার্চ থেকে তাদের ক্লাস শুরু হবে। ফলে এই হলে বরাদ্দপ্রাপ্তদের কোথায় রাখা হবে জানতে চাইলে হল প্রভোস্ট অধ্যাপক ড. অসিত বরণ পাল বলে, হল চালু হতে আরও প্রায় দুই থেকে আড়াই মাস লাগবে। এই সময়ে তাদের অন্যান্য হলে রাখা হবে। কিন্তু অন্যান্য হলেও তো আসন সংকট চরমে! জনতে চাইলে বললেন, ‘আমরা সর্বোচ্চ তদারকি করছি দ্রæত কাজ শেষ করার জন্য। আর সাময়িক একটু অসুবিধা তো হবেই।’                         

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা জানান, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের নিয়মিত তদারকির অভাবের কারণেই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটি নিয়মিত কাজ করছে না। প্রতিষ্ঠানটি কিছু অংশের কাজ শেষ করে ওই অংশের অর্থ পরিশোধ না হওয়া পর্যন্ত বাকি অংশের কাজ অসমাপ্ত রাখে। এ কারণেই নির্মাণকাজে ধীরগতির সৃষ্টি হচ্ছে।

ju Hall 1

              নির্মাণাধীন রবীন্দ্রনাথ হল। অর্থের অভাবে সামনের অংশের এখনো কোন পরিকল্পনা না নেওয়ায় এভাবেই পড়ে রয়ছে।           ছবি: পিযূষ ভৌমিক

এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান প্রকৌশলী আবদুস সালাম মো. শরীফ প্রশাসনের দূর্বলতার কথা উল্লেখ করে বলেন, ‘একটি প্রকল্পের অধীনে কোন কাজ করলে পুরো টাকা একসাথে পাওয়া যায় না। এতে কাজের ক্ষেত্রে সমস্যা হয়।’ কিন্তু এরই মধ্যে ছাত্রীদের দুটি হল সম্পন্ন হলেও রবীন্দ্রনাথ কেন দেরী হচ্ছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এখানে কার নামে স্থাপনাটি হচ্ছে তার উপর অর্থ আগে বা পড়ে আসে। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এখানে একটি বড় কারণ।

এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় উপাচার্য অধ্যাপক ড. ফারজানা ইসলাম বলেন, ‘ফান্ডিং সমস্যা আমাদের একটি বড় সমস্যা। এজন্য ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান মাঝে মাঝেই কাজ বন্ধ রেখেছে। এখন নিয়মিত তদারক করা হচ্ছে। আশা করছি নির্ধারিত সময়েই কাজ শেষ হয়ে যাবে। আর গ্যাসের বিষয়ে উর্দ্ধতন কতৃপক্ষের সাথে আলোচনা হচ্ছে। দ্রুতই নতুন তিনটি হলে গ্যাস সংযোগ দিতে পারব।’

জারিফ