বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর ড. একে এম নূর-উন-নবীর অনিয়মের প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে ইউজিসি কর্তৃক গঠিত তদন্ত কমিটি।

তদন্ত প্রতিবেদন শিক্ষা মন্ত্রনালয়ে জমা দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। প্রতিবেদনে মোট ১৬টি অনিয়মের প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে পর্যালোচনা ও পর্যবেক্ষন করে ছয়টি মতামত/সুপারিশ প্রদান করেছে তদন্ত কমিটি।

প্রতিবেদন অনুযায়ী উপাচার্য বিগত দুই বছরে ১৬৫ দিন ক্যাম্পাসে অবস্থান করে ৯ লাখ ৭৪ হাজার চারশত পচাঁনব্বই টাকা আপ্যায়ন বাবদ ব্যয় করেছেন। যা অস্বাভাবিক ও অগ্রহণযোগ্য। এছাড়া তিনি একই সময়ে ট্রেজারার হিসেবেও আপ্যায়ন বাবদ ২ লাখ ১৯ হাজার ৩৩ টাকা ব্যয় করেছেন। যা অনৈতিক।

উপাচার্যের জন্য তিনটি গাড়ির ব্যবহার বিলাসিতা ও অনৈতিক বলে তদন্ত প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। উপাচার্য ভর্তি পরীক্ষার সম্মানী বাবদ তিন বছরে প্রায় ১৬ লাখ টাকা গ্রহণ করেছেন। ভর্তি পরীক্ষার সম্মানীর টাকায় যে উন্নয়ন ফান্ড গঠন করা হয়েছে বলে তিনি জানিয়েছিলেন তার কোনো ডকুমেন্ট তিনি উপস্থাপন করতে পারেননি।

প্রকাশিত প্রতিবেদনের আলোকে জানা যায়, উপাচার্য বিশ্ববিদ্যালয়ে ধারাবাহিক অনুপস্থিত থেকে একাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রমে চরম অচলাবস্থা তৈরি করেছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের গুরুত্বপূর্ণ ১৪ পদে উপাচার্য দায়িত্ব পালন করেছেন।

তার ধারাবাহিক অনুপস্থিতি এসব পদের স্বাভাবিক কার্যক্রমকে বাধাগ্রস্ত করেছে। ড. ওডাজেদ রিসার্স ইনস্টিটিউটের পরিচালক হওয়ার পর গত তিন বছরে গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনায় তিনি কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করেননি।

পুলিশের করা একটি মামলার অজুহাতে উপাচার্য আটজন শিক্ষক-কর্মকর্তার পদায়ন আটকে রাখেন। মামলাটি বর্তমানে নথিজাত হলেও উপাচার্য শিক্ষকদের ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করেছেন। জাল সনদধারী আবু জাফর মো. ইমরান নামের একজনকে উপাচার্যের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বাছাই কমিটির সুপারিশে ২০১৪ সালের মার্চ মাসে প্রভাষক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়।

বিষয়টি জানাজানি হলে উপাচার্য ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করেন। বাতিল আবেদনে নির্বাহী প্রকৌশলী পদে জাহাঙ্গীর আলমকে অতি গোপনীয়তায় নিয়োগ দেন উপাচার্য। নির্মানের দুবছর পরও ক্যাফেটারিয়া ও ডরমেটরি চালু না করা প্রশাসনিক দূর্বলতা প্রকাশ পায়। অনুমোদিত পদে নিয়োগকৃত ৩৩৮ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীকে ইউজিসির অনুমোদিত পদে উপাচার্য ড. একে এম নুর-উন-নবী জ্যেষ্ঠতা লংঘন করে পদায়ন ও বেতনভাতা প্রদান করেছেন।

২০১৪-১৫ শিক্ষাবর্ষে প্রথম বর্ষের ভর্তি পরীক্ষায় অনিয়মের অভিযোগ প্রমানিত হলে অভিযুক্তদের বাঁচাতে উপাচার্য বিষয়টিকে ধামাচাপা দেয়ার চেষ্ঠা করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের সংবিধি-প্রবিধি প্রণয়নে উপাচার্য কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করেননি।

তদন্ত কমিটির সুপারিশ মতে, এক: বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান উদ্দেশ্য শিক্ষা ও গবেষণা কাজ সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার ক্ষেত্রে প্রত্যাশিত নেতৃত্ব প্রদানে উপাচার্য সফল হননি। দুই : উপাচার্যের অব্যাহত অনুপস্থিতির কারণে শিক্ষা, গবেষণা ও প্রশাসনিক কার্যক্রম ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। তিন : বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্পদ রক্ষায় উপাচার্য সচেষ্ট ছিলেন না। চার : বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল নথিপত্রপত্র তিনি নিজ দপ্তরে ও নিজ তত্ত্বাবধানে সংরক্ষণ করার ফলে প্রশাসনের সকল পর্যায়ে আস্থাহীনতা ও প্রশাসনিক বন্ধ্যাত্বের পরিবেশ সৃষ্টি করেছেন। পাঁচ : যেখানে যানবাহনের স্বল্পতা রয়েছে সেখানে উপাচার্যের তিনটি গাড়ি ব্যবহার করা অনৈতিক এবং এতে সরকারের যে আর্থিক ক্ষতি হয়েছে সে দায়িত্ব উপাচার্যের উপর বর্তায়। ছয় : আপ্যায়ন ভাতার নামে উপাচার্য বিভিন্ন সময় যে বিপুল পরিমান অর্থ উঠিয়েছেন তা দুর্নীতির পর্যায়ে পড়ে। ছাত্রভর্তির জন্য উপাচার্য বিপুল পরিমানণ অর্থ গ্রহণ করেছেন। এর ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ে আর্থিক নৈরাজ্য সৃষ্টি হওয়া স্বাভাবিক যার দায় উপাচার্যের ওপর বর্তায় বলে তদন্ত কমিটি মনে করে।

বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সাবেক সভাপতি ড. আর এম হাফিজুর রহমান ও সাবেক সাধারণ সম্পাদক তাবিউর রহমান প্রধান উপাচার্যের বিভিন্ন অনিয়ম উল্লেখ করে তদন্তের দাবি জানালে ইউজিসি সদস্য আখতার হোসেনকে আহবায়ক ও রাবির সাবেক উপাচার্য মিজানুর রহমান ও ইউজিসির অতিরিক্ত পরিচালক ফখরুল ইসলামের সমন্বয়ে তিন সদস্যের একটি শক্তিশালী তদন্ত কমিটি গঠন করে ইউজিসি।

তদন্ত কমিটি গত বছরের ২৬ ও ২৭ ডিসেম্বর বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যারয়ে এসে তদন্ত কার্যক্রম চালায়। যার ধারাবাহিকতায় গত ২ মার্চ এই প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়।

এমএনজে