রাইয়ান বিন আমিন, জাবি প্রতিনিধি: ১৯৫৮ সাল। অধ্যাপক জিল্লুর রহমান সিদ্দিকীর প্রথম আমেরিকা সফর। ঘুরতে বেরিয়ে একদিন তিনি ডেনভারের রকি পর্বত এলাকায় দেখতে পেলেন প্রাকৃতিক ভাবে সৃষ্ট একটি মুক্তাঙ্গন। পাহাড়ের উঁচুভূমিতে একখন্ড সমতল জমি, যার তিন দিক ঘিরে পাহাড়ের ঢালু আর একদিকে খোলা। সেই পাহাড়ের ঢালুই পরিণত হয়েছে দর্শকের গ্যালারিতে। খোঁজ নিয়ে জানতে পারলেন গ্রীষ্মকালে খোলা আকাশের নীচে এই মুক্তমঞ্চে নাট্যাভিনয় হয়ে থাকে।

এরপর দেশে ফিরে এলেন । ১৯৭৬ সালে হলেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য। এই বিশ্ববিদ্যালয়ে এসেই অন্য আর দশটা মানুষের মত এখানকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের প্রেমে পড়ে গেলেন। আর প্রকৃতি প্রদত্ত ঐ মুক্তাঙ্গনের কথা তো তখনও মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে। আর ঘুরপাক খাওয়া সেই মুক্তাঙ্গনকেই এবার বাস্তবে রূপদানের পালা।

ফলে ক্যাম্পসের উঁচু প্রান্তরে একটি উপযুক্ত জায়গা খোঁজা শুরু হল। তবে তা খুঁজতে খুব বেশী সময় লাগেনি। কেন্দ্রীয় খেলার মাঠ ও ক্যাফেটেরিয়ার কাছেই পাওয়া গেল সেই প্রত্যাশিত জায়গা।

স্থপতি বললেন, ঢালুকেই একটি অর্ধবৃত্তাকার গ্যালারির রূপ দেওয়া যাবে। আর গ্যালারির বিপরীত পাশে থাকবে একটি মুক্তমঞ্চ। এরপর ১৯৮২ সালে দেশের প্রথম মুক্তমঞ্চ তৈরীর কৃতিত্ব অর্জন করল জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।

পরবর্তীতে ২০১০ সালের ১৩ই জানুয়ারী সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. শরীফ এনামুল কবীরের সময়ে নাট্যাচার্য সেলিম আল-দীনের নামে এর নামকরণ করা হয়। এই মুক্তমঞ্চের প্রধান বৈশিষ্ট্য হল, এটি এমন ভাবে নির্মাণ করা হয়েছে যাতে স্টেজ থেকে সংলাপ বললে সামনের ও পেছনের সারিতে বসে দর্শকরা সমানভাবে অভিনেতাদের কথা শুনতে পায়।

মঞ্চের বিন্যাস, ডিজাইন ও শব্দের অনুনাদের সাথে মিল আছে বলেই শব্দ শোনা যায় চারপাশ থেকে । মুক্তমঞ্চটি পাহাড়ের পাদদেশে না হলেও এটি ওই আদলেই তৈরী করা হয়েছে। গ্রিক এরিনা মঞ্চের আদলেই স্থপতি আলমগীর কবির তার চমৎকার নির্মাণশৈলী দ্বারা এই মুক্তমঞ্চটি নির্মাণ করেন।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়কে বলা হয়ে থাকে সংস্কৃতির রাজধানী। সংস্কৃতির রাজধানী হিসেবে খ্যাত এই বিশ্ববিদ্যালয়ের যে স্থানটি সবারই নজর কাড়ে তা হল এই ‘সেলিম আল-দীন মুক্তমঞ্চ’।

বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে প্রতিষ্ঠিত কয়েকটি ঐতিহ্যবাহী ভাস্কর্যের পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের এই স্থাপত্যটিও সমানভাবে মুগ্ধ করে সবাইকে। বিশ্ববিদ্যালয়ের যত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হয়ে থাকে তার সিংহভাগই এই মুক্তমঞ্চকে কেন্দ্র করেই হয়ে থাকে। এ মঞ্চকেই বলা হয় ক্যাম্পাসের সংস্কৃতি চর্চার উর্বর ভূমি ।

বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃতি চর্চার প্রধান কেন্দ্র মুক্তমঞ্চটি কয়েক দশক ধরেই বাঙালীর হাজার বছর ধরে গড়ে উঠা সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে লালন করে আসছে। লাল ইটে নির্মিত এই মঞ্চটির রয়েছে ১৪ টি সিড়ি যেখানে প্রায় দেড় হাজার দর্শক এক সাথে বসে অনুষ্ঠান উপভোগ বসতে পারে।

এ মঞ্চে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও দেশের খ্যাতনামা নাট্য সংগঠন গুলোর নাটক পরিবেশিত হয় প্রায় নিয়মিত। বিশেষ করে মঞ্চ নাটক। এছাড়াও বিভিন্ন কনসার্ট, বিতর্ক প্রতিযোগিতা, গল্প, চলচ্চিত্র প্রদর্শনী আয়োজন করা হয়ে থাকে এ মুক্তমঞ্চে।

জাহাঙ্গীরনগর থিয়েটার প্রতি বছরই আয়োজন করে সপ্তাহব্যাপী নাট্যপার্বণ। অন্যান্য সাংস্কৃতিক সংগঠনও প্রতি বছর নাটক, গল্প বলা, গান, কবিতা আবৃত্তির আয়োজন করে থাকে। বিশেষ করে জানুয়ারী ও ফেব্রুয়ারী এ দুই মাস মুক্তমঞ্চে অনুষ্ঠান লেগেই থাকে।

আর এসব অনুষ্ঠান দেখার জন্য সন্ধ্যা হলেই মঞ্চের আসন চলে যায় শিক্ষার্থীদের দখলে। এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয় ও বিভিন্ন বিভাগের পূনর্মিলনী , শিক্ষা সমাপনী উৎসব ( র‌্যাগ) এবং বিশ্ববিদ্যালয় দিবসও এ মঞ্চে অনুষ্ঠিত হয়।

বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪৪ তম আবর্তনের আন্তজার্তিক সম্পর্ক বিভাগের শিক্ষার্থী আবু রায়হান বলেন, মুক্তমঞ্চে অনুষ্ঠিত বিভিন্ন নাটক আর অনুষ্ঠানগুলো শুধুমাত্র বিনোদনই নয় বরঞ্চ এর সাথে জড়িত সংশ্লিষ্ট কলাকুশলিরা আকারে ইঙ্গিতে বলে যান সমাজের নানান অসঙ্গতি আর অনিয়মের কথাও। আর সেসব কথায় এমন ধার থাকে যে তা সহজেই দর্শকের হৃদয়ে গেঁথে যায়। ফলে বিনোদনের পাশাপাশি তা হয়ে উঠে শিক্ষারও একটি গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থিয়েটারের সাবেক সাধারন সম্পাদক ও ‘ট্রেন টু পাকিস্তান’ নাটকের পরিচারক মঈনুল হক তারিফ বলেন, ‘যেহেতু এটি সেলিম-আল দীন স্যারের নামে নামকরণ তাই আমরা এখানে স্যারকে স্মরণ করেই সংস্কৃতির চর্চা করি । আর এই মুক্তমঞ্চ আমাদের মত দেশের সবার কাছেই একটি পবিত্র স্থান। এবং জাবির কালচার ধরে রাখার জন্যই আমরা এখানে অনুষ্ঠান করে থাকি।’

এমবি