শিক্ষার্থী আত্মহত্যার ঘটনায় ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের প্রভাতি শাখার প্রধান শিক্ষক জিন্নাত আরাকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়েছে। শিক্ষার্থী আত্মহত্যার ঘটনাকে 'বাজে দৃষ্টান্ত' বলে মন্তব্য করেছেন উচ্চ আদালত। এ ঘটনায় উচ্চ আদালতে একটি রিট দায়ের করা হয়। এছাড়া স্বপ্রণোদিত এক আদেশে ঘটনা তদন্তে ৫ সদস্যের কমিটি গঠন করে দিয়েছে হাইকোর্ট।
মঙ্গলবার দুপুরে, ভিকারুননিসা নূন স্কুলের ছাত্রী আত্মহত্যার ঘটনায় হাইকোর্ট স্বপ্রণোদিত হয়ে এই আদেশ দেন।
এর আগে, শিক্ষার্থী আত্মহত্যার ঘটনায় দু'টি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং ভিকারুননিসা নূন স্কুল কর্তৃপক্ষ মঙ্গলবার এ দুটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। দুই কমিটিকে তিনদিনের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।
রবিবার সকালে, ভিকারুননিসা নূন স্কুলের পরীক্ষার হলে বিজ্ঞান বিভাগের নবম শ্রেণির ছাত্রী অরিত্রি অধিকারী মোবাইল ফোনসহ ধরা পড়ায়, তাকে হল থেকে বের করে দেয়া হয়। সোমবার সকালে আরেকটি পরীক্ষায় অংশ নিতে গেলে, তাকে পরীক্ষায় অংশ নিতে দেয়নি স্কুল কর্তৃপক্ষ।
অরিত্রির পরিবারের অভিযোগ, ক্ষমা চেয়ে পরীক্ষা দেয়ার আবেদন করলে অরিত্রি ও তার বাবার সাথে দুর্ব্যবহার করে অফিসকক্ষ থেকে বের করে দেন ভারপ্রাপ্ত প্রিন্সিপাল নাজনীন ফেরদৌস৷ অরিত্রির বাবা দিলিপ অধিকারী বলেন, 'আমি ক্ষমা চাইলাম, এটা তো বার্ষিক পরীক্ষা আর আগামি বছর আমার মেয়ে এসএসসি পরিক্ষা দেবে। কিন্তু তারা বললো, আগামীকাল এসে টিসি নিয়ে যাবেন। আমি আবারও প্রিন্সিপালের কক্ষে গেলে আমাকে বেরিয়ে যেতে বলেন।'
অরিত্রি বাসায় ফিরে সিলিং ফ্যানে ঝুলে আত্মহত্যা করে। পরে তার মরদেহ ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের মর্গে নেয়া হয়। প্রিন্সিপালসহ কিছু শিক্ষকের বিরুদ্ধে ছাত্রী নির্যাতনসহ নানা অভিযোগ তুলে বিচার দাবি করেন অভিভাবকেরা। এ সময় অভিভাবকরা বলেন, 'ছাত্রীদেরকে শিক্ষকরা মানসিক অত্যাচার করে। অনেক সময় ভয়ে তারা বাসায় এসে আমাদেরকে বলেও না।'
অরিত্রির পরিবার ও স্কুলের গভর্নিং কমিটির পক্ষ থেকে প্রিন্সিপালের বিরুদ্ধে আইনগত পদক্ষেপ নেয়ার কথা জানানো হয়। এ বিষয়ে অরিত্রির বাবা দিলিপ অধিকারী বলেন, 'আমি আইনের আশ্রয় নেবো।'
অন্যদিকে, ভিকারুননিসার গভর্নিং কমিটির চেয়ারম্যান গোলাম আশরাফ তালুকদার বলেন, 'আমরা সিদ্ধান্ত নেবো, এর সুষ্ঠু তদন্ত এবং বিচার হবে যাতে আর কাউকে এভাবে জীবন দিতে না হয়।'
এ বিষয়ে অভিযুক্ত ভারপ্রাপ্ত প্রিন্সিপালের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করা হলেও, তিনি নীরব থাকেন।
শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ মঙ্গলবার সচিবালয়ে সাংবাদিকদের বলেন, 'ওই ঘটনার তদন্তে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) ঢাকা আঞ্চলিক কার্যালয়ের পরিচালক মো.ইউসুফকে প্রধান করে তিন সদস্যের একটি কমিটি করা হয়েছে। মাউশির ঢাকা আঞ্চলিক কার্যালয়ের উপ-পরিচালক শাখাওয়াত হোসেন এবং ঢাকা জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা বেনজীর আহমেদকে কমিটিতে রাখা হয়েছে।'
আর ভিকারুননিসার ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ নাজনীন ফেরদৌস জানান, তাদের গঠিত কমিটির নেতৃত্ব দেবেন স্কুলের পরিচালনা পর্ষদের সদস্য মো. আতাউর রহমান। এছাড়া তিন্না খুরশীদ জাহান (নারীদের জন্য সংরক্ষিত পদের অভিভাবক প্রতিনিধি) এবং ভিকারুননিসার শিক্ষক ফেরদৌস বেগম।
মঙ্গলবার ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ সাংবাদিকদের কাছে দাবি করেন, 'নকল করার কারণে ওই শিক্ষার্থীকে টিসি দেয়ার তথ্য সঠিক নয়।' অরিত্রীকে কেউ আত্মহত্যায় প্ররোচণা দিয়েছে কি না- তা তদন্ত কমিটি তদন্ত করে দেখবে বলেও জানান অধ্যক্ষ।
শিক্ষার্থী আত্মহত্যার ঘটনায় 'ক্ষুব্ধ ও মর্মাহত' বলে মন্তব্য করেছেন শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ। মঙ্গলবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে বেইলি রোডে ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজে ক্যাম্পাসে আসে শিক্ষামন্ত্রী। সেখানে তিনি স্কুলের শিক্ষক, অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলেন।
শিক্ষকের কথায় অপমানিত হয়ে আত্মহত্যার ঘটনাকে 'অত্যন্ত হৃদয়বিদারক' বলে মন্তব্য করেন শিক্ষামন্ত্রী। এ ঘটনায় ক্ষোভ জানিয়ে দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার কথাও বলেন।
এদিকে, নবম শ্রেণীর শিক্ষার্থী অরিত্রির আত্মহত্যার ঘটনায় অধ্যক্ষ নাজনীন ফেরদৌসের পদত্যাগের দাবিতে ক্লাশ বর্জন করে বিক্ষোভ করছে ভিকারুননিসা স্কুলের শিক্ষার্থীরা।
এসএম





