‘এই পৃথিবীতে টিকতে হলে হয় তোমাকে পুরোপুরি ধার্মিক হতে হবে, নয়তো পুরোপুরি ভণ্ড হতে হবে। কিন্তু হায়, আমি এদের কোন দলেই নই।' এগুলোই ছিল দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অনার্স শেষ করা মাহবুব শাহীনের শেষ কথা।
চাকরি না পাওয়ার হতাশা থেকে গত সোমবার রাতে আত্মহত্যা করেন মাহবুব শাহীন। আত্মহত্যা করার কিছুক্ষণ আগে রেললাইনে শুয়ে ফেসবুক স্ট্যাটাসে এ কথাগুলো লেখেন তিনি। এরপর নিজেকে চলন্ত ট্রেনের নিচে সঁপে দেন নিজের প্রতি চুড়ান্ত হতাশ এ মেধাবী ছাত্র।
গত সোমবার রাত সাড়ে ৮টার দিকে রাজধানীর খিলগাঁও রেলগেট এলাকা থেকে মাহবুব শাহীনের ক্ষত-বিক্ষত লাশ উদ্ধার করে পুলিশ।
ফেসবুকে তিনি লিখে গেছেন, 'হতচ্ছাড়া নিজেকে দূরে সরিয়ে দিতে যাচ্ছে, যে অপদার্থ কি-না শুধু খেতেই জানে। আমি একটা কমেন্ট লিখেছিলাম, আমার যেতে হবে। তারপর তোমাদের কেউ একজন জানতে চেয়েছ, কোথায় থেকে কোথায় যাচ্ছ? আমি জানি না আমি কোথায় যাচ্ছি। কিন্তু আমি যাচ্ছি। এই অকর্মা নিজেকে ছেড়ে যাচ্ছে।’
মাহবুবের গ্রামের বাড়ি গোপালগঞ্জের মুকসুদপুর উপজেলার মুনিরকান্দি গ্রামে। তিনি ২০০২-২০০৩ শিক্ষাবর্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগ ভর্তি হয়ে ২০১২ সালে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন। তিনি কবি জসীম উদদীন হলের আবাসিক ছাত্র ছিলেন।
আত্মহত্যার কারণ সম্পর্কে শাহীনের বড় ভাই শরীফুল ইসলাম জানান, আত্মহত্যা করার মতো কোনো অবস্থা হয়েছিল বলে তারা মনে করেন না। তবে মাস্টার্স ফাইনাল দেওয়ার পর চাকরি নিয়ে তার ভেতর হতাশা কাজ করছিল।
মাহবুবের ব্যক্তিগত ফেসবুক পেজ ঘেঁটে দেখা যায় তার এ হতাশা একদিনে তৈরি হয়নি। গত কয়েক মাস যাবতই তিনি নিজেকে নিয়ে খুব হতাশ ছিলেন, যা জানিয়েছেন ফেসবুক পোস্টের মাধ্যমে।
গত ২ ফেব্রুয়ারি তিনি ফেসবুক স্ট্যাটাসে লেখেন, অবশেষে উপলব্ধি করতে পারছি, আমি একটা অকর্মা।
মাহবুবের এর পরের স্ট্যাটাসটি ছিল গত ১৭ মার্চ। এদিন তিনি লেখেন ‘আমার চলে যাওয়া উচিত।’ এরই ধারাবাহিকতায় গত ৪ এপ্রিল তিনি লেখেন, ‘আমাকে চলে যেতেই হবে।’
গত পয়লা জুন মাহবুব তার ফেসবুক স্ট্যাটাসে লেখেন, ‘জগতে বেঁচে থাকতে হলে তোমার কিছু গুণ থাকা প্রয়োজন। না থাকলে তোমাকে ছেড়ে যেতেই হবে।
পৃতিবীতে বেঁচে থাকতে হলে, তোমাকে হয় পুরোপুরি ধার্মিক হতে হবে, নয়তো পুরোপুরি ভণ্ড। হয় সৃষ্টিকর্তার প্রতি আত্মসমর্পণ করতে হবে, নয়তো তোমার প্রতি অন্যদের আত্মসমর্পণ করাতে হবে। কিন্তু হায় আমার এসবের কোনো গুণই নাই।’
গত ৪ মে তিনি স্ট্যাটাসে লেখেন, ‘আমি একজন নেতাও নই, শ্রমিকও নই। কিন্তু একজন কেরানি ‘টাইপম্যান’ হিসেবে আমি সমস্যা সৃষ্টিকারী, খুঁতখুতে, স্বেচ্ছাচারী, চন্দ্রাহত এবং খুব বেশি কাপুরুষ। অসুস্থতা সর্বদা আমাকে সঙ্গ দিয়ে সারাজীবন আমাকে পেছনে নিয়ে গেল এবং শেষ পর্যন্ত পরাজিত করে ছাড়ল।’
চলমান জীবনের প্রতি পদে জমা এসব হতাশার ভারে ন্যূজ মাহবুব শাহীন জীবনের কাছে পরাজয় বরণ করে শেষ পর্যন্ত চলেই গেলেন।
[b]ঢাকা, ০৫ জুন (টাইমনিউজবিডি.কম) //এমএ[/b]