রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. খন্দকার ফরহাদ হোসেনের বিরুদ্ধে ২০১৪-১৫ শিক্ষাবর্ষের ভর্তি পরীক্ষার ফিসের টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে।

টাকা জমাদানের রসিদের গড়মিলসহ বিভিন্ন কৌশলে তিনি অনুষদ থেকে মোটা অংকের টাকা হতিয়ে নিয়েছেন বলে একাধিক সূত্রে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

প্রথম মেধা তালিকার ভর্তি প্রক্রিয়া গত ২৯ নভেম্বর শেষ হয়। তবে ডিনের ইশারায় অজ্ঞাত কারণে এখনও দ্বিতীয় মেধা তালিকা প্রকাশ করা হয়নি। এ ধরনের অদক্ষ ও দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যক্তি কিভাবে একটি অনুষদের ডিন পদে দায়িত্ব পালন করছেন তা নিয়ে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে।

সংশ্লিষ্টরা অভিযোগ করেন, বিভাগীয় সভাপতিরা বারবার তাগাদা দেয়ার পরও পছন্দের প্রার্থীকে ভর্তি করাতেই দ্বিতীয় মেধা তালিকা প্রকাশ করছেন না তিনি। এতে ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থী ও তাদের অভিভাবক বিপাকে পড়েছেন।

এ ছাড়া ভর্তির ব্যাপারে বিভাগের কোনো সিদ্ধান্তই গ্রহণ করা হচ্ছে না। এমনকি ইংরেজি বিভাগে ভর্তির জন্য নির্দিষ্ট সংখ্যক শিক্ষার্থী প্রয়োজনীয় নম্বর পাওয়া সত্ত্বেও নিজের পছন্দের প্রার্থীকে ভর্তি করাতে পাশ নম্বর কমিয়ে ১২ করার একক সিদ্ধান্ত নিয়েছেন কলা অনুষদের এই ডিন। অথচ ফল বিপর্যয় হলে কত নম্বরে পাশ ধরা হবে তা নির্ধারণের দায়িত্ব রাখে কেবল মাত্র ভর্তি পরীক্ষা কমিটি।

জানা যায়, নাট্যকলা বিভাগের প্রথম মেধা তালিকার ১০ জনের নাম দিয়ে একটি তালিকা বিভাগে দেন ডিন। এতে যে রোলগুলো উল্লেখ করা হয় তারা অনেকেই ভর্তির যোগ্য না। পরে ২৫ নভেম্বর চারুকলা বিভাগ এ ঘটনার প্রতিবাদ জানিয়ে নিন্দা প্রকাশ করে।

ওই চিঠিতে নাট্যকলা বিভাগের সভাপতি শাহরিয়ার হোসেন উল্লেখ করেন, ‘এ ধরনের ভুলে বিভাগের শিক্ষকরা অপমানিত বোধ করছেন। পাশাপাশি আসন পূরণ ও ভাবমূর্তি বিষয়ে আশঙ্কা প্রকাশও করছি আমরা।’

এর আগে পছন্দের প্রার্থীকে ভর্তি করাতে সাক্ষাৎকারের সময় কৌশলে মেধা তালিকায় এগিয়ে থাকা শিক্ষার্থীদের চয়েস ফরম পূরণ করতে না দিয়ে তাদেরকে ভর্তির সুযোগ থেকে বঞ্চিত করার অভিযোগ ওঠে ওই ডিনের বিরুদ্ধে। আর এসব কর্মকাণ্ড তিনি একাই চালিয়ে যাচ্ছেন। অনুষদভুক্ত বিভাগগুলোর সভাপতিদের না জানিয়েই তার একক সিদ্ধান্তে তিনি ভর্তি কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন। যা ভর্তি পরীক্ষা সংক্রান্ত নিয়মের পরিপন্থি।

এখানেই শেষে নয়, কলা অনুষদ ভুক্ত এ-ইউনিটের ভর্তি প্রক্রিয়ায় ব্যপক অনিয়ম, দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনার পর এবার ভর্তি ফিসের অর্থ হাতিয়ে নিয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এমন অভিযোগের প্রেক্ষিতে তার বিরুদ্ধে ভর্তি পরীক্ষায় আয়-ব্যয়ের অর্থ বণ্টনের অনিয়ম তদন্তে তিন সদস্যবিশিষ্ট একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত ২২ অক্টোবর বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা অনুষদের ভর্তি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। এতে মোট ২২ হাজার ৪৬৩ জন শিক্ষার্থী আবেদন করেন। আবেদনের জন্য নির্ধারিত ফিসের ৪০ শতাংশ বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের ফান্ডে জমা হয়। বাকি ৬০ শতাংশ (৯৪ লাখ ৩৪ হাজার ৪৬০ টাকা) পরীক্ষা গ্রহণের কাজে ব্যয় করা হয়। এর মধ্যে প্রাথমিক খরচ বাবদ ৩৫ লাখ ৫৩ হাজার টাকা দেখানো হয়েছে।

এ পরীক্ষার আনুষাঙ্গিক আয়-ব্যয় অনুষদভুক্ত বিভাগের সভাপতিদের নিয়ে আয়োজিত সভায় গত ২৮ নভেম্বর উপস্থাপন করেন ডিন। এ সময় পরিদর্শন বাবদ প্রক্টর অফিসকে ৬৩ হাজার টাকা পরিশোধের হিসাব দেখানো হয়। কিন্তু পরে প্রক্টর অফিসের ভাউচারে দেখা যায় সেখানে মাত্র ২৭ হাজার ২০০ টাকা প্রদান করা হয়েছে।

ঠিক একইভাবে আপ্যায়ন বাবদ এক লাখ ৮৬ হাজার টাকা ব্যয় দেখানো হয়। কিন্তু গত বছর এ ব্যয় ছিল মাত্র ৮১ হাজার টাকা। এ ছাড়া ডিন অফিসে প্রিন্টার ক্রয় বাবদ ৫০ হাজার টাকা দেখানো হলেও কোনো প্রিন্টার কেনা হয়নি বলে অফিসে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে। অফিস স্টেশনারি ক্রয় বাবদ ১ লাখ ৫৩ হাজার ৮০২ টাকা দেখানো হলেও আদৌ কোনো সামগ্রী ডিন অফিসে নতুন ক্রয় করা হয়নি।

পরীক্ষার পরিদর্শন বাবদ প্রথম সভায় ১৮ লাখ আট হাজার টাকা দেখালেও একদিন পরেই তা বাড়িয়ে ১৯ লাখ ৬৪ হাজার টাকার হিসাব দেখান ডিন। এ ছাড়া চারুকলা বিভাগের ব্যবহারিক পরীক্ষা ও উত্তরপত্র মূল্যায়নের কাজে ৩ লাখ দুই হাজার ৭০০ টাকা দেখানো হয়েছে। যা অকল্পনীয় বলে ডিন অফিস ও ওই বিভাগ সূত্রে জানা গেছে। সভায় এ বিষয়ে বিভাগীয় সভাপতিরা প্রশ্ন শুরু করলে তার কোনো সঠিক উত্তর দিতে পারেননি ওই ডিন। পরে শিক্ষকদের তোপের মুখে অনুষদের সিনিয়র শিক্ষক দর্শন বিভাগের সভাপতি অধ্যাপক আক্তার আলীকে আহ্বায়ক করে তিন সদস্যবিশিষ্ট একটি যাচাই কমিটি গঠন করা হয়।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দফতরের কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারী বলেন, ‘কলা অনুষদের কয়েকজন কর্মকর্তা এসব খরচের রসিদ কখনও দ্বিগুণ আবার কখনও তারও বেশি করে তাদের পরিচিত দোকানিদের কাছ থেকে করে নিয়ে আসেন। এসবের সবই চলে ডিনের প্রত্যক্ষ মদদে।’

এ ব্যাপারে অধ্যাপক ড. খন্দকার ফরহাদ হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগে জন্য কলা অনুষদের ডিন অফিসে যাওয়া হলে তিনি কথা বলতে চাননি। পরে মুঠোফোনে তার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।

ওই অনুষদভুক্ত দর্শন বিভাগের সভাপতি ও তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক অধ্যাপক আক্তার আলী বলেন, ‘আমরা অনুষদের ভর্তি কার্যক্রম নিয়ে অস্বস্তিতে আছি। বিভাগের সভাপতি হিসেবে আমাদের যতটা ভূমিকা পালন করার কথা তার সুযোগ আমাদের দেয়া হচ্ছে না। এ ছাড়া অর্থের অনিয়মের ব্যাপারে যাচাই কমিটির কাজ শুরু হয়েছে। যাচাইয়ের পরেই এ ব্যাপারে সঠিক তথ্য দেয়া যাবে।’

বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার অধ্যাপক এন্তাজুল এম হক বলেন, ‘ভর্তির ব্যাপারটি সাধারণত অনুষদের ভর্তি কমিটি দেখভাল করে। আমাদের কাছে শুধুমাত্র চূড়ান্ত হিসাবটি দাখিল করেন তারা। তবে যদি কোনো গুরুতর অভিযোগ আসে তবে বিশ্ববিদ্যাল কর্তৃপক্ষ এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।’

কেএইচ