“১১ই মার্চ ২০১৬। হলে উঠবেন বলে সুদূর  সাতক্ষীরা থেকে বাবার সাথে এসেছিলেন  গণযোগাযোগ ও  সাংবাদিকতা বিভাগের ৪৫ তম ব্যাচের শিক্ষার্থী সালেহা খাতুন। কারণ রাত পোহালেই তার স্বপ্নের বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম ক্লাস।  কিন্তু হলের সামনে আসার পরই তার চোখ ছলছল।  বরাদ্দকৃত সুফিয়া কামাল হলের নির্মাণ কাজ শেষ না হওয়ায় গেটের তালা তখনো খুলে দেওয়া হয়নি।  হল প্রভোষ্টের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বললেন, নির্মাণ কাজ শেষ হতে আরও একমাস সময় লাগবে, তোমরা অন্য কোথাও থাকার ব্যবস্থা কর।” ক্ষোভ জড়িত কণ্ঠে এভাবেই কথাগুলো বলছিলেন সালেহা।

তিনি বলেন, “সন্ধ্যা থেকে রাত পর্যন্ত অপেক্ষা করে কোনো সমাধান না পেয়ে পরে সাভারে  খালার বাসায় ফিরে গেছি। আমার খুলনা ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স হয়েছিল। কিন্তু আবাসন ব্যবস্থা খারাপ থাকায় আমি খুলনায় না থেকে এখানে এসেছি। কিন্তু এখানকার অবস্থা আরও খারাপ। তাহলে খুলনাই আমার জন্য ভাল ছিল।”

সালেহার  মতো সুফিয়া কামাল হলে ১০৩ জন শিক্ষার্থীর আসন বরাদ্দ দেওয়া হয়। তাদের কেউই এখনো হলে উঠতে পারেননি। কবে পারবেন তাও জানেন না।

গত ১২ই মার্চ ২০১৫-২০১৬ শিক্ষাবর্ষের স্নাতক (সম্মান) ৪৫ তম আবর্তনের শিক্ষার্থীদের ক্লাস শুরু হলেও হলের নির্মাণ কাজ শেষ না হওয়ায় এখনো এই হলের ১০৩ জন নবীণ শিক্ষার্থীর হলে প্রবেশের সৌভাগ্য হয়নি।

আবাসিক বিম্ববিদ্যালয়ের নিয়ম অনুযায়ী ক্লাস শুরুর সাথে সাথেই প্রতিটি শিক্ষার্থীর আবাসন নিশ্চিত হওয়ার কথা। কিন্তু ১৫ দিন পার হলেও এখনও ১০৩ জন শিক্ষার্থীর আবাসন নিশ্চিত করতে পারেনি প্রশাসন। ফলে অনত্র জায়গা না পেয়ে রীতিমতো দিশেহারা হয়ে পড়েছে দেশের দূরদূরান্ত থেকে ছুটে আসা সাধারণ শিক্ষার্থীরা।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ট্রেজারার ভবনের তিনটি রুমে ২১ জন শিক্ষার্থীকে থাকতে দেয়া হয়েছে।  আর বাকিদের থাকার কোন ব্যবস্থা করেতে পারেনি  প্রশাসন।  এতে চরম বিপাকে পড়েছেন বাকি শিক্ষার্থীরা। ফলে অনেকটা বাধ্য হয়েই তারা অন্যান্য হলে পরিচিত বড় আপু অথবা তাদের বান্ধবীদের সাথে থাকছেন, কেউ কেউ ঢাকা থেকে নিয়মিত এসে ক্লাস করছেন। আর বাকিরা থাকছেন আশেপাশের এলাকায় বাসা ভাড়া করে। এতে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন তারা।

হলে উঠতে না পেরে নবীণ শিক্ষার্থীদের কয়েকজন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, প্রশাসন আমাদের বেগম সুফিয়া কামাল হল বরাদ্দ দিয়েছে কিন্তু আমরা হলে প্রবেশ করতে গেলে নিমার্ণকাজ এখনও শেষ হয়নি বলে প্রবেশ করতে দিচ্ছেনা। অন্যদিকে, নতুন পরিবেশে আমরা কোথায় থাকছি কি ভাবে থাকছি এখনও পর্যন্ত কেউ খোঁজ নিতে আসেনি। আমরা আর কতদিন এভাবে থাকব? বলেও প্রশাসনের কাছে প্রশ্ন রাখেন তারা।

প্রকৌশল অফিস সূত্রে জানা যায়, ২০১২ সালের ২৯শে মে এই হলের কার্যাদেশ দেওয়া হয়। কথা ছিল ৪৫০ দিনের মধ্যে কাজ শেষ করার। কিন্তু প্রায় চার বছরে ৩ বার কাজের মেয়াদ বাড়ানো হলেও এখনও কাজ শেষ করতে পারেনি প্রকৌশল বিভাগের অধীনে থাকা নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান।  তবে অগামী মাসের মধ্যেই কাজ শেষ করে হল বুঝিয়ে দেওয়ার কথা বলছেন তারা।

অন্যদিকে এখনো গ্যাস সংযোগ পাওয়া যায়নি।  কবে পাওয়া যাবে তাও জানা নেই। ফলে, হলের ডাইনিং চালু এবং  এতগুলো শিক্ষার্থীর খাবারের ব্যবস্থা করতে অনেকটাই হিমশিম খেতে হবে হল প্রশাসনকে।

এ বিষয়ে ভারপ্রাপ্ত প্রেকৌশলী আবদুস সালাম মো. শরীফের কাছে জানতে চাইলে তিনি যথাসময়ে অর্থ বরাদ্দ না পাওয়াকে ই দায়ী করছেন। তিনি বলেন, সময়মত অর্থ পেলে কাজ শেষ করতে এত দেরি হত না।  

হলের এ অবস্থা অবলোকন করে দর্শন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক রায়হান রাইন বলেন, হল নিমার্ণে প্রশাসন এবং নিয়োজিত ব্যক্তিবর্গের দায়িত্বহীনতা আছে বলে আমার মনে হয়। বর্তমান সময়ে দায়িত্বহীনতা ও সমন্বয়হীনতা প্রকট হয়ে উঠেছে। প্রশাসন কর্তৃক নিযুক্ত লোকদের সুষ্ঠু কাজের পরিকল্পনা ও দায়িত্ববোধের অভাবে আজ নবীণ শিক্ষার্থীদের এরকম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।

এ ব্যাপারে বেগম সুফিয়া কামাল হলের প্রভোস্ট অধ্যাপক ড.এস এম বদিয়ার রহমানের কাছে জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, “প্রশাসন বুঝিয়ে না দেওয়া পর্যন্ত আমরা তো কিছু করতে পারছি না। তবে আগামী মাসে কাজ শেষ হবে বলে আশা করছি। কাজ শেষ হলেই অতি দ্রুত বরাদ্দকৃত শিক্ষার্থীদের হলে উঠানো হবে।

গ্যাস সংযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, "প্রশাসন ও তিতাস গ্যাস কতৃপক্ষের সাথে কথা বলেছি। সবার সহোযোগিতা পেলে খুব দ্রুতই গ্যাস পেয়ে যাব।"

 

এমআইএস।