বিজয় দিবসকে সামনে রেখে অন্যরকম বিজয় দিবস উদযাপন করলো জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল শিক্ষার্থী। তারা একদল পথশিশুদের সাথে বিজয় দিবস উদযাপন করলো বেশ উৎসাহ উদ্দীপনার সাথে। এই শীতের মধ্যে তাদেরকে সেরা উপহার দিল বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণ শিক্ষার্থীরা।

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাবস্থাপনা বিভাগের একদল শিক্ষার্থীর উদ্যোগে পরিচালিত প্রতিষ্ঠান ‘প্রয়াস’এর মাধ্যমে এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। প্রায় ৪০ জন পথশিশু একসেট করে শীতের কাপড় পায়। প্রত্যেক সেটে একটি টুপি, একটি সোয়েটার/জ্যাকেট ও একটি কম্বল ছিল। শীতের কাপড় পেয়ে তাদের খুশিতে আত্মহারা।

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজনেস স্টাডিজ অনুষদের দ্বিতীয় তলায় মঙ্গলবার সকাল ১০ টায় অনুষ্ঠান শুরু হয়। প্রথমেই হালকা নাস্তা বিতরণ করা হয় সব পথশিশুদের মধ্যে। নাস্তাপর্ব শেষ হওয়ার পর অতিথিবৃন্দ আসন গ্রহণ করেন। বিজয় দিবস, শীতবস্ত্র বিতরণ ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ‘প্রয়াস’এর উপদেষ্টা এবং জবি ব্যবস্থাপনা বিভাগের শিক্ষক দ্বীন ইসলাম। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন তরুণ লেখক ও সংগঠক সাবিদিন ইব্রাহিম। সভাপতিত্ব করেন প্রয়াস এর সভাপতি মাহমুদুল হাসান অপু।

‘প্রয়াস’কে পরিচিত করা ও প্রয়াসের ভবিষ্যত পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা রাখেন প্রয়াসের সহ সভাপতি মানিক সাহা ও আল আমিন শুভ। অনুষ্ঠান উপস্থাপনায় ছিলেন প্রয়াসের সাংগঠনিক সম্পাদক অভিনি অলিভিয়া।

বিশেষ অতিথি সাবিদিন ইব্রাহিম তার বক্তৃতায় এমন একটি বিশেষ অনুষ্ঠানে থাকতে পেরে তার ভালো লাগার কথা ব্যক্ত করেন। পথশিশুদের মধ্য থেকে একজন নজরুল বা একজন মার্ক টোয়াইন, ম্যাক্সিম গোর্কিরা বের হয়ে আসবে এই আশাবাদ ব্যক্ত করেন। কোন ধরণের উন্নয়ন কাজে আসবে না যদি এই বিশাল সংখ্যক পথশিশুদেরকে শিক্ষার আলো দেয়া না যায়, উন্নয়নের ধারায় নিয়ে আসা না যায়। এজন্য জবি শিক্ষার্থীদের উদ্যোগ আরও সম্প্রসারিত হবে এই আশাবাদ ব্যক্ত করেন সাবিদিন ইব্রাহিম।

প্রধান অতিথির বক্তৃতায় জবি ব্যবস্থাপনা বিভাগের মাননীয় শিক্ষক দ্বীন ইসলাম তার শিক্ষার্থীদেরকে এমন সুন্দর অনুষ্ঠান আয়োজন করার জন্য সাধুবাদ জানান এবং সবসময় পাশে থাকার প্রতিজ্ঞা করেন। তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন বিশ্ববিদ্যালয় পাঠ শেষ করে গেলেও এই সব পথশিশুদের সাথে সম্পর্ক ছেদ করবে না তার ছাত্র-ছাত্রীরা এবং পরবর্তী ব্যাচের শিক্ষার্থীরা এই ধারাবাহিকতা অক্ষুণ্ন রাখবে।

প্রধান অতিথির বক্তৃতার পর শুরু হয় শীত বস্ত্র বিতরণ কর্মসূচি। শিশুরা সুশৃঙ্খলভাবে লাইনে দাঁড়িয়ে প্রধান অতিথি, বিশেষ অতিথি ও প্রয়াসের বন্ধুদের কাছ থেকে শীতের পোশাক সংগ্রহ করে।

শীতের কাপড় নিয়ে শিশুদের হইচই করতে করতেই শুরু হয় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। সেখানে নৃত্য ও দেশাত্মবোধক গান পরিবেশন করেন প্রয়াসের বন্ধুরা। পথশিশুরাও গান, কবিতা আবৃত্তি ও একক অভিনয়ের মাধ্যমে অনুষ্ঠানটিকে রাঙিয়ে তুলে। তারা একটি চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতায়ও অংশগ্রহণ করে।

পথশিশুদের বিপদসংকুল জীবনকে সত্যিকারের মানবিক জীবনে রুপ দিতে নিরলসভাবে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে 'প্রয়াস'। প্রয়াসের 'পথশিশুর পাঠশালা" এখন শিক্ষার আলো ছড়াচ্ছে সদরঘাট এলাকার পথশিশুদের মাঝে।

সপ্তাহের পাঁচদিনই শিশুদের পুঁথিগত বিদ্যার পাশাপাশি নৈতিকতা ও স্বাস্থ্য শিক্ষা দেয়া হচ্ছে। তাদের সচেতন করা হচ্ছে মাদকের কুফল সম্পর্কেও। এ ছাড়াও স্বেচ্ছাসেবী শিক্ষার্থীদের ব্যাক্তিগত উদ্যোগে শিশুদের প্রতি ক্লাসের পরেই খাবারও দেয়া হচ্ছে।

গত ঈদুল আজহা উপলক্ষেও ৩১টি বাচ্চাকে ঈদের নতুন জামা-কাপড় দেয়া হয়েছে। এর মধ্যে ছেলেদের জন্যে ছিলো শার্ট-জিন্স প্যান্ট, মেয়েদের জন্যে ছিলো ফ্রক আর স্কার্ট।

কিছুদিন আগে প্রয়াসের এক বন্ধু তার জন্মদিন পথশিশুদের সাথে উদযাপন করে। জন্মদিনের কেক আর সবার মাঝে রঙিন বেলুন ছড়িয়ে দিয়েছে অশেষ আনন্দ। একটু সঙ্গ, একটু ভালোবাসা কিভাবে পথশিশুদের দিন পাল্টে দিতে পারে, কীভাবে সুন্দর স্মৃতি উপহার দিতে পারে তার উদাহরণ এমন ঘটনাগুলো।

প্রয়াসের সভাপতি মোঃ মাহমুদুল হাসান অপু বললেন, ‘মানবিক দায়বদ্ধতার অংশ হিসেবে পথশিশুদের জন্যে ভালো কিছু করার অনুপ্রেরণা থেকেই প্রয়াসের পথচলার শুরু। ভবিষ্যতে আমাদের সাথে সংশ্লিষ্ট প্রতিটি পথশিশুকে সত্যিকারের একটি সুন্দর জীবন উপহার দিতে চাই, যে জীবন তাদেরকে সমাজে ভালোভাবে বাঁচতে শেখাবে। সেই চেষ্টায় আমাদের সাথে আছে গোটা জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় পরিবার।’

পড়াশুনার ফাঁকে ফাঁকে প্রয়াসের বন্ধুরা গভীর মনোযোগ দিয়ে শোনেন পথশিশুদের জীবনের গল্পগুলো। এ ব্যাপারে প্রয়াসের সাধারণ সম্পাদক ইমরান হক মোল্লা বলেন, ‘আমরা যারা ক্লাস নিতে যাই, তারা চেষ্টা করি পড়াশোনা ফাঁকে ফাঁকে , ওদের জীবনের গল্পগুলো জেনে নিতে। ওদের কারো গল্পের রাজা হচ্ছেন বাবা যিনি আর বেঁচে নেই; কারো গল্পের রাণী তার মা, তিনিও বেঁচে নেই। কারো কারো তো দুনিয়াতে কেউই নাই। এত দুঃখ কষ্টের মাঝেও ওদের খুনসুটি থেমে থাকে না। ওদের কাছে ওদের জীবনের প্রতিচ্ছিবিটাই এমন, না পাওয়ার মাঝেই ওরা আনন্দ খুঁজে নেয়।’

ছোটখাটো দুর্ঘটনা, হাত পা কেটে ফেলা বা খোসপাঁচড়াতে আক্রান্ত হওয়া পথশিশুদের জন্য নিয়মিত ঘটনা। পথশিশুদের সামান্য সেবা দেয়ার জন্য প্রয়াসের বন্ধুরা সম্প্রতি একটি ফার্স্ট এইড বক্স বানালো। ছোট খাটো কাটাছেঁড়ার প্রাথমিক চিকিৎসা দেয়ার জন্য এটা অনেক উপকারে আসবে নিশ্চিত।

প্রয়াসের সহ-সভাপতি মানিক সাহা বললে, ‘পথশিশুদের দাবি সপ্তাহের সাতদিন ক্লাসের। কিন্তু অর্থের অপ্রতুলতা আর সময়ের অভাবে আপাতত সপ্তাহে সাতদিন ক্লাস নেয়া সম্ভব হচ্ছে না। তবে ভবিষ্যতে প্রয়াসের ক্লাস সপ্তাহের সাতদিনই নেয়া হবে এবং প্রয়াসকে ঢাকার অন্যান্য এলাকায় ছড়িয়ে দেয়ার কাজ চলছে।’

প্রয়াসের প্রয়াস অব্যহত থাকবে এই প্রত্যাশা পথশিশুদের। কারণ ‘প্রয়াস’তাদেরকে রঙ্গিন সময় উপহার দিয়ে থাকে।

এমএ