রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়। বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম বিশ্ববিদ্যালয়। ১৯৫৩ সালের এই দিনে জন্ম নেয়া দেশের অন্যতম এই বিদ্যাপীঠ নানা চড়াই-উৎরাই ও আন্দোলন-সংগ্রাম পেরিয়ে ৬২তম বছরে পদার্পণ করবে আগামীকাল রোববার।

দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম উচ্চশিক্ষাকেন্দ্র ও উত্তরাঞ্চলের শ্রেষ্ঠ বিদ্যাপীঠ হিসেবে পরিচিত বিশ্ববিদ্যালয়টিতে যেমন রয়েছে সাফল্য, তেমনি রয়েছে রক্তাক্ত ইতিহাস। যে ইতিহাস আজও এ দেশের মানুষকে সংগ্রামী করে তোলে।

তবে দীর্ঘ এসময় পরিক্রমায় অপ্রাপ্তির পাল্লাও কম নয় এ প্রতিষ্ঠানটির। এখন পর্যন্ত ছাত্র-শিক্ষক সাংস্কৃতিক কেন্দ্র (টিএসসি) চালু হয়নি। বিগত প্রায় ৩০ বছর ধরে নির্বাচন হয়নি কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (রাকসু)।

এছাড়া ছাত্র সংগঠনগুলোর সংঘতময় রাজনীতিতে বছরের প্রায় দিনই অস্থিরতা লেগেই থাকে মতিহারের এ সবুজ চত্ত্বরে। পড়ালেখা করতে এসে সংঘর্ষ-সংঘাতে প্রাণ ঝরে পড়ে অনেক মেধাবী শিক্ষার্থীর।

তবুও আশাবাদী অভিভাবকরা প্রতিবছরই এ বিদ্যাপীঠে পাঠায় তাদের স্নেহের নয়নের মণিদের। আশা আকাঙ্খা শুধু এতটুকুই যে এই স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠানে অধ্যয়ন করে একদিন অনেক বড় হবে তাদের সন্তান।

প্রতিষ্ঠার কথা :

১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার মধ্যদিয়ে দেশে উচ্চশিক্ষার পথ উন্মোচিত হয়। তৎকালীন বাংলায় মাত্র একটি বিশ্ববিদ্যালয় উচ্চশিক্ষার চাহিদা পূরণে মোটেও সক্ষম ছিল না। তাই বাংলা নামক এ ভুখন্ডে আরও একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তা জরুরি হয়ে পড়ে। আর এ প্রয়োজনটা তীব্র হয় তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের সর্ববৃহৎ বিভাগীয় শহর রাজশাহী অঞ্চলের মানুষের মনে।

'৪৭ এ দেশ ভাগের পর পাকিস্তান সরকার দেশের সব কলেজ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত করার প্রক্রিয়া শুরু করে। এসময় রাজশাহীতে স্যাডলার কমিশন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার জন্য সুপারিশ করে। এর পর থেকেই মুলত বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার আন্দোলন শুরু হয়।

১৯৫০ সালের ১৫ নভেম্বর রাজশাহীর বিশিষ্ট ব্যক্তিদের সমন্বয়ে ৬৪ সদস্য বিশিষ্ট একটি কমিটি গঠন করা হয়। এর ধারাবাহিকতায় ১৯৫৩ সালের ৩১ মার্চ পূর্ব বাংলা ব্যবস্থাপক পরিষদের অধিবেশনে ‘রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় আইন-১৯৫৩’ পাশ হয়। একই বছরের ৬ জুলাই বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, রাজশাহী কলেজের প্রাক্তন অধ্যক্ষ ড. ইতরাৎ হোসেন জুবেরীকে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম উপাচার্য নিয়োগ করা হয়। সেদিন থেকেই শুরু হয় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম।

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রম শুরু হয় ১৯৫৩-৫৪ শিক্ষাবর্ষে। শুরুতে দর্শন, ইতিহাস, বাংলা, ইংরেজী, অর্থনীতি ও গণিত বিষয়গুলিতে পোস্ট গ্রাজুয়েট কোর্স ও ১৯৬২ থেকে শুরু হয় অনার্স কোর্স। সাময়িক ব্যবস্থা হিসাবে শহরের বিভিন্ন বাড়িতে নব প্রতিষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয়ের অফিসসমূহ স্থাপন করা হয়। শহরের একপাশে পদ্মা তীরে ঐতিহাসিক বড়কুঠিতে উপাচার্যের কার্যালয় ও বাসভবন স্থাপন করা হয়।

বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাশ নেয়া হতো মূলত রাজশাহী কলেজে। কলেজের নিজস্ব ক্লাশ শুরু হবার আগে সকাল ৭টা থেকে ৯টা পর্যন্ত। শিক্ষার্থীদের থাকার জন্য শহরের বিভিন্ন স্থানে গড়ে উঠে ছাত্রাবাস। রাজশাহী কলেজ সংলগ্ন ফুলার হোস্টেলকে বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রাবাসে পরিণত করা হয়। বড়কুঠিপাড়ার লালকুঠি ভবনে স্থাপিত হয়েছিল ছাত্রীনিবাস।

শহরস্থ ভোলানাথ বিশ্বেশ্বর হিন্দু একাডেমিতে স্থাপিত হয় বিশ্ববিদ্যালয় গ্রন্থাগার, শিক্ষক লাউঞ্জ এবং চিকিৎসা কেন্দ্র। বড়কুঠিপাড়ার মাতৃধাম ভবনে কলেজ পরিদর্শকের অফিস ও বাসস্থান এবং ঘোড়ামারা ডাকঘরের কাছে কুঞ্জমোহন মৈত্রের জমিদারবাড়ির একাংশে পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকের অফিস স্থাপিত হয়।

১৯৫৮ থেকে বর্তমান ক্যাম্পাসে দালান-কোঠা, রাস্তাঘাট নির্মাণ শুরু হয়। আর ১৯৬৪ সালের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের সব অফিস ও বিভাগ মতিহার ক্যাম্পাসে স্থানান্তরিত হয়। অস্ট্রেলিয়ান স্থপতি ড. সোয়ানি টমাসের স্থাপত্য পরিকল্পনায় এই বছরে ঢাকা-রাজশাহী মহাসড়কের পাশে মনোরম বৃক্ষশোভিত মতিহারের সবুজ চত্বরের প্রায় ৩০০ হেক্টর জমিতে ১৬১ জন শিক্ষার্থী নিয়ে যাত্রা শুরু করে এই বিশ্ববিদ্যালয়টি।

বিশ্ববিদ্যালয়টির বর্তমান অবস্থা:

বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়টিতে প্রায় ৩০ হাজার শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করছে। আটটি অনুষদের আওতায় ৫০টি বিভাগে চার বছর মেয়াদী অনার্স এবং এক বছর মেয়াদী মাস্টার্স ডিগ্রি প্রদান করছে প্রতিষ্ঠানটি। এমফিল ও পিএইচডিসহ উচ্চতর গবেষণার জন্য এখানে রয়েছে পাঁচটি ইন্সটিটিউট।

এছাড়া চিকিৎসা অনুষদের আওতায় অধিভুক্ত কলেজসমূহে এমবিবিএস ও বিডিএসসহ অন্যান্য কয়েকটি কোর্স চালু আছে। আর শিক্ষার্থীদের জন্য শিক্ষক রয়েছেন প্রায় ১৩শ'। শিক্ষার্থীদের জন্য আবাসিক হল রয়েছে ১৬টি। এছাড়াও গবেষকদের জন্য রয়েছে একটি ডরমেটরি।

আন্দোলন সংগ্রামে রাবির অবদান:

বিভিন্ন গণতান্ত্রিক অধিকার আদায়ের ক্ষেত্রে সর্বদা এ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকা ছিল অগ্রণী। বলা যায়, সব জাতীয় সঙ্কট নিরসনের সংগ্রামে বিশ্ববিদ্যালয়টির শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের অগ্রসরতা ছিল লক্ষ্যনীয়। '৬২ সালের বিতর্কিত শিক্ষা কমিশন রিপোর্ট বাতিল, '৬৯-এর গণভ্যুত্থান, '৭১ এর মুক্তিযুদ্ধ, '৯০-এর স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনসহ দেশের যেকোনো অন্তিম ক্রান্তিলগ্নে এ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকা ছিল অপরিসীম।

'৬৯ এর গণঅভ্যুত্থান চলাকালে তৎকালীন পাকিস্তানি আইন প্রয়োগকারী বাহিনীর হাতে নিজের জীবন বিপন্ন করে ছাত্রদের জীবন বাঁচাতে গিয়ে গুলিতে শহীদ হন এ বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বজন শ্রদ্ধেয় শিক্ষক অধ্যাপক ড. শামসুজ্জোহা। তাছাড়া ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধে প্রাণ বিসর্জন দিয়েছেন এ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হবিবুর রহমান, অধ্যাপক সুখরঞ্জন সমাদ্দার, মীর আবদুল কাইয়ুমসহ অনেক ছাত্র ও কর্মকর্তা-কর্মচারী।

১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে পাক হানাদার বহিনী এ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ হত্যা করে নাম না জানা অসংখ্য মুক্তিকামী বাঙালিকে। পাকিস্তানি বাহিনীর হত্যাযজ্ঞের সাক্ষী হয়ে আছে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বধ্যভূমি ‘স্মৃতিস্তম্ভ'। এখানে শুয়ে আছেন নাম না জানা অসংখ্য শহীদ। তাদের ত্যাগের স্মৃতিকে এখনো ধারণ করে সংগ্রামী চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা।

চাওয়া-পাওয়ার ৬১ বছর:

প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে এই বিশ্ববিদ্যালয়টি অত্যন্ত সম্মানের সঙ্গে গবেষণা ও জাতীয় ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করে আসছে। এখানে রয়েছে বিশ্বমানের গবেষক-বিজ্ঞানী। ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ'র মতো ভাষাবিদ থেকে শুরু করে অর্ধশতধিক বিজ্ঞানী ও গবেষকের কর্মস্থল রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।

শিক্ষক-কর্মকর্তাদের জন্য রেডিও ফ্রিকোয়েন্সি আইডেন্টি কার্ড (আরএফআইসি) এর মাধ্যমে শুরু হয়েছে এই কার্যক্রম। এখন থেকে বিশ্ববিদ্যালয়টির একজন শিক্ষক-শিক্ষার্থীর যাবতীয় তথ্য এক নিমিষেই জানা যাবে। এ কার্ড ব্যবহার করে সার্টিফিকেট, অনলাইন ব্যাংকিংসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের সব কাজ করা যাবে। যা এ বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম প্রাপ্তি।

এছাড়া সবশেষ বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রন্থাগারে ইন্টিগ্রেটেড সিস্টেম চালু, চিকিৎসাকেন্দ্র অ্যাম্বুলেন্স বৃদ্ধিসহ নানা উন্নয়নমুলক কাজ করে যাচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। সর্বোপরি বিশ্ববিদ্যালয়টির আধুনিকায়নে অগ্রণী ভূমিকা রেখেই চলছে প্রশাসন।

বিশ্ববিদ্যালয় দিবসের কর্মসূচি:

বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, গৌরবের ৬১তম বর্ষপূর্তি উপলক্ষে কর্তৃপক্ষ নানা কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। রোববার সকাল থেকে সন্ধ্যা অবধি চলবে এসব অনুষ্ঠান। ক্যাম্পাস ঘুরে দেখা গেছে, এ উপলক্ষে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন স্থাপনা ও ভবনগুলো সাজানো হয়েছে মনোরম সাজে।

অনুষ্ঠানসূচির মধ্যে রয়েছে সকাল সোয়া ১০টায় উদ্বোধনী অনুষ্ঠান। এতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম। এছাড়া বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন রাজশাহী সদর আসনের সংসদ সদস্য ফজলে হোসেন বাদশা, সংরক্ষিত মহিলা আসনের সংসদ সদস্য বেগম আখতার জাহান এবং রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনের মেয়র মোহাম্মদ মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুল।

এর আগে সকাল ১০টায় সিনেট ভবন চত্ত্বরে আমন্ত্রিত অতিথিবৃন্দের উপস্থিতিতে জাতীয় সঙ্গীত পরিবেশন এবং পতাকা উত্তোলন করা হবে। জাতীয় পতাকা উত্তোলন করবেন প্রধান অতিথি পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম, বিশ্ববিদ্যালয়ের পতাকা উত্তোলন করবেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক মুহম্মদ মিজানউদ্দিন।

পরে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি পালন করা হবে। সকাল সাড়ে ১০টায় শোভাযাত্রা এবং ১১টায় সিনেট ভবনে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হবে।

ঢাকা, ৫ জুলাই (টাইমনিউজবিডি.কম) // এআর