আবাসিক হল কমিটির পদ দখল নিয়েই অন্তর্দ্বন্দ্বে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগ নেতা রুস্তম আলী আকন্দ নিহত হয়েছেন। রাবি শাখা ছাত্রলীগ ও সোহরাওয়ার্দী হলের আবাসিক শিক্ষার্থীরা এই তথ্য নিশ্চত করেছে। তবে ছাত্রলীগ নেতারা বিষয়টি অস্বীকার করে ঘটনার জন্য রাবি শাখার ইসলামী ছাত্রশিবিরকেই দায়ী করেছেন।
এদিকে সন্দেহের তীর গুলিবিদ্ধ রুস্তমকে উদ্ধারকারী তিন ছাত্রলীগ নেতা-কর্মীর দিকে জোরালো ভাবেই রয়েছে। তবে পুলিশ বলছে, ছাত্রলীগের অভ্যান্তরিণ কোন্দলের বিষয়টি মাথায় রেখে পুলিশের বেশ কয়েকটি টিম মাঠে নেমেছে।
[img]http://www.timenewsbd.com/contents/public/201404/1396707141.jpg[/img]
শুক্রবার দুপুর সোয়া ১ টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ সোহরাওয়ার্দী হলের ২৩০ নাম্বার নিজ কক্ষে গুলিবিদ্ধ হন ওই হল শাখা ছাত্রলীগ নেতা রুস্তম আলী। পরে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক  তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
শুক্রবার নামাজের দিন হওয়ার সবাই মসজিদে যাওয়ার পর এই হত্যাকাণ্ড ঘটে। আর গুলির শব্দ পাওয়ার কয়েক মিনিট পর ওই হলের ছাত্রলীগ নেতা আব্দুল্লাহ আল গালিব, শহীদ জিয়াউর রহমান হলের ছাত্রলীগ কর্মী সেলিম রেজা (ইতিহাস তৃতীয় বর্ষ) উদ্ধার করে আহত অবস্থায় রুস্তমকে হাসপাতালে নিয়ে যায়।
এর আগে গালিবকে গত ২ ফেব্রুয়ারি সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার ঘটনায় অস্ত্র উঁচিয়ে গুলি করতে দেখা গেছে। যা গণমাধ্যমের দ্বারা প্রকাশিত ফুটেজে দেশের সকল মানুষ অবগত।
আর গালিব ও সেলিমকে গুলির আওয়াজের পর পরই ওই হলে বেশ উচ্চস্বরে তর্কাতর্কি করতে শোনা গেছে বলে ওই হলের পাশ্ববর্তী কক্ষের এক আবাসিক শিক্ষার্থী জানিয়েছেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই শিক্ষার্থী বলেন,  গুলির শব্দ পাওয়ার মাত্র কয়েক মিনিট আগে রুস্তম গোসল করে কক্ষে যান। আর সেই সময় ওই কক্ষে গালিব, সেলিমসহ কয়েকজনকে তিনি দেখেছিলেন। গুলির আওয়াজ পাওয়ার পর ওই শিক্ষার্থী পাশের কক্ষ থেকে বের হয়ে কয়েকটি উত্তপ্ত বাক্য শুনতে পান। যেগুলোর মধ্যে ছিল- ‘এটা তুই কি করলি’ এই কাজ করতে গেলি কেন?’

ভয়ে ওই শিক্ষার্থী নিজের কক্ষে ঢুকে পড়েন। কান্নাজড়িত কণ্ঠে এই শিক্ষার্থী আরো বলেন, নিজ চোখে দেখে বিষয়টি আমি মেনে নিতে পারছিলাম না।
একই সুরে কথা বলেন ছাত্রলীগের এক সহ-সভাপতি। নাম প্রকাশ না করা শর্তে তিনি বলেন,  রুস্তম খুন হওয়ার সময় তার কক্ষে ছাত্রলীগের কয়েকজন নেতা উপস্থিত ছিল। কয়েকদিন আগে রুস্তমকে একটি পিস্তল দেয়া হয়েছিল। নিছক তর্কাতর্কি থেকে গুলি বর্ষণের ঘটনা ঘটেছে যা উপস্থিত ওই (ছাত্রলীগ)’ নেতারা কেউ বুঝে উঠতে পারেনি।
তবে ২৩০ নাম্বার কক্ষের কিছু দূরে ২১৮ নাম্বর কক্ষে থাকেন বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের উপ-সাহিত্য সম্পাদক শাহজাহান আলী সম্রাট। তিনি জানিয়েছেন, দুপুর সোয়া ১টার দিকে তাঁরা তিন-চারজন জুমার নামাজের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। ওই সময় তাঁর ব্লকের পশ্চিম পাশ থেকে হালকা একটি আওয়াজ শুনতে পান। পরে তাঁরা দৌড়ে সেদিকে গেলে ২৩০ নম্বর কক্ষেও মেঝেতে রুস্তমকে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখেন। পরে তিনিসহ গালিব, সেলিমসহ আরো কয়েকজন উদ্ধার করে চিকিৎসা কেন্দ্রে পাঠানোর ব্যবস্থা করে।
রামেক হাসপাতালে গালিব, সেলিম, কবির ও শাহজাহান সম্রাট রুস্তমকে নিয়ে গিয়েছিল।
আগামী ১০ এপ্রিল শহীদ সোহরাওয়ার্দী হল শাখা ছাত্রলীগের কাউন্সিল হওয়ার কথা ছিল। আর ওই কমিটির সভাপতি পদে প্রার্থী ছিলেন রুস্তম আলী আকন্দ, আইন বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী সেলিম হোসেন, আরেক নেতা ও মার্কেটিং বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী কবির হোসেন।
গালিবের খুব ঘনিষ্ট বন্ধ হচ্ছে সেলিম হোসেন। আর তাদেরই সহচর ছাত্রলীগকর্মী সেলিম রেজা। যিনি শহীদ সোহরাওয়ার্দী হলের পার্শ্বেবর্তী আর একটি আবাসিক হল শহীদ জিয়াউর রহমান হলে থাকেন। কিন্তু ঘটনার দিন কেন তিনি ওই হলে গিয়েছিলেন তা কেউ বলতে পারেনি। ছাত্রলীগ নেতা কবির হোসেন বলেন, ‘রুস্তম ভাই সভাপতি হতে চাওয়ায় আমি নিজেকে সরিয়ে নিয়েছি। কাজেই আমাদের মধ্যে কোনো দ্বন্দ্ব ছিল না। এমনকি গত বৃহস্পতিবার রাতেও আমরা একসঙ্গে সোহরাওয়ার্দী হলের বিভিন্ন কক্ষে গিয়ে শিবিরের ছেলেদের হল ছেড়ে যাওয়ার জন্য কড়া ভাষায় বলে এসেছি। এতে ক্ষুব্ধ হয়েই হয়তো শিবির ক্যাডাররা তাঁকে খুন করেছে।
ঘটনার দিনই ছাত্রলীগের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছিল যে রুস্তমকে হত্যার জন্য ইসলামী ছাত্রশিবির দায়ী। ওইদিন ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক তৌহিদ আল তুহিন বলেছিলেন, রুস্তম তার কক্ষে পড়াশোনা করছিল আর সেই সময় তার জানালা দিয়ে কেউ গুলি ছুড়ে পালিয়েছে।
সরেজমিন গিয়ে ওই হলে দেখা যায়, দ্বিতীয় তলার মাঝ ব্লকের পূর্বদিকে রুস্তমের কক্ষ। সেখানে বা তার কক্ষের আশেপাশ এমন কোন গাছ দেখা যায়নি যে ওই গাছ বেঁয়ে ওপরে উঠে গুলি ছুড়ে পালিয়ে যাবে।
[img]http://www.timenewsbd.com/contents/public/201404/1396707146.jpg[/img]
এই বিষয়ে জানতে চাইলে ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক তৌহিদ আল হোসেন তুহিন বলেন, গাছ বেয়ে না উঠতে পারলেও সিঁড়ি দিয়ে যে কেউ গিয়ে তার কক্ষের জানালার দিকে গুলি করতে পারে। গুলি করেই খুনিরা হলের ভিতরই কোন কক্ষে আত্মগোপন করে থাকতে পারে। গালিব ও সেলিম ঘটনার সাথে সম্পৃক্ত নয় বলেও তিনি দাবী করেন।
তিনি আরো বলেন, রুস্তমসহ অন্যন্যরা সভাপতি মিজানুর রহমান রানার অনুসারি। সুতরাং নেতৃত্বের অন্তকোন্দলের কোন সুযোগই নেই। কোন একটি মহল গুজব ছড়িয়ে বিভ্রান্তি ছড়ানোর চেষ্টা করছে।
মতিহার থানার অফিসার ইন চার্জ (ওসি) এবিএম রেজাউল করিম বলেন, রুস্তম নিহত হবার পর পুলিশের বেশ কয়েকটি টিম মাঠে কাজ করছে।
তবে ছাত্রলীগের অভ্যন্তরীণ কোন্দল থেকে এই ঘটনা ঘটতে পারে আবার বাহির থেকেও কেউ হলে গিয়ে এই হত্যাকা- ঘটাতে পারে। কক্ষের পাশ্বে কোন উঁচু গাছ না থাকায় গাছ বেয়ে দ্বিতীয় তলায় গিয়ে জানলা দিয়ে গুলি ছোঁড়া সম্ভব নয় বলেও তিনি মনে করেন।
গত ২ ফেব্রুয়ারি ছাত্রলীগ নেতা আব্দুল্লাহ আল গালিবকে সাধারন শিক্ষার্থীদের ওপর হামলায় অস্ত্র সহ দেখা গিয়েছিল শুক্রবার ফের রুস্তমকে উদ্ধার করে সেই হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছে সন্দেহের তীর তার দিকে আছে কি না প্রশ্নের জবাবে ওসি বলেন, আসলে কারা মেরেছে তা আমরা মুহুর্তে বলতে পারছি না। তদন্ত করেই বের হবে প্রকৃত হত্যাকাণ্ডে কারা জড়িত ছিল। তবে তিনি এই সন্দেহ উড়িয়েও দেয়নি। সব দিক মাথায় রেখে পুলিশ এগুচ্ছে।
[img]http://www.timenewsbd.com/contents/public/201404/1396707142.jpg[/img]
রাজশাহী উপ-পুলিশ কমিশনার (পূর্ব) প্রলয় চিসিম বলেন, আমরা কাউকে সন্দেহের বাহিরে রাখছি না। ছাত্রলীগের ‘অভ্যন্তরীণ কোন্দল’ থেকেও ঘটনা ঘটে থাকতে পারে। আসলে পুলিশ সব কিছু বিবেচনা করে তদন্ত করছে। হত্যাকাণ্ডের পর সেখানে রক্ত ব্যাতিত কোন আলামত উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি বলেও জানান তিনি।
[b]রাবি, এমএইচ, ৫ এপ্রিল (টাইমনিউজবিডি.কম)// এসএইচ[/b]