আজ ১ জুলাই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় দিবস। ১৯২১ খ্রিস্টাব্দের এদিন প্রতিষ্ঠা হয় বাংলাদেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠটির। এ বছর বিশ্ববিদ্যালয়ের ৯৩তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালন করা হচ্ছে। এজন্য বিশ্ববিদ্যালয় বিভিন্ন ধরনের কার্যক্রম গ্রহণ করেছে।

মাত্র তিনটি অনুষদ (কলা, বিজ্ঞান ও আইন) ও ১২টি বিভাগ (সংস্কৃত ও বাংলা, ইংরেজি শিক্ষা, ইতিহাস, আরবি ও ইসলামিক স্টাডিজ, ফার্সি ও উর্দু, দর্শন, অর্থনীতি ও রাজনীতি, পদার্থবিদ্যা, রসায়ন, গণিত ও আইন) নিয়ে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়। প্রতিষ্ঠালগ্নে মাত্র ৬০ জন শিক্ষক নিয়ে এর পথচলা শুরু হয়। তাদের মধ্যে হরপ্রসাদ শাস্ত্রী, এফসি টার্নার, মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, জিএইচ ল্যাংলি, হরিদাস ভট্টাচার্য, ডবিস্নউএ জেংকিন্স, রমেশচন্দ্র মজুমদার, এএফ রহমান, সত্যেন্দ্রনাথ বসু, নরেশচন্দ্র সেনগুপ্ত, জ্ঞানচন্দ্র ঘোষের মতো কৃতী ও বিদগ্ধ যুগন্ধর ব্যক্তিবর্গ ছিলেন জাজ্বল্যমান।

পূর্ববাংলার ক্রমবর্ধমান উচ্চশিক্ষা-চাহিদা পূরণে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভৌত কাঠামো সম্প্রসারণের প্রয়োজনে মাত্র ছয় বছরের ব্যবধানে ১৯২৬ খ্রিস্টাব্দে প্রথমবারের মতো ব্রিটিশ-ভারত সরকার বিশ্ববিদ্যালয়কে ২৫২ একর জমি দান করে। বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ে মোট জমির পরিমাণ ২৬০.৬১৪ একর।

প্রাথমিক ছয় বছরে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়ে ৮৪৭-এ উন্নীত হয়। ছাত্ররা মূলত ঢাকা হল, জগন্নাথ হল ও মুসলিম হল- এই তিন আবাসিক হলেই অবস্থান করত। ১৯৪০ খ্রিস্টাব্দে ঢাকা ইন্টারমিডিয়েট কলেজ ভবনে প্রতিষ্ঠিত হয় ফজলুল হক মুসলিম হল। এই সময় জীববিজ্ঞান, বাংলা ও রাষ্ট্রবিজ্ঞান এই তিনটি নতুন বিভাগসহ প্রতিষ্ঠা করা হয়।

কথিত আছে, 'ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সমকালীন সমাজ ও রাষ্ট্র-মানসের সংকট ও সম্ভাবনায় কখনো আহত ও স্পৃষ্ট হয়েছে; কখনো আবার সংকট উত্তরণের দিকনির্দেশনা দান করেছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-কালে স্বল্প সময়ের জন্য হলেও বারুদের দূরাগত গন্ধ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে পৌঁছেছে। সামরিক হাসপাতাল স্থাপনের লক্ষ্যে শহীদুল্লাহ মুসলিম হল ও কলা ভবন হুকুম দখল করা হয়েছে এবং বন্ধ করা হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের সব একাডেমিক কার্যক্রম। যুদ্ধ-সৃষ্ট মন্বন্তরে আচ্ছন্ন হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ।'

১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দে দ্বি-জাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে ভারত ও পাকিস্তান নামক দুটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা লাভ করে। তৎকালীন পূর্ববঙ্গের বা পরবর্তী সময়ের পূর্ব পাকিস্তানের রাজধানী ঢাকায় অবস্থিত প্রদেশের একমাত্র বিশ্ববিদ্যালয়-ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে কেন্দ্র করে এ দেশের মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা উজ্জীবিত হয়। তৎকালীন পূর্ব বাংলার ৫৫টি কলেজ এ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত হয়। ১৯৪৭ থেকে ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত সময়ের মধ্যে ৫টি নতুন অনুষদ, ১৬টি নতুন বিভাগ ও ৪টি ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠিত হয়। বলতে গেলে পূর্ববঙ্গ শিক্ষিত মধ্যবিত্ত আর জ্ঞানভিত্তিক সমাজশৃঙ্খল প্রেক্ষাপট তৈরি হলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠার মধ্যে দিয়ে।

১৯৫২ খ্রিস্টাব্দে ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত এই বিশ্ববিদ্যালয়ের রয়েছে গৌরবোজ্জ্বল আর নেতৃত্ব বিকাশের সক্রিয় ভূমিকা। স্বাধীনতা সংগ্রামে সময়কালে বিশ্ববিদ্যালয় পাক-হানাদার বাহিনীর আক্রোশ ও আক্রমণের শিকার হয়। এতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-কর্মচারী এবং ছাত্রছাত্রীসহ শহীদ হয়েছেন অনেকে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও ছাত্রদের নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য ১৯৬১ খ্রিস্টাব্দে আইয়ুব সরকার প্রবর্তিত অর্ডিন্যান্স বাতিলের মধ্য দিয়ে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ কর্তৃক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অর্ডার-১৯৭৩ অধ্যাদেশ অনুমোদন করার ফলে বিশ্ববিদ্যালয় একটি স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের মর্যাদাপ্রাপ্ত হয় এবং ব্যবস্থাপনায় গণতান্ত্রিক পদ্ধতি প্রতিষ্ঠা লাভ করে। নতুন উদ্যমে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা কার্যক্রম শুরু হয়।

২০১৩-১৪ পরিসংখ্যান অনুযায়ী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৩টি অনুষদ, ১১টি ইনস্টিটিউট, ৭৩টি বিভাগ, ৪৮টি ব্যুরো ও গবেষণা কেন্দ্র এবং নির্মাণাধীনসহ ছাত্রছাত্রীদের ২০টি আবাসিক হল, হোস্টেল ৩টি। এ বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রত্যক্ষভাবে অধ্যয়নরত ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা প্রায় ৩৩,৫৮৯ জন, প্রায় ১৮৩০ জন শিক্ষক উচ্চশিক্ষার সম্প্রসারণ ও অগ্রগতিতে নিবেদিত প্রাণ এবং জ্ঞান-বিজ্ঞান ও বিদ্যাবত্তার প্রতিটি ক্ষেত্রে গবেষণা ও চিৎপ্রকর্ষের কার্যক্রমকে উৎসাহিত করতে তারা অঙ্গীকারাবদ্ধ। এছাড়াও ৮৫টি উপাদানকল্প কলেজ রয়েছে, তাতে ৩১৯৩৮ জন শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছেন, শিক্ষক রয়েছেন ৬৯৬৭ জন।

বস্তুত, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়া শুরু হয় বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় দশকে, ১৯১২ খ্রিস্টাব্দের ২ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি দেন ভারতের তৎকালীন ভাইসরয় লর্ড হার্ডিঞ্জ। ইতিপূর্বে পূর্ব বাংলার মানুষের দাবি ছিল এই অঞ্চলে একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সে পরিপ্রেক্ষিতে ২৭ মে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সম্ভাব্যতা বিবেচনা করার জন্য ব্যারিস্টার আর নাথানের নেতৃত্বে ডিআর কুচলার, ড. রাসবিহারী ঘোষ, নবাব সৈয়দ নওয়াব আলী চৌধুরী, নবাব সিরাজুল ইসলাম, ঢাকার প্রভাবশালী নাগরিক আনন্দরায়, ঢাকা কলেজের অধ্যক্ষ ডবিস্নউএটি আর্চিবল্ড, জগন্নাথ কলেজের অধ্যক্ষ ললিতমোহন চট্টোপাধ্যায়, ঢাকা আলিয়া মাদ্রাসার তত্ত্বাবধায়ক শামসুল উলামা আবু নসর মুহম্মদ ওয়াহেদ, মোহাম্মদ আলী (আলীগড়) প্রেসিডেন্সি কলেজের (কলকাতা) অধ্যক্ষ এইচএইচআর জেমস, প্রেসিডেন্সি কলেজের অধ্যাপক সি ডবিস্নউ পিক এবং সংস্কৃত কলেজের (কলকাতা) অধ্যক্ষ সতীশ চন্দ্র আচার্য সমন্বয়ে একটি কমিটি গঠন করা হয়। এই কমিটির রিপোর্ট ১৯১৩ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত হয়। নাথান কমিটির ইতিবাচক রিপোর্ট সে বছরই ডিসেম্বর মাসে সেটি অনুমোদন লাভ করে। ১৯১৭ খ্রিস্টাব্দে গঠিত স্যাডলর কমিশনও ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পক্ষে ইতিবাচক মতামত দিলে ১৯২০ খ্রিস্টাব্দে ১৩ মার্চ ভারতীয় আইন সভা পাস করে 'দি ঢাকা ইউনিভার্সিটি অ্যাক্ট (অ্যাক্ট নং-১৮) ১৯২০। এর পরের বছর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের যাত্রা শুরু হয়।

ঢাকা, ১ জুলাই (টাইমনিউজবিডি.কম) // জেডআই