গর্ভধারিনী মায়ের বুক ফাঁটা আহাজারীর চার বছর। ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই মেধাবী ছাত্রনেতা ওয়ালীউল্লাহ ও আল মুকাদ্দেস অপহরণের চার বছর অতিবাহিত হয়েছে ৪ ফেব্রয়ারি ।

২০১২ সালের এই দিনে সাভার নবীনগরে হানিফ পরিবহন থেকে র‌্যাব-৪ ইউনিটের পোশাক পরিহিত ও ডিবি পুলিশ পরিচয়ে তাদের নামিয়ে নেয়া হয়। তাদের আর সন্ধান মেলেনি আজো। চারটি বছরধরে প্রিয় সন্তানের অপেক্ষায় পথচেয়ে বসে আছে মা-বাবা। সন্তান কে ফিরে পাবে কি না জানেন না গর্ভধারিনী মা। কাঁদতে কাঁদতে চোখের পানি শেষ হলেও শেষ হয়নি মায়ের বুক ফাঁটা আহাজারী।

অপহরণ হওয়ার চার বছর পেরিয়ে গেলেও আজ পর্যন্ত মায়ের মন জানেনা সন্তানের অবস্থা। আশায় পথ চেয়ে কাটে দিন-রাত। সন্তান হারানোর ব্যথায় দিন-রাতে কন্নাতে কন্নাতে চোখের পানি শুকিয়ে গেলেও ফুড়ায় নি বুকের কান্না। শুকায় নি হৃদয়ের ক্ষত। হয়তো সন্তান কে না পেলে কোন দিন ঐ ক্ষত শুকাবেনা।

প্রিয় ভাইয়ের বিয়গ ব্যাথা আর মা-বাবার কান্না জড়িত কন্ঠের আহাজারীতের চারটি বছর ধরে ভাড়ি হয়ে আছে ওলী-মুকাদ্দেসের বাড়ির বাতাস। খাবার-গোসলহীন পাগলের মতো জীবন যাপন চারটি বছর ধরে কাদিঁয়ে যাচ্ছে পরিবারের অন্য সদস্য আর আত্মিয় স্বজন এবং প্রিয় সহপাঠিদের। সন্তান হাড়িয়ে যাওয়ার শোক কখনো ভুলতে পারবে কি তাদের পরিবার? অথচ কি অপরাধে তাদের র‌্যাব পরিচয়ে অপহরণ করা হয়ছে তা কারো জানা নেই। তাদেরকে আর ফিরে পাবে কি না সন্ধিহান ওই দুই পরিবার। তার পরেও এখনো সন্তান ফিরে পাওয়ার আশায় বুক বেঁধে আছে শোকাহত দুই পরিবারের সদস্যরা।

পরিবার সূত্রে জানা যায়, আল-মুকাদ্দাস ২০১২ সালের ২ ফেব্রয়ারি ও ওয়ালীউল্লাহ ৩ ফেব্রয়ারি ব্যক্তিগত কাজে ঢাকায় যান। উভয়ে ঢাকায় কাজ শেষে ৪ ফেব্রয়ারি রাত সাড়ে ১১টায় হানিফ এন্টারপ্রাইজের কল্যাণপুর কাউন্টার থেকে ক্যাম্পাসে আসার উদ্দেশে ঝিনাইদহ-৩৭৫০ নম্বর গাড়িতে ক্যাম্পাসে ফিরছিলেন। গাডড়িটি রাত সাড়ে ১২টা থেকে ১টার মাঝামাঝি সময়ে নবীনগর পৌঁছলে র‌্যাব-৪-এর পরিচয় দিয়ে গাড়িটি থামানো হয়অ এ সময় র‌্যাবের পোশাক ও সাদা পোশাকধারী ৮-১০ জন গাডড়িতে উঠে আল মোকাদ্দাস ও ওয়ালীল্লাহকে নামিয়ে নিয়ে যায় বলে গাড়ির সুপারভাইজার নিশ্চিত করেন।

আল-মুকাদ্দাস আল-ফিকহ বিভাগের ৪র্থ বর্ষের মেধাবী ছাত্র ও ওয়ালীউল্লাহ দাওয়াহ এন্ড ইসলামীক স্টাডিজের অনার্সে প্রথম শ্রেণীতে প্রথম এবং মাষ্টার্সে অধ্যায়নরত ছাত্র। র‌্যাব পরিচয়ে তাদের অপহণের সংবাদ ক্যাম্পাসে ছড়িপড়লে তাদের সন্ধান এবং মুক্তির দাবিতে উত্তাল হয়ে ওঠে ক্যম্পাস। পরিবার এবং সহপাঠিদের দাবিসাথে একাত্ততা ঘোষণা করে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরাও। তাদের উদ্ধারের দাবীতে সাংবাদিক সম্মেলন, মিছিল, মিটিং, মানববন্ধন, ক্লাস-পরীক্ষা বর্জন, একাডেমিক ভবনে তালা এমনকি মহাসড়ক অবরোধসহ নানা কর্মসুচি পালন করা হয়। বিশ্ববদ্যিালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে নানা পদক্ষেপ গ্রহন করা হলেও তাদের উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। আল-মুকাদ্দাস ও ওয়ালীউল্লাহ পিতা-মাতা ঢাকা জাতীয় প্রেসক্লাবে সাংবাদিক সম্মেলন করে। তাদের উদ্ধারের জন্য সরকারের নিকট আবেদন করে। কিন্তু তাদের উদ্ধারের ব্যাপারে সরকার পক্ষ থেকে শুধু আশার বাণী ছাড়া আর কিছুই পাওয়া যায়নি।

পরিবার ও তাদের সহপাঠিদের সাথে কথা বলে জান যায়, ওলী-মুকাদ্দাসের কি অপরাধ ছিল কারো বোধগম্য নয়। সত্য পথে চলাই কি তাদের অপরাধ? জানতে চায় সহপাঠিরা। রাষ্টের নিরাপত্তা বাহিনির হাতে যদি নাগড়িক নিরাপদ না হয় তাবে রাষ্টের দায়িত্ব কি? জানতে চায় পরিবার।

অপহৃত মুকাদ্দাসের মা বলেন, “ আমার ছেলের কিছু হয় নি। আমার মুকাদ্দাস অবশ্যই আসবে। প্রতি দিনই তো শুনি কত ছেলে মায়ের কলে ফিরে আসে না। রাস্তা থেকে র‌্যাব-পুলিশ ধরে নিয়ে যায়। এভাবে আর কত মায়ের চোখের পানিতে ভিজবে বাতাস। কত মায়ের আহজারীতে কেঁপে উঠবে আল্লাহ আরশ। র‌্যাব-পুলিশের কাছে আমার অনুরোধ তারা যেন নিষ্পাপ ছেলেদের এভাবে অপহরণ না করে।”

অপহৃত আল-মুকাদ্দাস পিরোজপুর জেলার সদর থানার ২ নং কদমতলি ই্উনিয়নের খানাকুনিয়ারী গ্রামের মাওলানা আব্দুল হালিমের বড় সন্তান এবং ওয়ালীউল্লাহ ঝালকাঠি জেলার কাঠালিয়া উপজেলার সোলজালিয়া ইউনিয়নের পশ্চিম সোলজালিয়া গ্রামের মাওলানা ফজলুর রহমানের ছেলে।

এমএম