মোহাম্মদপুর প্রিপারেটরি গার্লস স্কুল অ্যান্ড কলেজের প্রথম শ্রেণীর এক ছাত্রীকে যৌন হয়রানির ঘটনায় প্রতিষ্ঠানটির ঝাড়ুদার গোপালকে বরখাস্ত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে কর্তৃপক্ষ। আর এ ঘটনায় অভিভাবকদের সাথে দুর্ব্যবহার করার দায়ে স্কুলটির উপাধ্যক্ষ জিন্নাতুন্নেছাকে অব্যাহতি দেয়ারও ঘোষণা দিয়েছেন কর্তৃপক্ষ।

স্কুলটির প্রিন্সিপাল বেলায়েত হোসেন বলেন, ওই ঘটনায় গঠিত তদন্ত কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী ক্লিনার গোপালকে বরখাস্ত করা হবে।

গতকাল (রোববার) বিকেলে স্কুলের বোর্ড মিটিংয়ে এই সিদ্ধান্ত হয়েছে বলেও জানান প্রিন্সিপাল বেলায়েত। ওই সভায় স্কুল ছাত্রীকে যৌন হয়রানির অভিযোগের বিষয়ে গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনও পেশ করা হয়।

তবে, ক্লিনার গোপালের বর্তমান অবস্থান সম্পর্কে স্কুল কর্তৃপক্ষ কিছু জানেন না। গত ৯ মে সংগঠিত ওই ঘটনার পর ছাত্রীর মা স্কুল কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ দায়েরের পর থেকেই অভিযুক্ত গোপাল লাপাত্তা।

স্কুলের প্রিন্সিপাল বেলায়েত হোসেন জানান, গত ১১ মে থেকে ক্লিনার গোপাল ছুটিতে আছেন।এদিকে, ছাত্র যৌন হয়রানির অভিযোগ ওঠার পর স্কুলে ১২টি সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে বলেও জানান স্কুল কর্তৃপক্ষ।

উল্লেখ্য, মোহাম্মদপুর প্রিপারেটরি গার্লস স্কুল অ্যান্ড কলেজের প্রথম শ্রেণীর এক ছাত্রীকে যৌন হয়রানির জের ধরে তুলকালাম কান্ড চলে। ওই ঘটনায় শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের দাবির মুখে গত শনিবার কলেজের উপাধ্যক্ষ ও পুরুষ কর্মীদের অব্যাহতি দেয়া হয়েছে। যৌন হয়রানির ঘটনায় শিক্ষার্থীরা ক্লাসে যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছে।

উদ্ভূত পরিস্থিতিতে কর্তৃপক্ষ প্রতিষ্ঠানটিতে দুইদিনের ছুটি ঘোষণা করলেও আন্দোলনরত অভিভাবকরা জানিয়েছেন, দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার আগ পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের তারা ক্লাসে দেবেন না।

শনিবার সকাল থেকে বিক্ষোভ, ভাঙচুর ও ঘেরাওয়ের পর দুপুরে উপাধ্যক্ষসহ পুরুষ কর্মীদের প্রত্যাহারের ঘোষণা দিয়ে বিক্ষোভরত অভিভাবকদের শান্ত করেন বেসরকারি এই স্কুলের ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক জ্বালানি উপদেষ্টা ড. ম. তামিম।

অভিভাবকদের আশ্বস্ত করে তিনি বলেন, শিক্ষার্থীকে যৌন হয়রানির অভিযোগে গঠিত তদন্ত কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী দায়ীদের বিরুদ্ধে অবিলম্বে ব্যবস্থা নেয়া হবে। তিনি অভিভাবকদের কাছ থেকে শনিবার পর্যন্ত সময় চেয়েছেন। 

অভিভাবকদের পক্ষ থেকে জানা যায় কয়েকদিন আগে ছাত্রী ধর্ষণের চেষ্টার অভিযোগ জানাতে গেলে উপাধ্যক্ষ জিন্নাতুন্নেছা তাচ্ছিল্যের সুরে তাদের বলেছিলেন, ‘মধু থাকলে মৌমাছি আসবেই’। নারী অভিভাবকদের উদ্দেশে তিনি আরও বলেছিলেন, ‘আপনাদের বাসায় যখন স্বামীরা একা থাকেন তখন কাজের বুয়ার সঙ্গে তারা কী করেন তা কি আপনারা দেখতে পান?’

এদিকে শনিবার তদন্ত প্রতিবেদন জমা না দেয়া এবং কুরুচিপূর্ণ মন্তব্যের প্রতিবাদে উপাধ্যক্ষের বিরুদ্ধে ক্ষোভে ফেটে পড়েন আগত অভিভাবকরা। এসময় উপাধ্যক্ষ জিন্নাতুন্নেছার পদত্যাগ দাবি করে দোষীদের উপযুক্ত শাস্তি দাবি করেন তারা। উত্তেজিত অভিভাবকরা বিদ্যালয়ের গেটের সামনে ও জানালায় ভাঙচুর চালান।

অভিভাবকদের শান্ত করতে দুপুরে মৌখিকভাবে উপাধ্যক্ষ জিন্নাতুন্নেছাকে অব্যাহতি প্রদানের কথা ঘোষণা করা হয়। এসময় স্কুলের ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক জ্বালানি উপদেষ্টা ড. ম. তামিম সাংবাদিকদের বলেন, অভিভাবকদের অভিযোগ পাওয়ার পর এব্যাপারে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তবে তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন এখনও এসে পৌঁছায়নি।

তিনি আরও জানান, গত ৫ই মে প্রথম শ্রেণীর একজন শিক্ষার্থীকে পাশের একটি নবনির্মিত ভবনের রুমে নিয়ে ভয়ভীতি দেখিয়ে ধর্ষণের চেষ্টা করা হয়। এরপর ৯ই মে স্কুল কর্তৃপক্ষের কাছে এ রকম একটি অভিযোগ করেন শিক্ষার্থীর মা।

ম. তামিম বলেন, ওই অভিযোগকে আমলে নিয়ে আমরা তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করি।  কমিটিকে বলা হয়েছিল তিন দিনের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয়ার জন্য। ওই অনুযায়ী তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয়ার শেষ তারিখ ছিল শনিবার।  কিন্তু বিশেষ কারণে তা জমা দেয়া হয়নি।

এদিকে, এর আগে গত ৪ মে স্কুলের চতুর্থ শ্রেণির এক ছাত্রীও প্রতিষ্ঠানটির এক ক্যান্টিন বয়ের যৌন হয়রানির শিকার হন বলে অভিভাবকদের অভিযোগ রয়েছে।

কেন তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয়া হয়নি সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, তদন্তের সময়সীমা আরও তিনদিন বাড়ানো হয়েছে। এর আগে দুপুর পৌনে ১টার দিকে স্কুলের মাঠে অবস্থান নেয়া অভিভাবকদের সামনে আসেন অধ্যক্ষ বেলায়েত। তিনি বলেন, শিশু নির্যাতনের ঘটনায় যে কর্মচারীর বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে তার নাম গোপাল। তাকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়েছে।

এছাড়া, একজন অভিভাবককে লাঞ্ছিত করার অভিযোগে আরেক কর্মচারী শরীফুল ইসলামকেও সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়েছে। এছাড়া, তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটিও গঠন করা হয়েছে জানিয়ে তিনি অভিভাবকদের বলেন, কমিটির প্রতিবেদন পাওয়ার পর সে অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

কেবি