বিভাগের সভাপতি ও শিক্ষকদের ক্লাস-পরীক্ষা নেওয়ার ব্যাপারে অবহেলা, পরীক্ষার খাতা মূল্যায়নে দীর্ঘসূত্রিতাসহ বিভিন্ন কারণে ভয়াবহ সেশানজটের কবলে পড়েছে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের(রাবি) চারুকলা বিভাগের শিক্ষার্থীরা। তবে এর পিছনে বিভাগীয় সভাপতির অমনোযোগীতার কারণেই এমনটা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছে বিভাগের একাধিক শিক্ষার্থীরা।
ফলে একই সেশনে ভর্তি হওয়ার পরেও বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষার্থীরা পড়াশুনা শেষ করে কর্মজীবনে প্রবেশ করলেও এ বিভাগের শিক্ষার্থীরা সেশনজটের গ্যাড়াকলে পড়ে চার বছরের স্নাতক কোর্স ছয় থেকে সাত বছর এবং এক বছরের স্নাতকোত্তর কোর্স দুই থেকে তিন বছরেও শেষ করতে পারছে না। দীর্ঘ এ সেশানজটের কারণে বিভাগের শিক্ষার্থীরা যেমন হারাচ্ছে তাদের মূল্যবান সময় তেমনি অভিভাবকদেরকেও গুনতে হচ্ছে অতিরিক্ত টাকা।
জানা যায়, বর্তমান চারুকলা বিভাগটি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আওতায় চারুকলা মহাবিদ্যালয় নামে যাত্রা শুরু করে। পরবর্তীতে ১ নভেম্বর ১৯৯৪ সালে এটি বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা অনুষদের আওতাধীন চারুকলা বিভাগে পরিণত হয়। মহাবিদ্যালয় থেকে বিভাগে রূপান্তরিত হওয়ার দু’দশক অতিক্রম করলেও নানান সমস্যায় জর্জরিত বিভাগটি। বিভাগটির ন্যায় এর সমস্যাগুলো অনেক পুরোনো। যার মধ্যে অন্যতম হলো সেশনজট। সমস্যাটি প্রতিষ্ঠা লগ্ন থেকে চলে আসলেও বর্তমানে তা আরো ব্যাপক আকার ধারণ করেছে।
বর্তমানে এ বিভাগে মোট ৩৫ জন শিক্ষক রয়েছেন। কিন্তু অধিক পরিমাণে শিক্ষক থাকা সত্ত্বেও নিয়মিত ক্লাস-পরীক্ষা না নেয়ার কারণে দীর্ঘ সেশনজটের কবলে পড়েছে এ বিভাগের শিক্ষার্থীরা।
প্রতিষ্ঠা লগ্ন থেকে এই বিভাগে সিরামিক্স, পেইন্টিং, ক্রাফট, ভাস্কর্য, প্রিন্টমেকিং, ওরিয়েন্টাল আর্ট এবং গ্রাফিক্স ডিজাইনে বিএ এবং এমএ ডিগ্রী প্রদান করা হয়। প্রথম বর্ষের ফল অনুযায়ী মেধার ভিত্তিতে দ্বিতীয় বর্ষে শিক্ষার্থীদের উপরোক্ত কোর্স সিলেকশন দেওয়া হয়।
বর্তমানে বিভাগটিতে ৯টি ব্যাচ রয়েছে। যার মধ্যে মাস্টার্সে রয়েছে দু’টি ব্যাচ। ২০০৬-০৭ সেশনে ভর্তি হয়ে ৯ বছর অতিবাহিত করেও মাস্টার্স শেষ করে কর্ম জীবনে পদার্পন করতে পারেনি শিক্ষার্থীরা। এদের ২০১১ সালের পরীক্ষা দিতে হচ্ছে ২০১৫ সালে। ২৪ মাস পর ২০১৪ সালের অক্টোবর মাসে পরীক্ষা শেষ করে মাস্টার্সে রয়েছে ২০০৭-০৮ সেশনের শিক্ষার্থীরা। এই দুই ব্যাচের শিক্ষার্থীরা অভিযোগ করে বলছে আমাদের সাথে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে তারা এখন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে চাকরি করছে। কিন্তু সেশন জটের কারণে আমরা এখনো মাস্টার্স শেষ করে বের হতে পারছি না।
এদিকে চতুর্থ বর্ষে রয়েছে দু'টি ব্যাচ। ২০১৩ সালের অক্টোবর মাসে পরীক্ষা শেষ করে তারা চতুর্থ বর্ষে পদার্পন করে ০৮-০৯ সেশনের শিক্ষার্থীরা। কিন্তু চতুর্থ বর্ষে উঠার ১৭ মাস অতিবাহিত হলেও এখনো চুড়ান্ত পরীক্ষা শুরু হয়নি। এদিকে ২৮ মাস তৃতীয় বর্ষে থাকার পর ২০১৪ সালের ২৭ সেপ্টেম্বরে চুড়ান্ত পরীক্ষা শেষ করে চতুর্থ বর্ষে পদার্পন করেছে ০৯-১০ সেশনের শিক্ষার্থীরা।
তৃতীয় বর্ষে বর্তমানে রয়েছে দুইটি ব্যাচ। ২০১৩ সালে অক্টোবরে দ্বিতীয় বর্ষের চুড়ান্ত পরীক্ষা শেষ করে তুতীয় বর্ষে পদার্পন করে ২০১০-১১ শেষনের শিক্ষার্থীরা। দীর্ঘ ১৭ মাস অতিবাহিত হলেও এখনো তৃতীয় বর্ষের চুড়ান্ত পরীক্ষা হচ্ছে না। এদিকে দীর্ঘ ১৮ মাস দ্বিতীয় বর্ষে থাকার পর ২০১৪ সালের অক্টোবরে চুড়ান্ত পরীক্ষা শেষ করে তুতীয় বর্ষে পদার্পন করেছে ১১-১২ সেশনের শিক্ষার্থীরা। এবং দ্বিতীয় বর্ষের চুড়ান্ত পরীক্ষা দিয়ে তৃতীয় বর্ষে পদার্পন করতে চলেছে ১২-১৩ সেশনের শিক্ষার্থীরা।
অন্যদিকে মাস্টার্স দ্বিতীয় ও প্রথম বর্ষে রয়েছে একটি করে ব্যাচ। এদের মধ্যে সবচেয়ে পুরাতন ব্যাচ ২০০৬-০৭ সেশনের মাস্টার্স পরীক্ষা গত তিন মাস ধরে চলমান রয়েছে। অন্যান্য বিভাগে যেখানে ওই সেশনের পরীক্ষা প্রায় তিন বছর আগেই শেষ হয়েছে।
অন্যদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুষদগুলোর আইনের ২৬নং ধারায় 'বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠদান কোর্সের সময়কাল আটমাস এবং পরীক্ষা সমাপ্তির দুইমাসের মধ্যে ফলাফল প্রকাশের কথা সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকলেও এখানে পরীক্ষার ফল প্রকাশ করা হয় অনেক দেরিতে। তৃতীয় বর্ষে তিনটি, চতুর্থ বর্ষে দুইটি ও মাস্টার্সে দুইটি ব্যাচ রয়েছে। এদের মধ্যে অনেকের ক্লাস শুরু হয়নি, অনেকের ক্লাস শেষ হয়েছে অনেক দিন আগে কিন্তু পরীক্ষা শুরু হচ্ছে না। বিভাগের এই অবহেলা ও অমনোযোগীতায় হতাশ এবং ক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা।
শিক্ষার্থীরা অভিযোগ করে বলেন, বিভাগ যথা সময়ে পরীক্ষা না নেওয়া ফলে আমদেরকে ভয়াবহ সেশনজটে দিকে ঠেলে দিচ্ছে। একটা বর্ষে এক বছরের জায়গায় ২৪-২৮ মাস পর্যন্ত থাকতে হচ্ছে। আমরা পরীক্ষার কথা বলতে গেলে আমাদেরকে আবেদন করতে বলে, কিন্তু তাতেও কোন লাভ হচ্ছে না। আমারদের সাথে যারা অন্যান্য বিভাগে ভর্তি হয়েছিল তারা এখন অনেকে বের হয়ে চাকরি করছে। আমাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে আমরা শঙ্কিত। এভাবে আমাদের ভবিষ্যৎ যেমন অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিচ্ছে, তেমনি আর্থিকভাবে অধিক পরিমাণে হেনস্থা করা হচ্ছে আমাদের অভিবাবকদের। ভয়াবহ সেশনজটের এই করাল গ্রাস থেকে মুক্তি দিতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করেন শিক্ষার্থীরা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শিক্ষার্থী জানান, শিক্ষকরা ঠিকভাবে ক্লাশ না নেওয়ায় যথাসময়ে সিলেবাস শেষ হয়না। তাই পরীক্ষাও যথাসময়ে হয় না। ফলে আমরা এক বৎসরের কোর্স শেষ করছি ৩/৪ মাস দেরিতে। এছাড়াও শিক্ষকরা যথাসময়ে পরীক্ষার ফলাফল দিতেও উদাসীন।
বিভাগের সভাপতি প্রফেসর ড. আব্দুল মতিন তালুকদার বলেন, বিভিন্ন সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে অস্থিতিশীল ও বেপরোয়া ছাত্র রাজনীতি, সংঘর্ষে ক্যাম্পাস বন্ধ থাকা, বর্তমান সময়ে রাজনৈতিক কারণে ঘন ঘন হরতালে সেশনজট বাড়ছে। সেশনজট কাটানোর জন্য আমরা অতি দ্রুত পরীক্ষা নিচ্ছি।
তবে বিভগীয় সভাপতির অবহেলার কারণে সেশনজট কথা অস্বীকার করে তিনি বলেন, আমার অবহেলার কারণে ক্লাস-পরীক্ষা বিলম্বিত হচ্ছে না। অনেক সময় দেখা গেছে পরীক্ষার তারিখ ঘোষণা করা হয় তখন বিভিন্ন অজুহাত দেখিয়ে পরীক্ষা পিছানোর জন্য আবেদন করে। এমনকি আমার কাছে শিক্ষার্থীদের স্বাক্ষরিত আবেদন কপিও আছে। আমরা যথাসাধ্য কাজ করে যাচ্ছি, আশা করি খুব শীঘ্রই এই সেশনজট কাটিয়ে উঠতে পারবো।
কেএইচ





