কুষ্টিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইবি) পরিবহন যেন গলার কাঁটা। বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবহন সমস্যা দিনদিন বেড়েই চলছে। বাজেটের বড় একটি অংশ পরিবহন খাতে ব্যয় করা হলেও শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের কাঙ্খিত সেবা নিশ্চিত করতে পারছে না বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।
নিজস্ব পরিবহন চাহিদা পূরণ না হওয়ায় বাধ্য হয়েই ভাড়া বাসে চাহিদা মেটাচ্ছে প্রশাসন। লাইসেন্সবিহীন চালক, ফিটনেসবিহীন গাড়ি, ক্যাম্পাসের ভেতরে বেপরোয়া গাড়ি চালানো, ক্যাম্পাস থেকে বের হওয়ার সময় অনর্থক প্রতিযোগিতা, রাস্তায় সাধারণ যাত্রী বহন নিত্যদিনের অভিযোগ। তবে এসব সমস্যা মাথায় নিয়েই চলাচল করছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা।ক্রমবর্ধমান এ সমস্যার দ্রুত সমাধান না করা হলে যেকোনো সময় ক্যাম্পাসে আবারো বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে বলে আশঙ্কা শির্ক্ষার্থীদের। সরেজমিন দেখা যায়, ভাড়া করা গাড়ির বেশির ভাগই ফিটনেসহীন। সিটকভার ছেঁড়া-ফাটা ও ময়লা। এতে গাড়ির ভেতরে উঠলে দুর্গন্ধে দম বন্ধ হয়ে আসে।
এ দিকে গাড়ি ক্যাম্পাসে প্রবেশের কোনো নিয়ম মানে না। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকেও ক্যাম্পাসে গাড়ি প্রবেশের কোনো সময় বেঁধে দেয়া হয়নি। গাড়ি ছাড়ার সময় পার হয়ে গেলেও কিছু গাড়ি ক্যাম্পাসে প্রবেশ করে। এতে ওই গাড়ির নিয়মিত শিক্ষার্থীরা সিট পাওয়ার জন্য মেইন গেটের বাইরে গিয়ে অবস্থান নেন।
গাড়ি আসার সাথে সাথে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের সামনে কুষ্টিয়া-খুলনা মহাসড়কের মাঝখানে গাড়ি থামিয়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তারা গাড়িতে ওঠেন। এদিকে গাড়ি রাস্তার ওপর থামানোর কারণে মহাসড়কে গাড়ি চলাচলে ব্যাঘাত ঘটে। অনেক সময় ক্যাম্পাসের ভেতরেও বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালাতে দেখা যায়। এতে দুর্ঘটনার ঝুঁকি অনেক বেশি। গাদাগাদি করে গাড়ি পার্কিং আর ক্যাম্পাসের ভেতরে এক গাড়ি অন্য গাড়ির আগে বের হওয়ার চেষ্টার কারণেই ২০১৪ সালের ২৯ নভেম্বর তৌহিদুর রহমান টিটু নামে এক শিক্ষার্থী নিহত হন।
কিন্তু এর পরেও গাড়ি চলাচলে কোনো সুনির্দিষ্ট নিয়মনীতি প্রয়োগ করতে দেখা যায়নি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে। কুষ্টিয়া-খুলনা মহাসড়কে নিয়মিত যাতায়াত করা রুপসা পরিবহনের একজন চালক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের গাড়ি সাধারণ যাত্রী বহন করায় আমাদের যাত্রী কমে যায়। ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী তরিকুল ইসলাম বলেন, বিকট শব্দে মাথাব্যথা শুরু করে। এ ছাড়া গাড়ির ভেতরের গন্ধ সহ্য করার মতো নয়। অথচ আমরা প্রতি সেশনেই পরিবহন ফি দেই। আরবি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের শিক্ষার্থী মনিরুল ইসলাম বলেন, গাড়ির সব কিছুই ভাঙা।
চলার সময় বিকট শব্দ হয়। এ ছাড়া গাড়ির ভেতরে উৎকট গন্ধ। বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং বিভাগের শিক্ষার্থী জেসমিন জাহানারা বলেন ভাড়া করা গাড়িগুলোর অধিকাংশ চলাচলের অনুপযোগী। অধিকাংশ গাড়ির সিটের এবং ছাদের সমস্যা রয়েছে। বৃষ্টি হলে যতটা না পানি বাইরে পড়ে তার চেয়ে বেশি পড়ে ভেতরে। একই অভিযোগ ঝিনাইদহ শহর থেকে ক্যাম্পাসে যাতায়াতকারী শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের। তারা জানান, গাড়িতে যাতায়াতের ক্ষেত্রে দিনের দীর্ঘসময় রাস্তায় ব্যয় হচ্ছে। না হচ্ছে ভালোভাবে যাতায়াত, না হচ্ছে পড়ালেখো।
এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে বেকায়দায় ফেলতে প্রতিষ্ঠার পর থেকে টার্গেট করে সুবেধাভোগী পক্ষ সব সময় পরিবহনকে হাতিয়ার হিসেবে বেছে নিয়েছে। বিভিন্ন দাবি আদায়ের পন্থা হিসেবে গত ৫ বছরে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবহনের ওপর অন্তত ২০ বার হামলা হয়েছে।
কখনও চাকরি প্রত্যাশীরা আবার কখনও দুর্বৃত্তের বেশে পরিবহনের ওপর হামলা করেছে। ছাত্র সংগঠনের নেতাকর্মীরাও বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ইস্যুতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পরিবহনকে টার্গেট হিসেবে নিয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবহন অফিস সূত্র জানায়, প্রতিদিন নিজস্ব এবং ভাড়ায় প্রায় ৬০টি বাস চলাচল করে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাড়া করা বাসের মধ্যে কুষ্টিয়াগামী বাসগুলোতে প্রতি ট্রিপে বড় বাস ১৭০০ টাকা ও মিনিবাস ১৫৫৫ টাকা, ঝিনাইদহগামী বাসে ট্রিপ প্রতি বড় বাস ১৬৭০ টাকা ও মিনিবাস ১৫৪৫ টাকা এবং শৈলকূপাগামী বাসে ট্রিপ প্রতি ১২২৩ টাকা বাস মালিককে দিতে হয়। প্রতিটি বাস দিনে তিন ট্রিপ করে চলে।
ভাড়া গাড়ির একদিনের কুষ্টিয়া রুটে ট্রিপ সংখ্যা বড় বাস ৩৭, মিনি বাস ১২টিসহ মোট ৪৯। ঝিনাইদহ রুটে বড় বাস ৩৪ ও মিনি বাস ৩টি মোট ৩৭। শৈলকূপা রুটে মিনি বাস ১৭টি। পরিবহন শাখার হিসাব মতে, বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাড়া করা ৩১টি বাসের পেছনে প্রতিদিন খরচ হয় ১ লাখ ৬৩ হাজার ৭৬৬ টাকা। এছাড়া ভাড়ায় চালিত বিআরটিসি বাস বাবদ দিনে খরচ ২১ হাজার টাকা। বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব ৩১টি বাসের পেছনে প্রতিদিন তেল বাবদ খরচ হয় ৪৬ হাজার ২৩৭ টাকা।
মাসের হিসাবে দেখা যায়, নিজস্ব গাড়ি বাবদ ব্যয় ১৯ লাখ ৫৯ হাজার ৬০৪ টাকা। ভাড়াগাড়ি বাবদ মাসিক ব্যয় ৩৫ লাখ ১৩ হাজার ৮২৪ টাকা। বিআরটিসির ডাবল ডেকারের মাসিক ব্যয় ৪ লাখ ২৫ হাজার ২৫০ টাকা। ভাড়া মাহেন্দ্র বাবদ মাসিক ব্যয় ১৮ হাজার ৬শ’ টাকা। সব মিলিয়ে প্রতিদিন পরিবহন খাতে খরচ প্রায় আড়াই লাখ টাকা।
শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের ক্যাম্পাসে আনা-নেয়ার জন্য পরিবহন খাতে এত মোটা অংকের টাকা ব্যয় করা হলেও সেবা পাওয়া যাচ্ছে যৎসামান্য। এ ব্যাপারে সাবেক পরিবহন প্রশাসক প্রফেসর ড. মামুনুর রহমান বলেন, শিক্ষার্থীদের আনা-নেয়ার ক্ষেত্রে পরিবহন ছাড়া বিকল্প নেই। এক্ষেত্রে উচিত হবে বিআরটিসির সঙ্গে যোগাযোগ করে নিজস্ব কিছু পরিবহনের ব্যবস্থা করা।
কুষ্টিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইবি) বর্তমান পরিবহন প্রশাসক অধ্যাপক ড. আনোয়ার হোসেন বলেন, সমস্যাগুলো কাটিয়ে উঠতে আমরা সচেষ্ট। ভালো গাড়ির দাবি করলে তারা আমাদের গাড়ি দিতে রাজি হয় না। ইতোমধ্যে মালিক সমিতির সাথে আমাদের কথা হয়েছে। গাড়িচালক ও সহযোগীদের আচরণবিধি নিয়ে আলোচনা করতে তারা নিজে থেকেই আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। তিনি আরো বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়টি যদি সম্পূর্ণ আবাসিক করা যায় তাহলে পরিবহন সমস্যা থাকবে না।
সবুজ/ এআই





