শনিবার (৮ আগস্ট) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নবাব নওয়াব আলী চৌধুরী সিনেট ভবনে ঐতিহাসিক জুলাই গণঅভ্যুত্থান-২০২৪-এর দ্বিতীয় বর্ষপূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত ‘ফ্যাসিস্ট সরকার পতনে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের ভূমিকা’ শীর্ষক আলোচনা সভায় তিনি এসব কথা বলেন।
উপাচার্য বলেন, ‘তিন দিন আগে আমরা দেখেছি, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪০৪ জন শিক্ষক শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনতে চাচ্ছেন। আমরা তাদের পর্যবেক্ষণ করছি। তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে।’
তবে এ ধরনের পদক্ষেপকে প্রতিহিংসা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই বলেও মন্তব্য করেন তিনি। ওবায়দুল ইসলাম বলেন, ‘কেউ যদি মনে করেন এটা প্রতিহিংসা, তা নয়। আমরা কারও প্রতি প্রতিহিংসা চাই না। কিন্তু কেউ অপরাধ করলে তাকে শাস্তির আওতায় আনতে হবে।’
তিনি প্রশ্ন তুলে বলেন, ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত একজন আসামিকে কেন তারা বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনতে চাইছেন, তা তারা জানেন না। কেউ রাষ্ট্রদ্রোহিতার সঙ্গে জড়িত থাকলে আইনের মাধ্যমে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তার বিচার করবেন বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
ঢাবি উপাচার্য বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ভিন্নমত পোষণকারী শিক্ষকদের ওপর নজরদারি ও নির্যাতন চালানো হয়েছে। সাদা দলের সভাগুলোতেও আওয়ামীপন্থী শিক্ষকদের নজরদারি থাকত বলে দাবি করেন তিনি। এর ফলে শিক্ষকরা স্বাধীনভাবে মত প্রকাশ করতে পারতেন না।
বিভিন্ন সময়ে শিক্ষকদের তালিকা তৈরি করে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়েছিল বলেও জানান তিনি।
ওবায়দুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা থেমে যাইনি। কথা বলেছি, রাজপথে নেমেছি, বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছি, অবস্থান নিয়েছি এবং ছাত্রদের পাশে দাঁড়িয়েছি।’ তিনি বলেন, এসব ঘটনা ভুলে গেলে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদ হওয়া মানুষ এবং দীর্ঘ ১৭ বছর গণতান্ত্রিক আন্দোলনে হামলা, মামলা ও নির্যাতনের শিকার ব্যক্তিদের প্রতি অন্যায় করা হবে।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের প্রসঙ্গ তুলে অধ্যাপক ওবায়দুল ইসলাম বলেন, আন্দোলনের শুরুতে শিক্ষার্থীদের দাবি ছিল বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠা। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা তখন তাদের নৈতিক সমর্থন জানিয়েছিলেন। পরে আন্দোলনকারীদের ওপর নির্যাতন বাড়তে থাকলে আন্দোলনটি গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয়।
একপর্যায়ে শহীদের সংখ্যা বাড়তে থাকে এবং জুলাইয়ের শেষদিকে দেশের মানুষ একটি নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখার সুযোগ পায় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
তিনি বলেন, ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী বাংলাদেশের মানুষের ওপর গণহত্যা চালিয়েছিল। আর ২০২৪ সালে একই দেশের সরকারপ্রধান দেশের মানুষের ওপর নির্যাতন চালিয়েছেন। তবে দুই ঘটনার মাত্রা ও প্রেক্ষাপট ভিন্ন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, আর ২০২৪ সালে বাংলাদেশের পতাকা ও স্বাধীনতার মর্যাদা সমুন্নত রাখার নতুন প্রত্যয় তৈরি হয়েছে। দুটোকেই মনে রাখা প্রয়োজন বলে তিনি মন্তব্য করেন।
বর্তমান সরকারকে সময় দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে ঢাবি উপাচার্য বলেন, মাত্র পাঁচ মাসের মধ্যে ১৭ বছরের সব সমস্যার সমাধান করা সম্ভব নয়। দীর্ঘদিনের অনিয়ম ও অন্যায়ের সমাধানে সময় প্রয়োজন।
নতুন বাংলাদেশে কোনো ধরনের বৈষম্য, দমন-পীড়ন কিংবা স্বৈরাচার প্রতিষ্ঠার সুযোগ দেওয়া যাবে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি। সবার মতামতকে গুরুত্ব দিয়ে ন্যায়বিচার ও সুশাসন নিশ্চিত করার আহ্বান জানান তিনি।
শেখ হাসিনার শাসনামলে গুম, খুন, হামলা ও মামলার অভিযোগ তুলে ওবায়দুল ইসলাম বলেন, দীর্ঘদিনের দমন-পীড়নের অবসান ঘটিয়ে নতুন বাংলাদেশ গড়ে তুলতে হবে। কোনো রাজনৈতিক দল বা ব্যক্তিকে প্রতিহিংসার শিকার না করে অপরাধীদের আইনের আওতায় এনে বিচার নিশ্চিত করতে হবে।
শহীদদের আত্মত্যাগের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে তিনি বলেন, তাদের স্বপ্নের বাংলাদেশ গড়তে ন্যায়বিচার, সুশাসন ও বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠা জরুরি। এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে বর্তমান সরকারের পরিকল্পনা সফল করতে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি।
এস