ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, অভিযুক্ত ঐশী তাদের অগোচরে ও অনুমতি ছাড়া বিভিন্ন ব্যক্তিগত ও সংবেদনশীল মুহূর্তের ছবি ফ্রেমবন্দী করতেন। আবাসিক হল একটি নিরাপদ জায়গা মনে করে তারা সেখানে স্বাচ্ছন্দ্যমতো পোশাক পরে চলাফেরা করেন। কিন্তু অভিযুক্ত ছাত্রী তাদের ঘুমন্ত অবস্থার, টি-শার্ট পরা বা ওড়না ছাড়া অবস্থার ছবি তুলে বাইরে পাচার করেছেন।
এমনকি বোরকা ও নিকাব পরা ছাত্রীদেরও পর্দার আড়ালের ছবি তিনি তুলেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। সেসব ছবি যুক্তরাজ্যপ্রবাসী ‘আবিদ’ নামের এক যুবকের নিকট পাঠাতেন। সম্প্রতি ওই যুবকের সাথে ঐশীর দ্বন্দ তৈরি হলে আবিদ নিজেই ছবিগুলো ভুক্তভোগীদের ইনবক্সে পাঠিয়ে দেন। সেখান থেকেই মূলত বিষয়টি জানাজানি হয় এবং হলজুড়ে চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়। এছাড়াও একাধিক দেশীয় প্রেমিকের কাছেও এসব ছবি পাঠিয়েছেন বলে জানা যায়। ভুক্তভোগীদের দাবি, এ পর্যন্ত অন্তত ১০ জন শিক্ষার্থীর ছবি পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া গেছে এবং প্রমাণের স্বপক্ষে তাদের কাছে প্রয়োজনীয় স্ক্রিনশট সংরক্ষিত রয়েছে।
অভিযোগের সত্যতা স্বীকার করে অভিযুক্ত তুবাউল জান্নাত ঐশীর বলেন, ‘যাকে এসব ছবি পাঠানো হয়েছে, সে আমার ছোটবেলার বন্ধু। আর যাদের ছবি পাঠিয়েছি ওরা মূলত আমার ফ্রেন্ড, আমার সামনেই রুমে বসে গল্প করছিল, কেউ হয়তো শুয়ে বা বসে ছিল। ও যখন আমাকে জিজ্ঞেস করল—'তুমি কোথায় আছো, কী করছো?' আমি সাধারণভাবে বোঝানোর জন্যই রুমের একটা ছবি তুলে পাঠাই যে, 'এইতো আমি রুমে আছি, ফ্রেন্ডরা এই কাজ করছে।' আমি এতকিছু ভাবিইনি! যে একটা মেয়ের প্রাইভেসি নষ্ট হবে। আবেগে পড়ে, ঝোঁকের মাথায় আমি ছবি দিছি। আর ওরা আমার পাশের বেডমেট, আমার রুমমেট, ওরা তো আমার ফ্রেন্ড, আমি ওদের ছবি দিছি, আমি তো অন্য কারো ছবি দেইনি।’
তিনি আরো বলেন, “ওই ছেলেটা আমাকে বিয়ে করতে চায় এখনই। আমি তো এখন বিয়ে করব না, সে আমাকে ফুসলায়ে এখনই বিয়ে করবে। কিন্তু আমি তো এখন বিয়ে করব না! আমি বলছি, আমার বাবা-মাও জানে না, আমি এখন বিয়ে করব না। সে আমার সাথে আমার রুমমেটদের ফ্রেন্ডশিপ নষ্ট করার জন্য, আমাকে খারাপ বানানোর জন্য, আমাকে কালার বানানোর জন্য ছবিগুলো পাঠিয়েছে। আমার বাবা এলেই আমি তার বিরুদ্ধে যথাযথ আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করব।”
এদিকে যুক্তরাজ্য প্রবাসী প্রেমিক আবিদ বলেন, “সে ইন্টেনশনালি এসব ছবি তুলতো। ক্লোজ শটও নিত, দূর থেকেও তুলত। আর ১/২টা মেয়ের ছবি দিছে এমন না, আমার কাছে প্রায় ২০ থেকে ৩০টা মেয়ের ছবি পাঠিয়েছিলো। আমি দেশে গেলে সে আমার ফোন নিয়ে কনভারসেশন ডিলিটও করে দিছে। আমি ছবিগুলো সেভ না করে রাখলে আমার কাছে কোনো প্রুফই থাকত না! সে ক্লাসরুমে বসা মেয়েদের ছবি পর্যন্ত সে দিছে! কোনো সুস্থ মস্তিষ্কের মানুষ এইভাবে ছবি মানুষকে দিতে পারে না! আমি তাকে "তুমি এটা কেন করতেছ?" জিজ্ঞাসা করলে সে অট্টহাসিতে ফেটে পড়ত! আসলে এগুলা করে সে পৈশাচিক আনন্দ পায়। তার ভেতরে বিন্দুমাত্র অনুশোচনা নাই! এই মেয়েকে আল্লাহও বিশ্বাস করতে পারবে না!
তিনি আরো বলেন, আমি তিন থেকে চার মাস আগে লন্ডন থেকে ইসলামিক ইউনিভার্সিটিতে গেছিলাম তার জন্য। ও আমাকে বলছিল যে আমি গেলে বিয়ে করবে। সে আমার সাথে ডিরেক্ট প্রতারণা করছে! তার সাথে একাধিক ছেলের অবৈধ সম্পর্ক আছে। ইভেন ইউনিভার্সিটিতে পিয়াস নামের একটা ছেলের সাথে তার অনেকদিনের রিলেশন ছিল। সে তার সাথে রিসোর্টে কাটানো ছবি আমাকে দিছে। কিন্তু এখন সব অস্বীকার করতেছে। এছাড়াও মঈন নামে বাংলা ডিপার্টমেন্টের ছেলের সাথেও তার ডিপ রিলেশন ছিলো। সেই ছেলেই আবার আমাকে ভয়েস রেকর্ড করে দিছে। এদের কাছেও সে ছবি পাঠাতো। সত্য প্রমাণের জন্য আমার কাছে স্ক্রিনশট, ভয়েস রেকর্ড এবং ছেলেদের সাথে ওর সম্পর্কের প্রুফও আছে।”
আর্থিক ক্ষতি ও শাস্তির দাবি করে বলেন, “আমি দেশের বাইরে জব করে রক্ত পানি করা কষ্টের টাকা ওর পেছনে খরচ করছি। আমি গত ৬ মাসে ৮০ হাজার টাকা খরচ করেছি (যার বিকাশ স্টেটমেন্ট আমার কাছে আছে)। এরপরও সে ক্যাম্পাসে না থেকেও রুমমেটকে দিয়ে মিথ্যে বলিয়েছিল। ওর মধ্যে কোনো অনুশোচনা নেই; আমি চাই ওকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার করা হোক। দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না দেখলে অন্য মানুষেরাও ভয় পাবে না।
এ বিষয়ে জুলাই-৩৬ হলের প্রভোস্ট অধ্যাপক ড. এ. কে. এম. শামছুল হক ছিদ্দিকীর বলেন, আমরা এ বিষয়টা নিয়ে বসেছি, তদন্ত চলমান। অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে আমরা সিদ্ধান্ত নেব।”
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ড. শাহিনুজ্জামান বলেন, “রাত ৩টায় বিষয়টি জানার পর পরই আমি মাননীয় উপাচার্য স্যারকে লিখিতভাবে জানাই। সকাল সাড়ে ৬টায় ভিসি স্যার আমাকে ফোন করে পরিস্থিতি খতিয়ে দেখার পাশাপাশি একটি তদন্ত কমিটি গঠনের নির্দেশ দিয়েছেন। হল প্রভোস্ট ও হাউস টিউটরদের সাথে সার্বিক বিষয়ে কথা বলে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।”
ঘটনার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও হল কর্তৃপক্ষের কাছে অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থার দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীরা। তারা আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, দ্রুত যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করা না হলে আরও অনেক শিক্ষার্থীর ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও নিরাপত্তা চরম হুমকির মুখে পড়বে।
প্রসঙ্গত, লন্ডনে থাকা বয়ফ্রেন্ডের কাছে রুমমেটদের আপত্তিকর ছবি পাঠানোর অভিযোগ ওঠার পর ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইবি) 'জুলাই ৩৬' হলের অভিযুক্ত শিক্ষার্থী তুবাউল জান্নাত ঐশীকে হল থেকে সাময়িক বহিষ্কার করা হয়েছে এবং ঘটনাটি তদন্তের জন্য হলের আবাসিক শিক্ষক অধ্যাপক ড. আরিফা আক্তারকে আহ্বায়ক করে ৩ সদস্যবিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে হল প্রশাসন। শুক্রবার (৭ আগস্ট) হলের ৯ম জরুরি সভায় গৃহীত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, তদন্তের স্বার্থে অভিযুক্ত ছাত্রীর ব্যবহৃত ২টি ব্যক্তিগত মোবাইল ফোন জব্দ করা হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছেন হল প্রভোস্ট অধ্যাপক ড. এ. কে. এম শামছুল হক ছিদ্দিকী।
এস