জনমত যাচাইয়ের জন্য তৃতীয় দফায় শিক্ষা আইনের খসড়া প্রকাশ করেছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। এতে বেসরকারি এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের বদলি ও পদোন্নতির সুযোগ থাকছে। রয়েছে প্রশ্নপত্র ফাঁসে জড়িতদের সাজার বিধান। প্রশ্নপত্র ফাঁসের গুজব রটনাকারীদেরকেও শাস্তির আওতায় আনার কথা বলা হয়েছে প্রস্তাবিত এ আইনে।
একই সঙ্গে স্থায়ী শিক্ষা কমিশন গঠন, পাবলিক পরীক্ষার প্রধান পরীক্ষক এবং প্রশ্ন প্রণেতাদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা রাখা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনা কমিটির সদস্যদের ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা ‘স্নাতক’ নির্ধারণ, মাধ্যমিক স্তরে নোট-গাইড বই বন্ধ এবং শিক্ষাঙ্গনে সন্ত্রাসী ও জঙ্গিবাদী কাজে জড়িত হলে কঠোর শাস্তির বিধান রাখা হচ্ছে। প্রস্তাবিত এ আইনের নাম ‘শিক্ষা আইন-২০১৬’। জাতীয় শিক্ষানীতি-২০১০ এর আলোকে এ আইন করা হচ্ছে বলে জানা গেছে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে ৩ মার্চ রোববার প্রস্তাবিত খসড়াটি প্রকাশ করা হয়েছে। এ বিষয়ে যেকোনো মতামত আগামী ১০ এপ্রিলের মধ্যে পাঠানোর আহ্বান জানানো হয়েছে। শিক্ষা আইনের খসড়াটি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে পাওয়া যাবে।
মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, খসড়া আইন প্রণয়নের পর দুই দফায় দেশের বিশিষ্ট শিক্ষাবিদসহ বিভিন্ন মহল থেকে বেশ কিছু সংযোজন-বিয়োজনের প্রস্তাব এসেছিল। সেগুলো বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে মতামত গ্রহণ করা হচ্ছে। শিগগির তা চূড়ান্ত করা হবে।
খসড়া আইন অনুসারে, বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের এমপিওভুক্ত প্রায় ৫ লাখ শিক্ষক-কর্মচারী বদলি ও পদোন্নতির সুযোগ পাবেন।
এদিকে প্রশ্নফাঁসের বিষয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, সাজা কঠোর না হওয়ায় বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করেও প্রশ্নফাঁস পুরোপুরি ঠেকানো যাচ্ছে না। এ কারণে প্রস্তাবিত নতুন আইনে এ সংক্রান্ত অপরাধের সাজা কঠোর করা হচ্ছে।
‘দ্য পাবলিক এক্সামিনেশনস (অফেন্স) ১৯৮০ (অ্যামেন্ড ১৯৯২) অ্যাক্ট’ অনুযায়ী প্রশ্নপত্র ফাঁস, প্রকাশ বা বিতরণের সঙ্গে জড়িতদের সর্বোচ্চ শাস্তি চার বছরের কারাদণ্ড। কিন্তু প্রস্তাবিত নতুন আইনের খসড়ায় বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি পাবলিক পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস বা এর সঙ্গে জড়িত থাকলে সর্বোচ্চ ১০ বছরের কারাদণ্ড বা ৫ লাখ টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন।
প্রস্তাবিত খসড়ায় ইংরেজি মাধ্যম স্কুলসহ সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের বেতন ও অন্যান্য ফি সরকারের অনুমোদন ছাড়া নির্ধারণ করলে ৫ লাখ টাকা জরিমানা বা এক বছরের কারাদণ্ড বা উভয় দণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। এ ছাড়া সরকারের যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ছাড়া বিভিন্ন স্তরের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনা করলে প্রতিষ্ঠান বন্ধসহ সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের কারাদণ্ড ও ১০ লাখ টাকা জরিমানা করা হবে।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অবস্থানকালে শিশুকে কোনো ধরনের মানসিক নির্যাতন বা শারীরিক শাস্তি প্রদান করা যাবে না। এই বিধান লঙ্ঘনের শাস্তি হিসেবে অনধিক ১০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড অথবা তিন মাসের কারাদণ্ডের কথা বলা হয়েছে।
আইনে গাইড ও নোট বই নিষিদ্ধ করা হয়েছে। শিক্ষার মানোন্নয়নে গাইড বই, নোট বই প্রকাশ এবং সরবরাহকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। তবে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের অনুমোদন নিয়ে সহায়ক পুস্তক প্রকাশের সুযোগ রাখা হয়েছে। গাইড ও নোট বই প্রকাশের শাস্তি ২ লাখ টাকা অর্থদণ্ড ও ছয় মাসের কারাদণ্ড।
নিবন্ধন ছাড়া কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপন বা পরিচালনা করা যাবে না। জনসংখ্যার ঘনত্ব, ভৌগোলিক অবস্থান, অনগ্রসরতা, দূরত্ব বিবেচনায় প্রতিষ্ঠান স্থাপনের কথা বলা হয়েছে। এই বিধান লঙ্ঘন করলে মাধ্যমিক স্তরের প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ৩ লাখ টাকা জরিমানা ও ছয় মাস কারাদণ্ডের শাস্তি রাখা হয়েছে। উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে এই শাস্তি ১০ লাখ টাকা অর্থদণ্ড এবং পাঁচ বছরের কারাদণ্ডের কথা বলা হয়েছে।
প্রতিটি উপজেলায় অন্তত একটি সরকারি মাধ্যমিক স্কুল, একটি টেকনিক্যাল স্কুল ও একটি সরকারি কলেজ স্থাপন অথবা বিদ্যমান প্রতিষ্ঠানের মধ্য থেকে মানসম্মত প্রতিষ্ঠানকে জাতীয়করণ করার কথা বলা হয়েছে।
নতুন এ আইনে একটি স্থায়ী শিক্ষা কমিশন গঠনের বিধান রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আয়-ব্যয়ের হিসাব সঠিকভাবে সংরক্ষণ ও নিরীক্ষা করাতে হবে। প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-শিক্ষার্থী, শাখাসহ সব তথ্য সঠিকভাবে সরকারকে জানাতে হবে।
প্রস্তাবিত আইনে শিক্ষার স্তর হবে চারটি। এগুলো হলো প্রাক-প্রাথমিক, প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা। প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষায় শিক্ষার্থীর বয়স হবে চার থেকে ছয় বছর। প্রাথমিক শিক্ষা শুরু হবে ছয় বছর বয়স থেকে। এ স্তর হবে প্রথম থেকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত। নবম থেকে দ্বাদশ শ্রেণি হবে মাধ্যমিক স্তর। এরপর শুরু হবে উচ্চশিক্ষার স্তর।
খসড়া শিক্ষা আইনের বিষয়ে শিক্ষাবিদ ও গণস্বাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে চৌধুরী বলেন, জাতীয় শিক্ষানীতির ২৭ অধ্যায়ের ১ নম্বর অনুচ্ছেদে শিক্ষা প্রশাসনে গতিশীলতা আনতে একটি ‘সমন্বিত শিক্ষা আইন’ প্রণয়নের কথা বলা হয়েছিল। এ আইনের মাধ্যমে শিক্ষা প্রশাসনের সর্বস্তরে জবাবদিহি, গতিশীলতা ও স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠা নিশ্চিত করে কার্যকারিতা বৃদ্ধি ও দুর্নীতিমুক্ত করার কথা বলা হয়েছে।
তিনি বলেন, বাস্তবতার আলোকে এ আইনের গুরুত্ব অনেক। প্রস্তাবিত আইনে অনেক ইতিবাচক দিক রয়েছে।
রাশেদা কে চৌধুরী আরো বলেন, তবে কিছু কিছু ক্ষেত্রে বড় অপরাধেও লঘুদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। এগুলো আরো কঠিন হওয়ার প্রয়োজন ছিল।
প্রসঙ্গত, ২০১৩ খ্রিষ্টাব্দের ৫ আগস্ট প্রথমবারের মতো শিক্ষা আইনের বিষয়ে মতামত চাওয়া হয়। এরপর ২০১৫ সালের অক্টোবরে দ্বিতীয় দফায় আইনটি ওয়েবসাইটে প্রকাশ করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে আবার তা প্রত্যাহার করে নেয় মন্ত্রণালয়। এবার তৃতীয়বারের মতো অনলাইনে মতামত দেওয়ার জন্য খসড়াটি প্রকাশ করা হলো।
এমআইএস।





