ছাত্রলীগ নেতাদের নিয়ে ভর্তি জালিয়াত চক্র গড়ে তুলেছেন খোদ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক। লাখ লাখ টাকার বিনিময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী ভর্তি করাচ্ছে চক্রটি। রংপুর বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষে ভর্তি ঘিরে এমন একটি জালিয়াত চক্রের সন্ধান মিলেছে।বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষে ব্যবসায় প্রশাসন বিভাগে শামস বিন শাহরিয়ার নামে এক ভর্তিচ্ছু জালিয়াতির মাধ্যমে প্রথম স্থান অধিকার করেন। সাক্ষাৎকারে জালিয়াতির বিষয়টি ধরা পড়লে জিজ্ঞাসাবাদে শামস চক্রটির কথা স্বীকার করেন। জিজ্ঞাসাবাদের ফাঁস হওয়া অডিও ক্লিপ পরিবর্তন ডটকমের হাতে রয়েছে।
জালিয়াতির মাধ্যমে ভর্তির চেষ্টা করা ছয়জনকে ইতিমধ্যে গ্রেফতার করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন জেলহাজতে পাঠিয়েছে। তারা হলেন- ‘সি’ ইউনিটের দ্বিতীয় শিফটের মো. আহসান হাবীব, রোল-৩১২৪২৬, মেধাক্রম ১ম। শাহরিয়ার আল সানি, রোল-৩১২১২৯, মেধাক্রম ২৪তম। ‘এফ’ ইউনিটের চতুর্থ শিফটের মো. রোকসান উজ্জামান, রোল-৬৭০০৯৬। ‘বি’ ইউনিটের দ্বিতীয় শিফটের মো. রিফাত সরকার যত্ন, রোল-২১৪৮৭০, মেধাক্রম ১০ম। ‘বি’ ইউনিটের প্রথম শিফটের সাদ আহমেদ, রোল নম্বর-২১৩৬০৬, মেধাক্রম ২৭তম। ব্যবসায় প্রশাসন বিভাগের শামস বিন শাহরিয়ার, রোল-২৭১০৬৮, মেধাক্রম ১ম স্থান।
ভর্তি জালিয়াতির ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ড. আবু কালাম মো. ফরিদ উল ইসলাম বাদী হয়ে মামলা দায়ের করেছেন। এতে ভর্তিচ্ছু ছয়জন ছাড়াও সঙ্গেহভাজন হিসেবে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক মেহেদী হাসান সজল ও শামসুজ্জোহা হল ছাত্রলীগের কর্মী গোলাম মোস্তফাকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ।
রোববার ব্যবসায় প্রশাসন বিভাগে ভর্তির সাক্ষাৎকার দিতে আসা মেধা তালিকায় প্রথম স্থান অধিকারী শামস বিন শাহরিয়ারের আচরণে শিক্ষকদের সন্দেহ হয়। এক পর্যায়ে জালিয়াতির মাধ্যমে তিনি চান্স পেয়েছেন বলে স্বীকার করেন।
শামসকে জিজ্ঞাসাবাদ করেন গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক তাসনিম হুমাইদা এবং লোকপ্রশাসন বিভাগের প্রভাষক সামান্থা তামরিন। জিজ্ঞাসাবাদের এক পর্যায়ে অভয় দিলে শামস জানান, জালিয়াতির সঙ্গে দুই শিক্ষক জড়িত। একজনের নাম ড. নজরুল ইসলাম। তিনি গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের বিভাগীয় প্রধান।
অন্য শিক্ষকের নাম বলতে পারেননি শামস। তবে ভর্তি পরীক্ষার দিন ওই শিক্ষকের পোশাক এবং তার শারীরিক গড়নের বর্ণনা দিয়েছেন তিনি।
এছাড়া পুলিশ ফাঁড়িতে জিজ্ঞাসাবাদে ওই চক্রের সঙ্গে এক ‘আন্টি’ জড়িত বলেও স্বীকারোক্তি দেন শামস। জিজ্ঞাসাবাদে খুন হওয়ার ভয়ে ‘আন্টি’র নাম বলতে রাজি হননি তিনি। ছাত্রলীগ নেতাদের মাধ্যমে ওই ‘আন্টি’র সঙ্গে তার পরিচয় হয় বলেও জানান এই জালিয়াত ভর্তিচ্ছু।
জিজ্ঞাসাবাদে শামস জালিয়াতির কথা অকপটে স্বীকার করেন। ওই চক্রে একাধিক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকসহ সাতজন জড়িত বলে শামস জানান। তবে খুন হওয়ার ভয়ে শিক্ষকের নাম বলতে রাজি হচ্ছিলেন না তিনি।
পুলিশ ফাঁড়িতে জিজ্ঞাসাবাদে শামসকে বলতে শোনা যায়, ভর্তি চক্রের সঙ্গে সাতজন জড়িত। তবে সবাই শিক্ষক কিনা কিংবা তাদের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো কর্মকর্তা আছে কিনা সেটা তিনি নিশ্চিত করে বলতে পারেননি তিনি।
শামস বলেন, তাকে নির্বিঘ্নে ক্যাম্পাস এলাকা ত্যাগ করতে দিলে জালিয়াত চক্রের বিষয়ে আরও তথ্য দেবেন। এখনই জড়িত শিক্ষকের নাম বললে তাকে ‘মার্ডার (খুন)’ করা হতে পারে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেন এই ভর্তিচ্ছু।
ওই ‘আন্টি’র সঙ্গে তার কিভাবে পরিচয় হয়েছে তা নিয়ে সুস্পষ্ট তথ্য দিতে চাচ্ছিলেন না শামস। ওই ‘আন্টি’র মাধ্যমে জড়িত শিক্ষকের সঙ্গে তার বাবার পরিচয় হয়। আর ‘আন্টি’কে ভর্তির জন্য দুই লাখ টাকা দেন বলেও জিজ্ঞাসাবাদে স্বীকার করেন শামস। বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে ওই ‘আন্টি’র বাসা ঢাকার খামার বাড়িতে।
জিজ্ঞাসাবাদে জালিয়াত চক্রে একাধিক ছাত্রলীগ নেতার থাকার বিষয়টি জানান শামস। তবে প্রাণভয়ে তিনি সুনির্দিষ্ট করে কারও নাম বলেননি। এসব ছাত্রলীগ নেতার সঙ্গে তারা একাধিকবার দেখা ও কথা হয়েছে বলে জিজ্ঞাসাবাদে উঠে আসে।
জিজ্ঞাসাবাদে শামস জানান, পরীক্ষার ওএমআর শিট পরিবর্তন করে ভর্তি জালিয়াতি করা হয়েছে। আর এই কাজটির তত্ত্বাবধান এবং সাক্ষাৎকারে ‘পার করে দেয়ার দায়িত্বে ছিলেন’ অভিযুক্ত ওই শিক্ষক।
এদিকে মোবাইল ফোনে আতিক নামে একজনের সঙ্গেও কথা বলেন শামস। ওই কল রেকর্ডও পাওয়া গেছে। সেখানে টাকা লেনদেনের বিষয়গুলো জানা যায়।
বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের রীতি অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট অনুষদের ডিন ওই অনুষদের ভর্তি সমন্বয়কের দায়িত্ব পালন করেন। সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিন উপাচার্য নাজমুল আহসান কলিমউল্লাহ নিজেই। সাধারণত প্রশ্নপত্র মডারেশন, মুদ্রণ, ওএমার রিডিং ও ফলাফল প্রস্তুত সমন্বয়কের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে করা হয়।
অভিযোগ উঠেছে, এ দায়িত্ব পালন করেছেন উপাচার্যের একক সিদ্ধান্তে ওই অনুষদের সমন্বয়কের দায়িত্বে থাকা অভিযুক্ত শিক্ষক গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের প্রধান ড. নজরুল ইসলাম।
জানতে চাইলে অভিযুক্ত শিক্ষক ড. নজরুল ইসলাম বলেন, ‘আমাকে নিয়ে যে কথা হচ্ছে তা আমার বিরুদ্ধে একটি ষড়যন্ত্র। এঘটনার সঙ্গে কোনোভাবেই আমি জড়িত নই। আমার সম্মান ক্ষুন্ন করার জন্যই একটি পক্ষ ষড়যন্ত্র করছে।’
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘লোকপ্রশাসন বিভাগের প্রভাষক সামান্থা তামরিন একটি অডিও প্রকাশ করেছেন। তিনি ওই ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থীকে জিজ্ঞাসাবাদের সময় ছিলেন। তখন তিনি অডিও রেকর্ডটি করেন।’
ড. নজরুল ইসলাম আরও বলেন, ‘তিনি (সামান্থা তামরিন) আমাকে হেয় করার জন্য এটা প্রকাশ করেন। আমি বিষয়টি লিখিতভাবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে জানাব। যে শিক্ষক এ অডিও রেকর্ডটি করেছেন তিনিও শাস্তির আওতায় আসবেন।’
এ বিষয়ে সামান্থা তামরিন বলেন, ‘আমার যা বলার আমি প্রশাসনকে জানিয়েছি। এখন ব্যবস্থা নেয়ার দায়িত্ব প্রশাসনের। আমার আর কিছু বলার নেই।’
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ও মামলার বাদী ড. আবু কালাম মো. ফরিদ উল ইসলাম বলেন, ‘সাতজনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাত কয়েক জনের বিরুদ্ধে আমরা মামলা করেছি। যারা গ্রেফতার হয়েছেন তারা পুলিশ কাস্টডিতে আছেন। বিষয়টি এখন পুলিশ প্রশাসন দেখবে।’
এই ভর্তি জালিয়াতির সঙ্গে অনেকেই জড়িত আছেন বলেও মনে করছেন তিনি।
বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সভাপতি তুহিন ওয়াদুদ বলেন, ‘যারা এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হওয়া দরকার।’
শিক্ষকদের নীল দলের সাধারণ সম্পাদক আপেল মাহমুদ বলেন, ‘শিক্ষকরা প্রশ্নপত্র ফাঁসের সঙ্গে জড়িত- এটা আমাদের জন্য লজ্জাজনক। ঘটনার পর বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন একটি তদন্ত কমিটিও গঠন করেনি।’
তিনি বলেন, ‘যে শিক্ষকের নাম আসছে তিনি ছাত্র বিষয়ক পরিচালকও। তাকে দায়িত্ব থেকেও অব্যাহতি দেয়া হয়নি, এখন পর্যন্ত কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। আমরা বিষয়টি শিক্ষা মন্ত্রণালয়সহ সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ে জানাব।’
যারা এই ভর্তি জালিয়াতির সঙ্গে জড়িত তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে জানুয়ারিতে আন্দোলনে নামারও ইঙ্গিত দেন এই শিক্ষক নেতা।
এ বিষয়ে বক্তব্য নেয়ার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য নাজমুল আহসান কলিমউল্লাহর মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল দিয়ে তা বন্ধ পাওয়া যায়। এসএমএস করেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।





