প্রাচ্যের অক্সফোর্ডখ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) ৪৩ শতাংশ ছাত্রী আবাসন সংকটের কারণে চরম দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের সাড়ে ১৪ হাজার ছাত্রীর বিপরীতে আবাসন সুবিধা পেয়েছেন আট হাজার ২১ জন। অর্ধেকের মতো ছাত্রীই হলের বাইরে অবস্থান করতে বাধ্য হচ্ছেন।
অধিক ব্যয়ে রাজধানীর বিভিন্ন মেসে মানবেতর জীবনযাপনের পাশাপাশি নিরাপত্তাহীনতায়ও ভুগছেন তারা। সরকারের নানামুখী উদ্যোগে উচ্চশিক্ষায় নরীদের অংশগ্রহণ বাড়লেও উন্নত হচ্ছে না ছাত্রীদের আবাসন ব্যবস্থা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী স্বপ্না আক্তারের ঢাকায় কোনো নিকটাত্মীয় নেই। ফলে হলে সিট না পাওয়ায় ধানমণ্ডির একটি বেসরকারি হোস্টেলে থাকতে হয় তাকে। এখানে প্রতি মাসে থাকা-খাওয়ার জন্য খরচ দিতে হয় সাত হাজার টাকা। অনেক সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের বাস না পেলে রিকশায় যাতায়াত করতে হয়। রিকশায় যাতায়াত করতে হলে দিনে অতিরিক্ত দেড়শ' টাকার মতো খরচ হয়ে যায়। অন্যান্য খরচ তো আছেই। স্বপ্না বলেন, 'বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে থাকলে অনেক খরচ হয়। নিরাপত্তার অভাব তো আছেই।'
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বশেষ বার্ষিক বিবরণী থেকে জানা যায়, মোট শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৩৭ হাজারের বেশি। এর মধ্যে ৩৮ শতাংশ অর্থাৎ ১৪ হাজারের বেশি ছাত্রী এ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে মোট আবাসিক হল আছে ২২টি। এর মধ্যে মেয়েদের আবাসিক হলের সংখ্যা ছয়টি। বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাব অনুযায়ী রোকেয়া হলে এক হাজার ৬০০ জন, শামসুন্নাহার হলে এক হাজার ৩৫০ জন, কুয়েত মৈত্রী হলে দুই হাজার ৬১ জন, বঙ্গমাতা ফজিলাতুন্নেছা মুজিব হলে এক হাজার ১৫০ জন, কবি সুফিয়া কামাল হলে এক হাজার ৭০০ জন এবং নবাব ফয়জুন্নেসা চৌধুরানী ছাত্রী নিবাসে ১৬০ জন শিক্ষার্থী আবাসিক সুবিধা পাচ্ছেন। এই সব কয়টি হলেই ধারণ ক্ষমতার অতিরিক্ত ছাত্রী বসবাস করছেন।
হলের বাসিন্দা ছাত্রীরা জানান, হলগুলোতে আসন সংখ্যা কম থাকায় বেশিরভাগ হলেই গণরুমে ছাত্রীদের ডাবলিং অর্থাৎ অন্যের সঙ্গে বিছানা ভাগাভাগি করে থাকতে হয়। আর পড়াশোনা করতে হয় রিডিং রুম বা অতিথি রুমে। জানা যায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের রোকেয়া হলে দুটি, কুয়েত মৈত্রী হলে চারটি এবং ফজিলাতুন্নেছা মুজিব হলে তিনটি গণরুম রয়েছে। এসব রুমে আটজনের বিপরীতে থাকছেন অন্তত ২০ থেকে ৩০ জন।
ছাত্রীদের অভিযোগ, হল প্রশাসনের তদারকির অভাবের কারণে হলের সিট বণ্টনে নানা বৈষম্যের শিকার হতে হয় তাদের। অনেক হলে ক্ষমতাসীন ছাত্র সংগঠনের নেত্রীরা সিট নিয়ে নানা বাণিজ্য করছেন। নগদ অর্থ লেনদেনের বড় ধরনের কোনো অভিযোগ না থাকলেও হলের গণরুমে আসন দেওয়ার বিপরীতে রাজনৈতিক সংগঠনের কর্মী বানানোর অভিযোগ আছে বিস্তর। নাম না প্রকাশ করার শর্তে শামসুন্নাহার হলের এক ছাত্রী বলেন, গণরুমে ক্ষমতাসীন দলের নেত্রীদের ছত্রছায়ায় অনেক মেয়েকেই ওঠানো হয়। এদের প্রত্যেকের কাছ থেকেই এককালীন সিট বাবদ দুই হাজার টাকা করে নিয়ে থাকেন নেত্রীরা। তবে টাকা দিলেই সব চুকে যায় না, এদের প্রত্যেককেই দলের মিছিল-মিটিংয়ে যেতে হয়। আর না গেলে নেত্রীদের দ্বারা বিভিন্ন নির্যাতনের শিকার হতে হয়।
এ নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শামসুন্নাহার হল শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি নিশীতা ইকবাল নদীকে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি এ ধরনের কোনো ঘটনা সম্পর্কে অবগত নন বলে দাবি করেন। এমন কিছু হয়ে থাকলেও ব্যক্তিগত এসবে তার কোনো সম্পৃক্ততা নেই। তিনি বলেন, 'গণরুমে হল কর্তৃপক্ষই অতিথি হিসেবে ছাত্রীদের রাখেন। কর্তৃপক্ষই অতিথি ছাত্রীদের কাছ থেকে দুই থেকে তিন মাস পর পর সাতশ' টাকা করে চার্জ নিয়ে থাকে বলে জানি।
নিশীতা ইকবাল নদী এসবের কিছু জানেন না বলে দাবি করলেও তার বিরুদ্ধে সিটবাণিজ্যের নামে ছাত্রীদের লাঞ্ছিত করার অনেক অভিযোগ রয়েছে। তবে লাঞ্ছনার শিকার ছাত্রীদের মধ্যে ২০১৫ সালের জানুয়ারি মাসে শামসুন্নাহার হলের আবাসিক ছাত্রী ইসরাত জাহান সোনালী ছাড়া আর কেউই এ নিয়ে প্রকাশ্যে কিছু বলতে সাহস করেননি। সমকালের সঙ্গে আলাপে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের ছাপচিত্র বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী সোনালীর অভিযোগ, নদীর হয়ে ইয়াবা বাহকের কাজ করতে অস্বীকৃতি জানানোয় মারধর করে তার (সোনালীর) হাত পর্যন্ত ভেঙে দেওয়া হয়। ওই ঘটনার বিচার চেয়ে হল প্রশাসন, প্রক্টর ও উপাচার্যের কাছে আবেদন করেও কোনো বিচার পাননি তিনি। ওই ঘটনায় উল্টো সোনালীকেই হল থেকে বের করে দেওয়া হয়। তিনি বলেন, 'এক বছর হয়ে গেল, এখনও হলে উঠতে পারিনি। উত্তরা থেকে এসে নিয়মিত ক্লাস করতে সমস্যা হচ্ছে।' সোনালীর অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাওয়া হলে নদী বলেন, 'সোনালীর যত অভিযোগ সবই ভিত্তিহীন। সে আমার বিরুদ্ধে একের পর এক মিথ্যা অভিযোগ করে যাচ্ছে। এ নিয়ে আমি তো বটেই, আমার পরিবারও ভিকটিম হচ্ছে।'
কুয়েত মৈত্রী হলের আবাসিক ছাত্রী ছন্দা আক্তার (ছদ্মনাম) রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে সিট পাওয়ার কথা অকপটে স্বীকার করেছেন। ছন্দা জানান, ছাত্রলীগের রাজনীতি করার শর্তে নেত্রীরাই তাকে হলে উঠিয়েছেন। হলে মোট চারটি গণরুম রয়েছে। প্রতিটি রুমেই ১৫ থেকে ২০ জন ছাত্রী থাকেন। রুমের চারটি খাটে ঘুমান আটজন। বাকিদের ঘুমাতে হয় ফ্লোরে। এ ছাড়াও রুমে রয়েছে দোতলা খাট (ছাত্রীদের কাছে যা ডাবল ডেকার নামে পরিচিত)। প্রতিটি দোতলা খাটে চারজন করে ছাত্রী ঘুমান। তবে অন্যান্য রুমের মতো এ রুমগুলোতে পড়ার জন্য বাড়তি সুযোগ-সুবিধা নেই। নেই জামা-কাপড় রাখার ব্যবস্থা। গণরুমে ভালোভাবে থাকার জায়গা না থাকলেও রয়েছে রাজনৈতিক নির্যাতন।
ফজিলাতুন্নেছা হলের সাবরিনা ইয়াসমিন চন্দনা বলেন, 'আবাসন সংকটের পাশাপাশি টয়লেট-বাথরুম সমস্যাও প্রকট। টয়লেটের পাইপ দিয়ে প্রায়ই দুর্গন্ধ ছড়ায়। এ ছাড়া ছাত্রলীগ নেত্রীরা টিভি রুম দখল করে হিন্দি সিনেমা ও গান দেখেন। এ সময় ছাত্রীদের খবর দেখারও সুযোগ দেওয়া হয় না।'
এমফিল এবং পিএইচডি ডিগ্রির ছাত্রীদের জন্য নবাব ফয়জুন্নেসা চৌধুরী ছাত্রীনিবাস যাত্রা শুরু করে ১৯৯৪ সালে। এ হোস্টেলে ছাত্রীদের থাকা বাবদ মাসিক ভাড়া ১২ থেকে ১৫ টাকা।
শামসুন্নাহার হলের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক আবাসিক শিক্ষক বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে মফস্বলের ছেলেমেয়েরা পড়তে আসে। ঢাকার ছেলেমেয়েরা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছে অথবা ঢাকায় তাদের বাসা আছে। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে বিপাকে পড়ছে মফস্বল থেকে আসা ছেলেমেয়েরা, বিশেষ করে মেয়েরা। তাদের আবাসনের ব্যবস্থা করা জরুরি। তবে এই মেয়েদের বাদ দিয়ে রাজনৈতিক বিবেচনায় হল কর্তৃপক্ষ মেয়েদের হলে তুলতে বাধ্য হচ্ছে। এদের ক্ষেত্রে মেধা বা প্রয়োজন কোনোটাই বিবেচনা করা হচ্ছে না।
কবি সুফিয়া কামাল হলের জ্যেষ্ঠ আবাসিক শিক্ষক শামীম বানু বলেন, 'বর্তমানে এ হলে এক হাজার ৭০০ আবাসিক ছাত্রী রয়েছে। অপেক্ষমাণ রয়েছে আরও ৩০০ জন। এ ছাড়া চারজনের রুমে ডাবলিং করে আটজন মেয়ে থাকছে। তারপরও আবাসন সংকটে রয়েছে ছাত্রীরা। এটা আমাদের জন্য অনেক কষ্টের। কারণ মেয়েদের নিরাপত্তা নশ্চিত করতে পারছি না।'
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক ছাত্রীদের আবাসন সংকট সম্পর্কে বলেন, 'আবাসন সংকট আছে এবং খুব দ্রুত এই সংকট নিরসন সম্ভব নয়। সংকট নিরসনের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এরই মধ্যে কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। এসব উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ বাস্তবায়ন হলে আবাসন সংকট নিরসন হবে।' এর মধ্যে কবি সুফিয়া কামাল হল চালু হয়েছে। পাশাপাশি আবাসন সমস্যা নিরসনে বেগম রোকেয়া হলের ভেতরে '৭ মার্চ' নামে স্বতন্ত্র আরেকটি ভবনের কাজ চলছে। এ ভবনের কাজ শেষ হলে বর্তমানের চেয়ে দ্বিগুণ ছাত্রী সিট পাবে বলে তিনি জানান।
এসএ





