বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে (বেরোবি) শিক্ষক সংকট ও স্বার্থের দ্বন্দ্বে বাড়ছে সেশনজট। দুই গ্রুপে বিভক্ত হয়ে পড়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা। অধিকাংশ বিভাগে দুই দলের শিক্ষক থাকায় তাদের মাঝে সমন্বয়হীনতার সৃষ্টি হয়েছে। শিক্ষক সংকট আর শিক্ষকদের এমন দলাদলির কারণে বাড়ছে সেশনজট।

বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, শিক্ষক সংকট আর স্বার্থের দ্বন্দ্বের কারণে মাত্রাতিরিক্ত সেশনজটে ভূগছে শিক্ষার্থীরা। পাঁচ বছরের শিক্ষাজীবন ৮-৯ বছরেও শেষ করতে পারছেন না। এতে অনেকের সরকারি চাকরির বয়সসীমা শেষ হবার উপক্রম হয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস, ইংরেজি, বাংলা, ভূগোল ও পরিবেশ বিজ্ঞান, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা, পদার্থ বিজ্ঞান, রসায়ন বিজ্ঞান, গণিত বিভাগসহ বেশ কয়েকটি বিভাগে দুই থেকে তিন বছরের সেশনজট রয়েছে।

এদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় প্রগতিশীল শিক্ষক সমাজ ও আওয়ামীপন্থি শিক্ষকদের সংগঠন নীল দল নামে শিক্ষকদের দুইটি সংগঠন রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৫২ জন শিক্ষকের প্রায় প্রত্যেকেই প্রকাশ্যে বা অপ্রকাশ্যে এ সংগঠন দুটির সঙ্গে জড়িত।

বর্তমান উপাচার্য অধ্যাপক ড. নাজমুল আহসান কলিমউল্লাহ’র অনুসারি ‘প্রগতিশীল শিক্ষক সমাজ’ এবং ক্যাম্পাসের ভিসি বিরোধী দল ‘নীলদল’ পরিচিত। অভিযোগ উঠেছে নতুন উপাচার্য দায়িত্ব নেওয়ার পর বিভিন্ন দায়িত্বে থাকা নীলদলের শিক্ষকদের ধীরে ধীরে সরানো শুরু হয় এবং প্রগতিশীল শিক্ষক সমাজের নেতারা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন প্রশাসনিক পদে দায়িত্বে পেতে থাকেন। তখন দ্ব›দ্ব আরও বাড়তে থাকে। ভিসি এই দলকে প্রত্যেক্ষ ভাবে সাপোর্ট করার কারনে স্বার্থের জন্য অনেকে প্রগতিশীল শিক্ষক সমাজে যোগদান করেন।

শিক্ষক সংকট এবং এই দুই গ্রুপের দলাদলির কারণে শিক্ষার্থীদের পোহাতে হচ্ছে সেশনজটের মত ভয়ানক অবস্থা।

ইংরেজি বিভাগের ২০১১-১২ সেশনের শিক্ষার্থী রক্তিম মিলন মনে করেন, ‘মূলত শিক্ষকদের অভ্যন্তরীণ টানাপড়নই সেশনজটের মূল কারণ। সেশনজটের দায় শিক্ষকদের হলেও এর ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে শিক্ষার্থী ও তাদের পরিবারকে।’

বেরোবি ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক নোবেল শেখ বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ে সেশনজটের মূল কারণ শিক্ষক সংকট। কিন্তু কয়েকটি বিভাগে শিক্ষক সংকট থাকা সত্ত্বেও শিক্ষকদের আন্তরিকতার কারণে সেশনজট একেবারেই নেই। একইভাবে যদি প্রতিটি বিভাগের শিক্ষকরা আন্তরিকভাবে চেষ্টা করেন তাহলে সেশনজট কমানো সম্ভব।’

এ বিষয়ে বেরোবি ছাত্রলীগের সভাপতি তুষার কিবরিয়া বলেন, ‘আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা খুব বেশি রাজনীতি সচেতন। তারা একাডেমিক বিষয়ে যতটা গুরুত্ব দেন তার চাইতে বেশি গুরুত্ব দেন রাজনীতিকে। শিক্ষক সংকট তো আছেই তারপরও যারা আছেন তাদের আন্তরিকতা থাকলে সেশনজটের এই ভয়াবহতা থাকত না।’

একাধিক শিক্ষক মনে করেন, ‘বর্তমান উপাচার্যের অনুসারি দল মূলত উপাচার্যের উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন করছে এবং ক্ষমতা ভোগ করতে শুরু করেছেন কয়েকজন শিক্ষক। একটি পক্ষ আগে সুবিধা ভোগ করেছে, এখন আরেক পক্ষ চেষ্টা করছে।

এভাবে চলতে থাকলে ধীরে ধীরে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রমের ওপর বড় ধরনের প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতির সভাপতি গাজী মাজহারুল আনোয়ার বলেন, ‘শিক্ষকদের অভ্যন্তরীণ সম্পর্কের টানাপড়নের কারণে শিক্ষার্থীদের ক্লাস পরীক্ষার ওপর কোনো প্রভাব পড়ে বলে আমি মনে করি না। মূলত শিক্ষকদের ওপর অতিরিক্ত চাপের কারণেই সেশনজট তৈরি হয়। তবে পর্যাপ্ত পরিমাণ শিক্ষক থাকলে খুব তাড়াতাড়ি সেশনজট দূর করা সম্ভব’।

এ ব্যাপারে উপাচার্য ড. নাজমুল আহসান কলিমউল্লাহ বলেন, ‘সেশনজট কমানোর জন্য আমরা নানামুখী পদক্ষেপ নিয়েছি। ছয় মাসের মধ্যে যাতে একটি করে সেমিস্টার শেষ করা যায়, সে ব্যাপারে উদ্যোগ নিয়েছি।

শিক্ষকদের দলাদলির কারণে সেশনজট কিনা জানতে চাইলে উপাচার্য বলেন, ‘বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকদের রাজনীতি আছে, অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে নেই। এ রকম ভাববার কোনো সুযোগ নেই। সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকদের একাধিক দল আছে। সব শিক্ষকদের বিভিন্ন বিষয়ে একমত হতে হবে এমন কোনো কথা নেই। একটি বিষয় নানা পদ্ধতিতে, নানা দৃষ্টিকোণ থেকে দেখার সুযোগ রয়েছে।’

ইভান/জেড