অনৈতিকভাবে পদ সৃষ্টি করে আওয়ামী লীগ নেতাদের নিয়োগের দাবিতে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যায়ের ভিসি প্রফেসর মোহাম্মাদ মিজানউদ্দিনকে হুমকি এবং বিজ্ঞান অনুষদের ডীন হাবিবুর রহমানকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করেছে রাজশাহী মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ডাবলু সরকার।
এসময় সংগঠনটির নেতাকর্মীরা প্রশাসনের উর্ধ্বতন কর্মকতাদেরকেও লাঞ্ছিত করেছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
বৃহস্পতিবার দুপুর ১টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয় ভিসির কার্যালয়ে এ ঘটনা ঘটে। এদিকে এ ঘটনায় তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের সংগঠন।
একই দাবিতে গত বুধবার দুপুরে রাজশাহী-১ আসনের সংসদ সদস্য ওমর ফারুক চৌধুরী ভিসির দপ্তরে এসে ভিসিকে দেখে নেওয়ার হুমকি দেন। এর আগে গত মার্চ মাসের মাঝের দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ে অনৈতিক নিয়োগের দাবিতে রাবি ভিসিকে হুমকি দিয়ে শাসিয়ে যান মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ডাবলু সরকার। এঘটনায় ক্যাম্পাসে আলোচনার ঝড় উঠলেও ডাবলু সরকারের বিরুদ্ধে কোনো ব্যাবস্থা নেয়নি কর্তৃপক্ষ।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, বৃহস্পতিবার দুপুর পৌনে ১টার দিকে মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ডাবলু সরকার ও সহসভাপতি শাহাদাত হোসেন, স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি জেডু সরকার, আওয়ামী লীগ নেতা লোটন সরকারসহ ১৫-১৬ জন আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী কোনো পূর্বানুমতি ছাড়াই ভিসির দফতরে প্রবেশ করেন। তারা দীর্ঘদিন বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়োগ না দেয়ায় ক্ষোভ জানিয়ে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের দ্রুত কর্মকর্তা ও কর্মচারী পদে নিয়োগ দেয়ার দাবি জানান।
এসময় ভিসি দফতরে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো-ভিসি প্রফেসর চৌধুরী সারওয়ার জাহান, শিক্ষক সমিতির সভাপতি আনন্দ কুমার সাহা, বিভিন্ন অনুষদের ডীন, হল প্রাধ্যক্ষসহ বেশ কয়েকজন শিক্ষক উপস্থিত ছিলেন। আওয়ামী লীগ নেতারা বিশ্ববিদ্যালয়ে কবে কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগ দেয়া হবে সে বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে জানাতে চাইলে ভিসি তাদের বলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধি ও প্রক্রিয়া মেনে নিয়োগ দেয়া হবে। অনৈতিকভাবে আমরা কোনো কিছুই করতে পারবো না।
এ নিয়ে কথা বলার একপর্যায়ে আওয়ামী লীগ নেতারা দ্রুত আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের নিয়োগ দেয়ার কথা বলে উচ্চস্বরে কথা বলতে শুরু করেন। এসময় নগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ডাবলু সরকারসহ নেতারা উপাচার্যসহ শিক্ষকদের গালিগালাজ করেন। এতে দফতরে উত্তেজনার সৃষ্টি হয়।
এক পর্যায়ে বিজ্ঞান অনুষদের ডিন প্রফেসর হাবিবুর রহমান নগর আওয়ামী লীগের সহসভাপতি শাহাদাত হোসেনকে হাত ধরে শান্ত হতে বললে আওয়ামী লীগ নেতারা শিক্ষকদের মারতে তেড়ে আসেন।
এসময় বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র উপদেষ্টা প্রফেসর ছাদেকুল আরেফিন মাতিন ও বিজ্ঞান অনুষদের ডিন প্রফেসর হাবিবুর রহমানকে ধাক্কা দেন আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা। এছাড়াও ঘটনাস্থ আরও বেশ কয়েক জন শিক্ষককে লাঞ্ছিত করে সংগঠনটির নেতাকর্মীরা। এমন পরিস্থিতিতে উপাচার্য আওয়ামী লীগ নেতাদের সঙ্গে কোনো কথা বলবেন না বললে আওয়ামী লীগ নেতারা বের হয়ে যান।
এ ব্যাপারে মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ডাবলু সরকার বলেন, ‘শিবিরের হাতে নিহত ছাত্রলীগ কর্মী ফারুকের বোনের চাকরি স্থায়ী করা, আহত ছাত্রলীগ নেতা মাসুদের পরীক্ষার ব্যবস্থা করাসহ আমাদের কিছু দাবি নিয়ে উপাচার্যের সঙ্গে কথা বলতে গিয়েছিলাম। কিন্তু উপাচার্য বলেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের বিষয় নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরের কারো সঙ্গে কথা বলবেন না। এসময় নেতারা উঠে আসতে গেলে আমাদের সহসভাপতিকে এক শিক্ষক হাত ধরে টান দেন। এতে নেতাকর্মীরা ক্ষিপ্ত হলে কিছুটা উত্তেজনা হয়েছিল।
বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংযোগ দপ্তরের প্রশাসক অধ্যাপক ইলিয়াছ হোসেন বলেন, ‘আওয়ামী লীগ নেতারা কোনো এপয়েন্টমেন্ট ছাড়াই আজ (বৃহস্পতিবার) দুপুরে উপাচার্যের চেম্বারে প্রবেশ করেন। তারা আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীদের যেভাবেই হোক চাকরি দেয়ার কথা বলেন। এসব নিয়ে কথা বলার এক পর্যায়ে আওয়ামী লীগ নেতারা শিক্ষকদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেন। একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের দফতরে এভাবে যখন-তখন পদের কথা বলে নেতাকর্মীদের প্রবেশ করে যা ইচ্ছে বলে যাবেন এটা বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য সম্মানহানি বলে জানান তিনি।
বিশ্ববিদ্যাললেয় শিক্ষক সমিতির সভাপতি প্রফেসর আনন্দ কুমার সাহা বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় ভিসিসহ প্রশাসনের উর্দ্ধতন কর্মকতাদের যে দুর্ব্যবহার করা হয়েছে এ ঘটনা খুবই হতাশাজনক। এঘটনার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছি। এ বিষয়ে সন্ধ্যায় শিক্ষক সমিতির মিটিং আছে। সেখানে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।
বিশ্ববিদ্যালয় জাতীয়তাবাদী শিক্ষক ফোরামের সভাপতি প্রফেসর ড. কে বি এম মাহাবুবুর রহমান বলেন, বিশ্ববিদ্যালের মতো একটি সায়ত্ত্বশাসিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আওয়ামী লীগ নেতাদের এমন হস্তক্ষেপ মেনে নেওয়া যায় না। এ ঘটনায় আমরা খুবই লজ্জিত। বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়োগ প্রক্রিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধি অনুযায়ী চলে। তারা নিয়োগ দেওয়ার কে?
এ বিষয়ে রাবি ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি ও প্রগতিশীল ছাত্রজোটের সমন্বয়ক আয়াতুল্লাহ খমেনী বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ সম্মানের ব্যাক্তি। তাকে অপমান করা মানে গোটা বিশ্ববিদ্যালয়কে অপমান করা। এটা খুবি ন্যাক্কার জনক ঘটনা। এ ঘটনার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছি। আমরা খুব দ্রুতই এ বিষয়ে কর্মসূচি দিব।
কেএইচ





