বাংলা পঞ্জিকা হিসাবে চৈত্র মাসের বাজছে বিদায় ঘণ্টা। আসছে নয়া মাস বৈশাখ। বৈশাখ শুধু একটি নতুন মাসই নয়, এর মাঝেই লুকিয়ে আছে নতুন বাংলা বছরের আগমনী বার্তা। বিদায় নিচ্ছে বাঙালি জীবন থেকে আরো একটি বছর ১৪২১ বঙ্গাব্দ, আর হাজির হচ্ছে নতুন সৃষ্টির প্রত্যয় নিয়ে নানা স্বপ্ন ভরা বঙ্গাব্দ ১৪২২। সে সূত্রে বাংলা বর্ষপঞ্জির নতুন মাসের প্রথম তারিখ পয়লা বৈশাখ নিয়ে বাঙালীর রয়েছে অন্তহীন আনন্দ-উচ্ছ্বাস ও উদযাপনের ইতিহাস। বর্ষবরণের মাধ্যমে বাঙালী হয়ে ওঠার এক অনন্য দিন।

বাঙালীর এই নববর্ষ বরণ করার জন্য আগ্রহের শেষ নেই রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় (রাবি) শিক্ষার্থীদের। বিপুল উৎসহ-উদ্দীপনা ও নানা কর্মসূচির মধ্যে দিয়ে পালন করবে দিনটি।

অতীত জীর্ণতাকে ভুলে নতুন সৃষ্টির প্রত্যয় নিয়ে এবারো রাবির বিভিন্ন বিভাগ এবং বিভিন্ন সামাজিক সাংস্কৃতিক ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের উদ্যোগে আয়োজন করা হচ্ছে নানা অনুষ্ঠানের। বাঙালি সংস্কৃতিকে ফুটিয়ে তুলতে এবং জাতির প্রাণের এ উৎসবে মেতে উঠাতে হাজারো শিক্ষার্থী দিনটির জন্য মুখিয়ে আছে।

বিভিন্ন বিভাগ ও সংগঠনের পৃথক বর্ষবরণের অনুষ্ঠানের জন্য স্থান নির্ধারণ সম্পন্ন হয়েছে। শেষের দিকে বর্ষবরণের সকল প্রকার প্রস্তুতি। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের জন্য রিহার্সেলও প্রায় শেষের দিকে। বর্ষবরণ উপলক্ষে শিক্ষার্থীদের মাঝে বিরাজ করছে উৎসবের আমেজ। ক্যাম্পাসের বিভিন্ন মোড়ে আঁকা হয়েছে আল্পনা। যেন চিরচেনা সবুজ মতিহার বৈশাখকে বরণ করতে সবকিছুই পাল্টে গেছে।

প্রতি বছরের ন্যায় এবারো বর্ষবরণের মূল আয়োজন থাকছে চারুকলা বিভাগকে কেন্দ্র করে। বিভাগটি দুই দিনব্যাপী কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। পহেলা বৈশাখ সকাল ৯টায় “এসো হে বৈশাখ, এসো বাংলার আকাশে নববর্ষের বার্তা নিয়ে” উদ্বোধনী সঙ্গীতের মাধ্যমে কর্মসূচি শুরু হবে। সকাল সাড়ে ৯টায় চারুকলা বিভাগের সামনে থেকে শুরু হবে রাজশাহী অঞ্চলের সবচেয়ে বড় মঙ্গল শোভাযাত্রা। বিকেলে যন্ত্রসঙ্গীত, আবৃত্তি-সুন্দরম, শিক্ষার্থীদের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও নৃত্যানুষ্ঠান। এছাড়া পরের দিন সকাল ১১টা থেকে আলাকাপ, বাউল গান, আবৃত্তি, গাম্ভীরা। এছাড়া বিকেল ৫ টায় যাত্রাপালা পানি পথের যুদ্ধ ইত্যাদি। প্রতি বছরের ন্যায় এবারও চারুকলা বিভাগের উদ্যোগে পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে চারুকলা মাঠে দুইদিন ব্যাপী বৈশাখী মেলার আয়োজন করা হয়েছে।

মঙ্গল শোভাযাত্রায় বাঙালির ঐতিহ্য, কৃষ্টি-কালচার তুলে ধরতে তৈরি করা হয়েছে প্রধান ২টি মোটিফ ‘লোকেজো ঘোড়া ও দোয়েল’। আর সাথে থাকছে অশুভ শক্তি দূর কারার প্রত্যয় নিয়ে বিভিন্ন ধরনের মুখোশ।

এ ব্যাপারে চারুকলা ২য় বর্ষের শিক্ষার্থী আরিফুল ইসলাম বলেন, ‘বর্ষবরণ উপলক্ষে চারুকলা বিভাগের শিক্ষার্থীদের মধ্যে এক ধরনের বাড়তি অনুভূতি কাজ করে। আমাদের বিভিন্ন অনুষ্ঠানের মাধ্যেমে বাঙালীর কৃষ্টি কালচার জাতির সামনে তুলে ধরতে চাই’।

চারুকলা বিভাগের শিক্ষক ও পহেলা বৈশাখ ১৪২২ উদযাপন কমিটির আহ্বায়ক প্রফেসর ড. বিলকিস বেগম বলেন, ‘বর্ষবরণের সকল প্রস্তুতি প্রায় সম্পূন্ন। আশা করছি আমরা বিশ্ববিদ্যালয় তথা রাজশাহীর সকল মানুষকে সুন্দর একটি অনুষ্ঠান উপহার দিতে পারব’।

তিনি আরো বলেন, ‘নববর্ষের অনুষ্ঠানের মধ্যে দিয়ে সকল শ্রেনী-পেশার মানুষ এক সাথে মিলিত হওয়ার সুযোগ থাকে। আর এর মধ্যে অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন বাস্তবায়িত হবে’।

এছাড়া বাংলা, হিসাব বিজ্ঞান ও তথ্য ব্যবস্থা, দর্শন, নাট্যকলা ও সঙ্গীত, ভূ-তত্ব ও খনি বিদ্যা, বাংলা, ইসলামের ইতিহাস, মার্কেটিং, নৃ-বিজ্ঞান, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, ভূগোল ও পরিবেশবিদ্যা, লোক প্রশাসনসহ বিভিন্ন বিভাগের পক্ষ থেকে বর্ষবরণের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। অনুষ্ঠানের মধ্যে মঙ্গল শোভাযাত্রা, বাঙালী ঐতিহ্যবাহী খাবার পান্তা-ইলিশ ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।

এ উপলক্ষে বিশ্ববিদ্যালয়ের সেচ্ছাসেবী ও সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো মঙ্গল শোভাযাত্রা অংশগ্রহণ ও প্রদর্শনীমূলক বিভিন্ন স্টল দিবে।

তবে এবারের বর্ষবরণের উৎসবে দেশের সার্বিক পরিস্থিতির কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে রয়েছে এক ধরণের আতঙ্ক। যার ফলে অন্য যে কোন বৈশাখের চেয়ে ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি অনেক কম থাকবে বলে মনে করছে অনেকে। তবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও পুলিশ প্রশাসন বলছে সাধারণ শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার স্বার্থে সর্বোচ্চ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

রাবি ছাত্র উপদেষ্টা প্রফেসর ড. সাদেকুল আরেফিন মাতিন বলেন, ‘পহেলা বৈশাখে আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর অবস্থানে থাকার জন্য বলা হয়েছে। পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার স্বার্থে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্ট্রলবডীর সদস্যরা সর্বদা ক্যাম্পাসের করবে’।

মতিহার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুর রউফ বলেন, ‘পহেলা বৈশাখা ক্যম্পাসে কোন ধরনের নাশকতা সৃষ্টি না হয়, সে দিকে খেয়াল রেখে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী সর্বোচ্চ ব্যবস্থা গ্রহণ করবে’।

জেডআই