ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম বিকৃতি নিয়ে বিভ্রান্তিতে পাড়েছে নবীন শিক্ষার্থীরা। খোদ প্রশাসনকেও বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম বিকৃতি করতে দেখা গেছে। এছাড়া দেশের নামী দামি বিভিন্ন ইলেক্ট্রনিক্স এবং প্রিন্ট মিডিয়াতেও নিয়মিত ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম বিকৃতি করতে দেখা যায়। ভিসি প্রফেসর ড. হারুন-উর-রশিদ আসকারীর অংশগ্রহণে সরাসরি প্রচারিত টিভি অনুষ্ঠানেও বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম হিসেবে ‘কুষ্টিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়’ ব্যবহার করতে দেখা গেছে।

ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের এ্যাক্ট অনুযায়ী বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম হবে ‘ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়’। নামের বিষয়টি এ্যাক্টের তিন নং ধারার এক নং অনুচ্ছেদে স্পষ্ট করা হয়েছে। এ্যাক্টে বলা হয়েছে, ‘এই আইনের বিধান অনুযায়ী একটি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপিত হইবে, যাহা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় নামে অভিহিত হইবে।’

‘কুষ্টিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়’, ‘কুষ্টিয়ার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়’, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় কুষ্টিয়া-ঝিনাইদহ’, ‘ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ’ এরকম আরো বেশ কিছু নাম। যার যেমন খুশি ব্যবহার করতে দেখা যায়। এতে বিশ্ববিদ্যালয়ের নামটা আসলে কি তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে নবাগত শিক্ষার্থীদের মাঝে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের গাড়িতেও নামের বিকৃত রুপ ব্যবহার করতে দেখা গেছে। সরেজমিন পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, ক্যাম্পাস টু কুষ্টিয়া শহর রুটে চলাচল করা দ্বিতল বাসের (ঢাকা মেট্রো-ব ১১-৬০৭৭) গায়ে লেখা হয়েছে ‘কুষ্টিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীদের পরিবহনের জন্য’। বাসটি প্রতিনিয়ত ক্যাম্পাসে যাতায়াত করলেও নাম বিকৃতির বিষয়টি আজ পর্যন্ত প্রশাসনের কোন কর্তা ব্যক্তির নজরে আসতে দেখা যায়নি।

দেশের বেশ কিছু নামী-দামী জাতীয় দৈনিক এবং টেলিভিশনেও ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম বিকৃতির বিষয়টি লক্ষ করা যাচ্ছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই নাম হিসেবে ‘কুষ্টিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়’ বাক্যটি ব্যবহার করে থাকেন দৈনিক সংবাদপত্র এবং টেলিভিশনের সম্পাদকেরা। এমনকি ইবি ভিসি প্রফেসর ড. হারুন-উর-রশিদ আসকারীর অংশগ্রহণে সরাসরি প্রচারিত টিভি অনুষ্ঠানেও নাম বিকৃত করা হয়। ভিসির পরিচয় উপস্থাপনের ক্ষেত্রে ‘ভাইস চ্যান্সেলর, কুষ্টিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়’ লেখা হয়ে থাকে।

‘তথ্য, প্রকাশনা ও জনসংযোগ দফতর’ বিশ্ববিদ্যালয়ের গুরুত্বপূর্ণ দফতর। এই দফতর থেকে প্রতিনিয়ত বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রেস বার্তাগুলো দেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমে পাঠানো হয়। জনসংযোগ দফতর থেকে পাঠানো ওই সব মেইলেও সাবজেক্ট হিসেবে ÔKushtia iu news (কুষ্টিয়া আইইউ নিউজ)’ শব্দ ব্যবহার করা হয়ে থাকে। পত্র পত্রিকায় নাম বিকৃতির অন্যতম কারণ এটি বলে মন্তব্য করেছেন অনেকে।

ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম নিয়ে কুষ্টিয়া এবং ঝিনাইদহ জেলার মানুষের মধ্যে বিতর্ক অতি পুরাতন একটি বিষয়। এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়টি প্রত্যন্ত গ্রামে হওয়ার পেছনেও মূলত এই আঞ্চলিক মনভাব দায়ী। ইসলাম বিদ্বেষী শক্তির চক্রান্তে রাজধানীর পার্শ্ববর্তী জেলা গাজীপুর থেকে দেশের প্রত্যন্ত কোন এলাকায় ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়কে স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত নেয় তৎকালীন সরকার। পরে কুষ্টিয়া এবং যশোর (বর্তমান ঝিনাইদহ) জেলার রাজনৈতিক ও সামাজিক ব্যক্তিবর্গের দাবির প্রেক্ষিতে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়কে দুই জেলার মধ্যবর্তী গ্রাম শান্তিডাঙ্গা ও দুলালপুরে স্থাপন করা হয়।

শুরুতে বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম লেখা হতো ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশ। কুষ্টিয়ায় স্থানান্তরের পর ‘ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া’। ঝিনাইদহ জেলা হওয়ার পর বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে কুষ্টিয়ার সাথে ঝিনাইদহের নামও যোগ করার দাবি ওঠে এবং তা বাস্তবায়নও হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের কোন অনুষ্ঠানে বা প্রকাশিত কোন প্রকাশনায় কুষ্টিয়ার পাশাপশি ঝিনাইদহের নাম না থাকে তবে তা নিয়ে বেশ উত্তেজনা লক্ষ করা যায় ক্যাম্পাসের সাথে সংশ্লিষ্ট ঝিনাইদহ বাসীর মধ্যে। এ নিয়ে জানুয়ারিতে অনুুষ্ঠিত হয়ে যাওয়া সমাবর্তনকে সামনে রেখে দুই জেলার সম্পাদক ও সাংবাদিক মন্ডলির সাথে মতবিনিময় অনুষ্ঠানেও উচ্চ বাচ্চ বিনিময় শুরু হয়। পরে ভিসির অনুরোধে নাম নিয়ে বিতর্ক স্তফা দেন তারা।

সর্বশেষ সমাবর্তনে বিশ্ববিদ্যালয়ের নামের পাশে কুষ্টিয়া-ঝিনাইদহ বদলে ‘বাংলাদেশ’ শব্দ ব্যবহার করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। এর পর থেকে বিভিন্ন দফতর ও বিভাগও কুষ্টিয়া-ঝিনাইদহ বাদ দিয়ে বাংলাদেশ ব্যবহার শুরু করে। আবার অনেক বিভাগ কুষ্টিয়া-ঝিনাইদহ রেখেই নামের শেষ বাংলাদেশ যোগ করেন। সবমিলে বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম কি তা ঠিকঠাক বলতে পারে না নবীন শিক্ষার্থীরা। বিভিন্ন বিভাগের নবীন শিক্ষার্থীদের বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম জিজ্ঞাস করলে তারা বিভিন্ন জন বিভিন্ন রকম নাম বলে। কেউ বলে কুষ্টিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কেউ ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশ, কেউ কুষ্টিয়া, কেউ কুষ্টিয়া-ঝিনাইদহ, কেউ কুষ্টিয়া-ঝিনাইদহ বাংলাদেশ। তবে এ্যাক্ট অনুযায়ী বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম কি? এ প্রশ্নে উত্তর নবীন শিক্ষর্থীদের একজনও দিতে পারেনি।

শিক্ষক-শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা-কর্মচারী সবারই দাবি বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম বিকৃতি বন্ধ করতে হবে। একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম কখনো বিকৃত রুপে প্রচলিত থাকতে পারে না। আঞ্চলিকতার উর্ধ্বে উঠে বিশ্ববিদ্যালয়কে চিন্তা করতে হবে।

তথ্য, প্রকাশনা ও জনসংযোগ দফতরের প্রধান আতাউল হক বলেন, ‘আমাদের দফতর থেকে পাঠানো ই-মেইলের সাবজেক্টে যদি অভিযোগের বিষয়টি সত্যি থেকে থাকে তবে তা বিশ্ববিদ্যালয়ের এ্যাক্ট অনুযায়ী সংশোধন করা হবে।’

ইবি শিক্ষক সমিতির সভাপতি প্রফেসর ড. মিজানুর রহমান বলেন, ‘ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুযায়ী যে নাম ব্যবহার করা কথা বলা হয়েছে সর্বস্তরে সেই নামই ছাড়া অন্য কোন নাম ব্যবহার না করা উচিৎ।’

পরিবহন প্রশাসক প্রফেসর ড. আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘ক্যাম্পাসের নিজস্ব গাড়িতে নাম বিকৃতি আছে বলে আমার জানা নেই। ভাড়া করা কোন গাড়িতে নাম বিকৃতি থাকলে সেটিও আমার মেয়াদ-কালে লেখা নয়। তারপর আমি বিষয়টি দেখব।’

ভিসি প্রফেসর ড. হারুন-উর-রশিদ আসকারী বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের এ্যাক্টে যে নাম বলা আছে সেই নামই ব্যবহার করতে হবে। অন্য কোন নাম ব্যবহারের সুযোগ নেই। আমরা ইতোমধ্যে এ্যাক্ট অনুযায়ী নাম হিসেবে ‘ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়’ ব্যবহার শুরু করেছি। একই সাথে নামরে শেষে কুষ্টিয়া এবং ঝিনাইদহ বাদ দিয়ে ‘বাংলাদেশ’ ব্যবহার শুরু করেছি।’

সাইফুল্লাহ হিমেল/এসএম