এইসএসসি পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে। আর কিছু দিনের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শুরু হবে ভর্তিযুদ্ধ। মেধাবিকাশের শ্রেষ্ঠ স্থান বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা বইয়ের পাতায় চোখ বুলিয়ে যাচ্ছেন শিক্ষার্থীরা। কাগজে টুকিয়ে নিচ্ছেন গুরুত্বপূর্ণ তথ্যগুলো। খাওয়া-নাওয়া বাদে বাকি সময়গুলোতে মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে তথ্যজট।

দেশের নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া তো সহজ কথা নয়, যেখানে লড়াই হয় শুধু সেরাদের মধ্যে। সেই লড়াইয়ে জিততে হলে একটু সময়ও নষ্ট করা চলবে না। তাই ঘুমের মধ্যেও যেন থেমে থাকে না তাদের পড়ালেখা। কারণ, দশমিক এক নম্বরের জন্যও তো হাতছাড়া হতে পারে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার স্বপ্ন।

বিগত বছরগুলোতে দেখা গেছে, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর আসন সংখ্যার চেয়ে সর্বোচ্চ ফলাফলধারী অর্থাৎ জিপিএ- ৫ প্রাপ্তদের সংখ্যা বেশি হতো। এ কারণে তুলনামুলক কম নম্বর প্রাপ্ত শিক্ষার্থীরা পরীক্ষায় অংশ নেয়ার আগেই চান্স না পাওয়ার আশঙ্কায় থাকতেন। তবে এ বছর সেই আশঙ্কা কিছুটা হলেও কমেছে।

কারণ, এবার জিপিএ- ৫ পাওয়া শিক্ষার্থীদের তুলনায় পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ও মেডিকেল কলেজগুলোতে আসন সংখ্যা বেশি। এতে কিছু বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ শিক্ষার্থী সংকটে পড়তে পারে। এর পরেও ভর্তি পরীক্ষার জটিল সমীকরণে ভালো বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার স্বপ্ন অধরাই রয়ে যাবে সিংহভাগ মেধাবীর।

বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তির প্রস্তুতি নিতে ঢাকায় এসেছেন ছোটন। রাজধানীর একটি নামকরা কোচিং সেন্টারে ভর্তি হয়েছেন তিনি। অন্যান্য বছরগুলোর ন্যায় এবার ভালো ফলাফল না হওয়ায় ভর্তি পরীক্ষায় প্রতিযোগীতা কম হবে কি না- এমন প্রশ্নের উত্তরে ছোটন বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে আসন সীমিত। এজন্য প্রতিযোগীতা সবসময় ভালো শিক্ষার্থীদের সাথেই করতে হয়। ফলাফল খারাপ হলেও প্রতিযোগীতা কম হবে বলে আমি মনে করি না। এছাড়া যারা কাঙ্খিত ফলাফল অর্জন করতে পারেননি তারা আরো কঠিনভাবে প্রস্তুতি নিচ্ছেন। সে হিসেবে বলা যায়, এবারের ভর্তিযুদ্ধ আরো কঠিন হবে।

ইসমাইল হোসেন। বাড়ি ভোলা। ঢাকায় নামকরা একটি কোচিংয়ে ভর্তি হয়েছেন তিনি। ভর্তিযুদ্ধে অংশ নিতে জোরেসোরেই প্রস্তুতি নিচ্ছেন তিনি। তার ইচ্ছা দেশসেরা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভালো কোন বিষয়ে পড়ালেখা করা।

অভিযোগের সুরে ইসমাইল বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভালো ভালো বিষয়গুলোতে ভর্তি হওয়ার জন্য মাদ্রাসার ছাত্রদের সুযোগ দেয়া হচ্ছে না। এটা বড় অন্যায়। কারণ, তাদের যথেষ্ঠ যোগ্যতা থাকার পরও এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের সব শর্ত পূরণ করার পরও তাদেরকে সেখানে ভর্তি করা হচ্ছে না।

অথচ অন্য একজন শিক্ষার্থী, যিনি কোন কলেজ থেকে পড়া লেখা করেছেন, তার যোগ্যতার তুলনামূলক কম থাকলেও তাদেরকে সেখানে ভর্তি হওয়ার সুযোগ দেয়া হচ্ছে। এতে করে মেধার অবমূল্যায়ন করা হচ্ছে। আশাহত হচ্ছেন অনেক ভালো ছাত্র-ছাত্রী।

এবারের এইচএসসি পরীক্ষায় ফলাফল বিপর্যয়ের পর ভর্তির আবেদনের শর্ত শিথিল করেছে প্রাচ্যের অক্সফোর্ড খ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। এইচএসসিতে চতুর্থ বিষয়ে প্রাপ্ত নম্বরও গণ্য করা হচ্ছে ভর্তির যোগ্যতার মধ্যে। যেটা আগে বাদ দিয়ে শুধুমাত্র মূল বিষয়গুলোতে প্রাপ্ত নম্বর যোগ্যতার মধ্যে গণ্য হতো।

ফলে এবার অনেক শিক্ষার্থীই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নিতে পারবেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের এই সিদ্ধান্ত অসংখ্য ছাত্র-ছাত্রীর মুখে হাসি ফুটিয়েছে বলে টাইমনিউজবিডি বলেন কনা চৌধুরি নামে অপর একজন শিক্ষার্থী।

ঢাকার ফার্মগেটে কোচিং করতে আসা বেলাল হোসেন নামে একজন শিক্ষার্থী বলেন, ভর্তি পরীক্ষায় ভালো নম্বর পেতে হলে দক্ষ শিক্ষকদের সহায়তা প্রয়োজন আছে। সে হিসেবে কোচিং সেন্টারগুলো বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তিচ্ছুদের জন্য সহায়ক। যদিও পড়াশোনা নিজেদেরই করতে হয়। তথাপি প্রশ্নের ধরন, কিভাবে পড়লে সফলতা পাওয়া যাবে- এ বিষয়গুলো কোচিং সেন্টারের শিক্ষকদের কাছ থেকে ভালোভাবে জানা যায়। বেলালের ভাষায়, ''কোচিংয়ে এসে অনেক নতুন জিনিস জেনেছি। এতে আমার সাহস অনেক বেড়েছে।''

জানা গেছে, এ বছর আটটি সাধারণ শিক্ষা বোর্ড এবং মাদরাসা ও কারিগরি বোর্ডে ৭ লাখ ৩৮ হাজার ৮৭২ জন শিক্ষার্থী পাস করেছে। এর মধ্যে এইচএসসিতে পাস করেছে ৫ লাখ ৭৭ হাজার ৮৭ জন। আর জিপিএ-৫ পেয়েছে ৪২ হাজার ৮৯৪ জন শিক্ষার্থী। গতবারের চেয়ে মেধার সর্বোচ্চ স্বীকৃতি জিপিএ-৫ কমেছে প্রায় ২৮ হাজার।

বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) ও স্বাস্থ্য অধিদফতর সূত্রে জানা গেছে, এবার উচ্চশিক্ষায় ভর্তিযোগ্য আসন প্রায় সাত লাখ। এর মধ্যে জাতীয় ও উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় বাদে ৩৫টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে আসন আছে ৪৩ হাজার।

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় অধিভুক্ত কলেজগুলোতে স্নাতক (সম্মান) শ্রেণীতে দুই লাখ ৪ হাজার ২শ’ এবং পাস কোর্সে দুই লাখ ৪০ হাজার আসন রয়েছে। উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে আসন আছে ৩৪ হাজার। দুটি আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয়ে আসন সংখ্যা সাড়ে ৫শ’। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে আসন আছে তিন লাখ ২৩ হাজার ৫১১টি। এ ছাড়া সরকারি-বেসরকারি মেডিকেল কলেজে আসন আছে ৯ হাজার ১১২টি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা অনুষদের ডিন অধ্যাপক মো. আখতারুজ্জামান বলেন, মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিকে জিপিএ-৫ পাওয়াই চূড়ান্ত নয়। তুলনামূলক খারাপ ফল করেও ভর্তি পরীক্ষায় ভালো করলে যে কেউ ভর্তির সুযোগ পেতে পারেন।

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. সৈয়দ রাশিদুল হাসান বলেন, জিপিএ-৫ দিয়ে প্রকৃত মেধাবী নির্ণয় সম্ভব হচ্ছে না। হাজার হাজার জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থী ভর্তি পরীক্ষায় পাস করতে পারছেন না। গত বছর মাত্র দু’জন শিক্ষার্থী ইংরেজিতে ভর্তি হওয়ার যোগ্যতা অর্জন করে। এ জন্য তিনি শিক্ষার মান কমে যাওয়াকে দায়ী করেন।

কেএইচ/ এআর