মুম্বাইয়ের চলচ্চিত্র জগতের একঝাঁক ব্যক্তিত্ব এক খোলা চিঠিতে ভারতে ধর্মনিরপেক্ষ শক্তিকে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানানোর পর তা নিয়ে বলিউড কার্যত দুভাগ হয়ে গেছে।
ভারতীয়দের উদ্দেশ্যে ওই আবেদনে বলিউডের মোট ষাটজন শিল্পী, পরিচালক, চিত্রনাট্যকার বলেছেন তারা যেন নিজেদের কেন্দ্রে কোনও ধর্মনিরপেক্ষ দলকেই ভোট দেন।
এই আবেদন যে আসলে বিজেপি নেতা নরেন্দ্র মোদীর বিরুদ্ধেই, সেটাও তারা গোপন করছেন না এবং এরপর বলিউড ব্যক্তিত্বদের অনেকেই আবার এই বিবৃতির পাল্টা সমালোচনা করছেন। কেউ কেউ সরাসরি মি মোদীকেও সমর্থন জানিয়েছেন।
বলিউডের শিল্পীরা অতীতে কংগ্রেস, বিজেপি কিংবা সমাজবাদী পার্টি নানা দলের হয়ে ভোটেই লড়েছেন।
আর সেই গ্ল্যামারের মিছিলে ছিল অমিতাভ বচ্চন থেকে ধর্মেন্দ্র, হেমা মালিনী থেকে জয়াপ্রদা এরকম অসংখ্য নাম।
এবারের নির্বাচনও তার ব্যতিক্রম নয়, নানা দলের হয়েই প্রচারে বা ভোটে লড়তে দেখা যাচ্ছে বলিউড তারকাদের।
তবে শিল্পী-পরিচালকরা একজোট হয়ে কোনও বিশেষ দল বা জোটকে হারানোর ডাক দিচ্ছেন, মুম্বইয়ের চলচ্চিত্র জগতে তা অভূতপূর্ব।
পরিচালক ইমতিয়াজ আলি, বিশাল ভরদ্বাজ, সাঈদ মির্জা, জোয়া আখতার, গোবিন্দ নিহালনি, মহেশ ভাট ও তাদের আরও অনেক সতীর্থ মিলে অবশ্য সেই ব্যতিক্রমী পদক্ষেপটাই নিয়েছেন।
"এরকম একটা আবেদন বিতর্ক সৃষ্টি করবে, তা জেনেও শিল্পীরা মুখ খুলতে বাধ্য হয়েছেন, কারণ ভারতে ধর্মনিরপেক্ষতা আজ বিপন্ন"
তারা ভারতীয়দের প্রতি যে যৌথ আবেদনটা করেছেন তার অর্থ করা হচ্ছে, নরেন্দ্র মোদীকে হারাতে হবে।
চিঠিতে সই করেছেন যে ষাটজন, তাদের অন্যতম অভিনেত্রী নন্দিতা দাস।
তিনি বলছিলেন, “স্পষ্টভাবে নরেন্দ্র মোদীর নামোল্লেখ না-থাকলেও তাদের আবেদন যে মি মোদীর বিরুদ্ধেই, সেটা নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই। আর সেই সঙ্গেই যে সব দল অতীতে ধর্মের ভিত্তিতে মানুষকে ভাগ করার রাজনীতি করেছে বা এখনও করে যাচ্ছে, তাদের বিরুদ্ধে মুখ খুলতেও তাদের কোনও দ্বিধা নেই”
এই অবেদনটির খসড়া করেছিলেন পুকার, রাজনীতি বা সত্যাগ্রহ-র মতো ছবির চিত্রনাট্যকার আঞ্জুম রাজাবালি।
তিনি বলছেন, “এরকম একটা আবেদন বিতর্ক সৃষ্টি করবে, তা জেনেও শিল্পীরা মুখ খুলতে বাধ্য হয়েছেন, কারণ ভারতে ধর্মনিরপেক্ষতা আজ বিপন্ন”
মি রাজাবালির কথায়, “ধর্মনিরপেক্ষতা ভারতের অস্তিত্বের সঙ্গে সমার্থক কিন্তু সেটাই যদি আজ হুমকির মুখে পড়ে তখন মুখ না-খুলে উপায় কী! বিজেপি ও তাদের মধ্যেকার মৌলবাদী দক্ষিণপন্থী শক্তিগুলোর কারণেই ভারতের তরুণ সমাজ আজ নিরাপদ বোধ করছে না”
এই আবেদন প্রকাশিত হওয়ার পর পরই কিন্তু শুরু হয়ে গেছে বিতর্কের ঝড়।
পরিচালক মধুর ভান্ডারকর প্রায় সঙ্গে সঙ্গে টুইট করেছেন, ‘সাম্প্রদায়িক শক্তিকে ঠেকানোর নামে আমার কিছু সহকর্মী যেভাবে বলিউডের মতো ধর্মনিরপেক্ষ একটা জায়গাকে ভাগ করতে চাইছেন – তাতে আমি স্তম্ভিত’।
খানিকক্ষণ পরে তিনি নিজেই আবার সরাসরি নরেন্দ্র মোদীকে জেতানোরও আহ্বান জানান।
"দুর্নীতি আর খারাপ গভর্ন্যান্স ঢাকতে ধর্মনিরপেক্ষতার আড়াল যথেষ্ট নয় – আর ভারতে কোনও দলই সেক্যুলার নয়"
অভিনেতা তুষার কাপুর আবার টুইট করেন, ‘দুর্নীতি আর খারাপ গভর্ন্যান্স ঢাকতে ধর্মনিরপেক্ষতার আড়াল যথেষ্ট নয় – আর ভারতে কোনও দলই সেক্যুলার নয়!’
তবে সবার চেয়ে এগিয়ে ছিলেন কিংবদন্তী চিত্রনাট্যকার ও অভিনেতা সলমন খানের বাবা সালিম খান, নরেন্দ্র মোদীর সমর্থনে একটি উর্দু ওয়েবসাইটের উদ্বোধন করে তিনি বলেন মি মোদীর শাসনে নিরীহ মানুষ মারা পড়বে না বলেই তার বিশ্বাস।
সালিম খান বলেন, “পুরনো কথা আঁকড়ে কতদিন বসে থাকব? আগে তাকাব না? আমার মায়ের মৃত্যুশোকও তো সামলে উঠেছি, আর তো কাঁদছি না। হ্যাঁ, গুজরাটে যা হয়েছিল তার জন্য কেউ সাফাই গাইতে পারে না, কেউই তা সমর্থন করবে না। কিন্তু আমি নিশ্চিত মি মোদী সেখান থেকে শিক্ষা নিয়েছেন । তার আমলে নির্দোষ মানুষ যাতে মারা না-যায় সেটা তিনি ঠিকই দেখবেন”
ভারতে এবারের নির্বাচনে নরেন্দ্র মোদী বিভেদ আর বিদ্বেষের রাজনীতি করছেন – তার সমালোচকরা ক্রমাগতই এই অভিযোগ করে যাচ্ছেন।
সেই অভিযোগ সত্যতা যতটুকুই থাক, মি মোদীকে ঘিরে বলিউডের মতো প্রতিষ্ঠানে যে ইতিমধ্যেই বিভেদ তৈরি হয়ে গেছে, তাতে কোনও মিথ্যে নেই। সূত্র: বিবিসি বাংলা
[b]ঢাকা, ১৭ এপ্রিল (টাইমনিউজবিডি) //এমএ[/b]