গান, প্রগতিশীল সমাজের সুখের এক অন্যতম মাধ্যম। একটি ভালো গানের রয়েছে অসীম ক্ষমতা যা একজন মানুষকে মানসিক শান্তি দিতে সক্ষম। আর ভালো গান বলতে কথা, সূর, মিউজিক এবং শিল্পীর কন্ঠ ও গায়কী- সবকিছুরই সঠিক মিশ্রণ। একটি ছাড়া অন্যটি বিফল। প্রথমেই গীতিকারের হৃদয় থেকে শুরু করে শিল্পীর কন্ঠ পর্যন্ত সঠিক যত্নের মাধ্যমেই একটি গান হয়ে ওঠে অনবদ্য। আর সে গানটি অর্জন করে এমন ক্ষমতা যা মানুষের হৃদয় ছুঁয়ে যেতে পারে।

তবে আমরা ক'জন একটি গান শোনার পরে তার পেছনের পথচলাগুলো নিয়ে চিন্তা করি? আমরা শুধু শিল্পীকেই হয়তো চিনে থাকি। তবে একজন শিল্পীই কেবল নন, একটি সফল সঙ্গীত আয়োজনে সমান দায়িত্ব পালন করেন আরো কয়েকজন। একজন ছাড়া অন্যজন অচল বা একটি ছাড়া আরেকটি। গানের কথাগুলো সর্বপ্রথম কড়া নাড়ে গীতিকারের মনের কোনে। তিনিই ভালো জানেন, কথাগুলোর পিছনের গল্প, তিনিই সর্বপ্রথম কল্পনা করেন গানটির মেজাজ, মহল, কথাগুলোর আবেদন।

তারপর সেগুলোকে বিন্যাস করেন ছন্দে, মাত্রায় স্তবকে। তাঁর হৃদয়ের একান্ত শব্দগুলোকে দেন শৈল্পিক রুপ এবং পুরোটা গান জুড়েই থাকে একটি বিশেষ বার্তা। এরপর সে গান যখন সুরকারের হাতে আসে তখন তিনি কথাগুলোকে সুরে বাঁধেন। সুরের সাথে গানের মেজাজের সম্পর্ক নিবিড়। কাজেই তাঁকেও বুঝতে হয় গানটির প্রকৃত মেজাজ, জানতে হয় শব্দগুলির পেছনে থাকা গীতিকারের ভাবনাগুলো, তাঁর কল্পনায় আঁকা ছবিগুলো। তবেই একজন সুরকার পারবেন গানের মেজাজকে অপরিবর্তিত রেখে সুর বাঁধতে।

এরপর মিউজিক ডিরেক্টর তাঁর নিপুণ পারদর্শিতায় মিউজিক আয়োজন করেন। আর মিউজিক ভুল জায়গায় আঘাত করলে বদলে যেতে পারে গানের মেজাজ, মহল, বার্তা সবকিছুই। সুতরাং, তাঁকেও জানতে হয় গীতিকার, বা সুরকারের চিন্তাগুলোকে। সর্বশেষে শিল্পীর কাছে গানটি পৌছায়। পরম মমতায় শিল্পী তাঁর গায়কী এবং সুরের মুর্ছনায় গানটিকে রুপ দেয়।

তাঁর কন্ঠে আবেদনের ভিন্নতায় গানটি তার কাঙ্খিত রুপে আসীন হয়। আর সেক্ষেত্রে অবশ্যই শিল্পীকে গীতিকার সুরকার এবং মিউজিক ডিরেক্টরের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করতে হয়। জানতে হয় গানটির পথচলা, উৎপত্তি সম্পর্কে এবং তিনি যখন সবকিছু নিজের মধ্যে ধারন করেন তখন তাঁর নিজস্ব আবেগ সেখানে যুক্ত হয়, আর তখনি গানটি হয়ে ওঠে অনবদ্য। ছুঁয়ে যায় শ্রোতার হৃদয়।

সুতরাং এই বলয়টি রক্ষা করা এবং প্রতিনিয়ত মধ্যকার যোগাযোগই মূলত নিয়ম হওয়া উচিত। না হলে হাজারো গান আমরা শুনতে পাবো ঠিকই; তবে গুণগত মানসম্মত গান পাওয়া সম্ভব হবে না অথবা সঠিক শিল্পমান বিশিষ্ট একটি স্বতঃস্ফূর্ত সৃজন আমরা পাবো না। যা সৃষ্টি হয়েছে সৃষ্টের আবেদনে, সৃষ্টির চাহিদায় নয়।

এ প্রসঙ্গে বলেছেন গীতিকার এবং সুরকার সাখাওয়াত হোসেন মারুফ। তাঁর সৃষ্টি বিশ্লেষণ করলে আমরা দেখতে পাই প্রতিটি শব্দে এবং প্রতিটি স্তবকেই হৃদয় নিংড়ানো আবেগ। সহজ কথা যায়না বলা সহজে। সহজ করে সহজ কথাটি বলেন তিনি যা গভীর বিশ্লেষনের দাবী রাখে। হ্যাঁ, তাঁর ভাষ্য এমনই একজন 'আমি' নই, 'আমরা' পারি একটি সৃষ্টিকে তার কাঙ্খিত রুপ দিতে।

অর্থাৎ একটি গান শ্রোতার কাছে আসার আগ পর্যন্ত গীতিকার, সুরকার, মিউজিক ডিরেক্টর এবং শিল্পীর যোগাযোগের মাধ্যমেই একটি গান সুন্দর হয়ে ওঠে। একাধারে গীতিকার এবং সুরকার সাখাওয়াত হোসেন মারুফ, অথচ মাঝে মাঝে অনেক গান তুলে দিচ্ছেন অন্য সুরকারের হাতে। গানের স্বার্থই তাঁর মূল স্বার্থ।

গান কি চাইছে তা শুনতে চেষ্টা করেন তিনি সবসময়। এই বিনয় তাঁর শিল্পস্বত্তাকে আরো উজ্জল করে তোলে। এটা তাঁর এবং সকল শিল্পীর সততার জায়গা, গানের প্রতি, সৃষ্টির প্রতি এটা দায়িত্বশীলতা এবং দায়বদ্ধতা। আমরা চাই এই দায়বদ্ধতার জায়গায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ থাকুক সকল শিল্পী।

নিজের অজান্তেই লিখতে শুরু করেছিলেন গীতিকার ও সুরকার সাখাওয়াত হোসেন মারুফ। অর্থাৎ লেখারাই তাঁকে আমন্ত্রণ করেছে। এমন স্বতঃস্ফূর্ত লেখাই হৃদয়ের কথা বলতে সক্ষম। ঠিক তেমনি- কথা, সুর, মিউজিক সবই স্বতঃস্ফূর্তভাবে যখন বেরিয়ে আসে তখনি একটি গান তার প্রকৃত রুপ লাভ করে।

তিনি বলেন, একজন গীতিকার যে কল্পনা থেকে কথাগুলো সাজিয়ে থাকেন, শেষে যদি সকল আয়োজনের মাধ্যমে সেখানে পরিবর্তন আসে তখণ কথাগুলো তার আবেদন হারায়। আর তাই হাতবদলের মাধ্যমে নয়, আন্তঃযোগাযোগের মাধ্যমেই একটি গান সুন্দর হয়ে ওঠে।

গতানুগতিক বাণিজ্যিক চিন্তাধারায় নয়, বরং গানকে তার চাহিদানুযায়ী সকল যোগান নিশ্চিত করলেই তা স্বাভাবিকভাবেই বাণিজ্য সফল হয়ে ওঠে। কারণ দিনশেষে শ্রোতা সাধারণ এমন একটি গান শুনতে চান যা হৃদয়কে বিশ্রাম দেবে, প্রশান্ত করবে। তাইতো যুগে যুগে যতো গানই সৃষ্টি হোক না কেন, হাজারো গানের ভিড়ে এখনো হাতে গোনা কিছু গানই আমাদের হৃদয়ের মলম হয়ে কাজ করে।

এসএম