হঠাৎ শুরু হলো ঝমঝম বৃষ্টি। অনেকক্ষণ ধরেই আকাশ মেঘলা করলেও এরকম বৃষ্টি কেউ আশা করেনি। ভ্যাপসা গরম আবহাওয়া থেকে এতো সহজে নিস্তার পাওয়া যাবে বলেও কেউ ভাবেনি। বড় বড় বৃষ্টির ফোঁটা আছড়ে পরছে আকাশ থেকে। আছড়ে পরছে ঘর-বাড়ির ছাদে, মানুষের মাথায়, রাস্তার উপর, রিকশার ওপর।

মাতাল এক গন্ধ ছড়িয়ে পড়েছে চারদিকে। মন ভোলোনো গন্ধ। তবে আনন্দের সীমা ছাড়িয়ে যাওয়ার আগেই মেঘ গর্জে উঠে; তার সাথে রাস্তায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে বৃষ্টিতে শরীর ভিজিয়ে নেয়া রমজান আলীর বুকও কেঁপে কেঁপে ওঠে। ঝড়-বাদলার দিন।

ছোটবেলায় এরকম সময়ে কতোকিনা খেলা খেলেছে। খেলার মাঝে দু-চার বার ডিগবাজিও খেত রমজান। তখন চারদিকটা ছিল পুরোপুরি ফাঁকা। তখন খেললেও মজা, না খেললেও আনন্দের সীমা ছিল না। মাঠের মধ্যে বসে থাকতেও ভালোলাগতো তার।

বাড়ির স্যাঁতসেঁতে মেঝেতে শুয়ে থাকাতেও একটা মজা ছিল। কিন্তু সে সময় তার বিরক্ত লাগতো বেরসিক মকবুল স্যারের পড়াটা মুখস্ত করা।


পেছনে গাড়ির হর্ন শুনে রমজান তার রিকশাটা একটু সামনে এগিয়ে রাখলো। গাড়িটা বের হতে পারছিল না। আর ড্রাইভারদেরও তর সয় না। রমজান আলীর চিন্তাগুলো এলোমেলো হয়ে গেল।

বৃষ্টির পানি রিকশার সিট, হুড, চাকার ওপরে টিনগুলো ধুয়ে দিয়েছে। সে হুডটা উঠিয়ে দিলো। ধোয়া সাফসুতোর রিকশা যেন চকচক করছে। এতো পরিস্কার রিকশা চালানোর মজাই আলাদা। সকালে কেরামত রিকশা পরিষ্কার করলেও এমনটা হয় না। ওর তো বেলের বাটিতেই হাতই পড়ে না। ফাঁকিবাজ। সব কাজ তার নিজের করা লাগে।

আগে তো এতো সমস্যা ছিল না। সে দেখেছে তার বাবা কতদিন হাসি মুখে বাড়ি ফিরেছে। তার নিজের দিনগুলোও তো কতো সহজ ছিল। দেশটা দিনে দিনে কেমন যেন হয়ে যাচ্ছে।


হঠাৎ করে বলা নেই, কওয়া নেই এক লোক হুট করে রিকশায় চেপে বসলো। পর্দাটা প্রায় ছোঁ মেরে টেনে নিয়ে বলে উঠলো ফার্মগেট। আরে রমজান তো নাও যেতে পারতো! নাহ্, লোকটাকে পৌঁছে দেই। বৃষ্টির দিকে তাকালে তো আর পেট চলবে না। গরিবের পরিশ্রমই সম্বল।

রমজান স্কুলে পড়েছে, পরিশ্রমে ভাগ্য ফেরে। তখন আর কতোকি পড়েছে। ও সব কথা ঠিক মনে পড়ে না। স্যারদের মুখে তখন কতো কতো কথা শুনেছে। তবে কথাগুলো যে অনেক দামী ছিল, তাতে সন্দেহ নেই রমজানের। কতো বড় বড় লোকেরা বইগুলো লিখতো।

রমজান ভাবে এই বড় বড় লোকগুলোই আবার কিসব কান্ড করে বসে। কাজ করতে হবে, তাহলেই ফল পাওয়া যাবে। বৃষ্টির দিনে ভাড়াও বেশি পাওয়া যাবে। রমজান আলী দ্রুত উঠে তার সিটে বসে প্যাডেল মারতে শুরু করলো।


লোকটাকে ভদ্রলোক বলেই মনে হয়। কোট-টাই পরেছে, ইস্তিরি করা শার্ট, জুতাটাও একেবারে চকচক করছে। রমজান লোকটার পলিশ করা জুতার দিকে তাকালে, তার নিজের পা-টা যেন খালি খালি মনে হয়। পায়ের বৃদ্ধাঙুল আর গোড়ালির দিকে তার স্পঞ্জের স্যান্ডেল অনেকটা খেয়ে দেবে গ্যাছে। স্যান্ডেলটা পায়ের তালু ছুঁয়েছে। এটা তো এতোদিন ঠিকই ছিল।

এখন হঠাৎ কী হলো। পায়ে খুব অস্বস্তি লাগছে। সে জোরে জোরে রিকশায় প্যাডেল মারতে লাগল। রাস্তায় জমে যাওয়া পানিতে তার পা মাঝেমধ্যে লেগে সারা গা শিরশির করে উঠছে। রবারের প্যাডেলটাও এত নরম হয়েছে যেন, চাপ দিলেই দেবে যাচ্ছে। ছোটবেলায় বৃষ্টির দিনে নরম কাদামাটিতে খালি পায়ে হাটার কথা মনে পড়ে রমজান আলীর। আজকেও হাটতে হবে। চকচকে জুতো পরে রিক্সায় বসা ভদ্রলোকটিকেও আজ হাঁটতে হবে।


‘হরলিকস্ শেষ? বিস্কুটও নেই? এই বৃষ্টির মধ্যে কোথাও নামা যাবে না। বারান্দায় এসে দেখ কতো বৃষ্টি-’ কার সাথে কথা বলছে লোকটা?


রমজান আলীর একটা গরু ছিল। ওর দুধের পায়েসটা ছিল রমজানের খুব প্রিয়। রমজান ধান কাটার সময়ে তার বাবার সাথে সাথে থাকতো। গেল বড় বন্যায় তার বাবা মরেছে। আর তখন থেকেই এই রিকশাটা তার সঙ্গী। প্রায়ই গায়ে যেতে ইচ্ছে করে। কিন্তু তা আর হয়ে ওঠে না।


‘এই রাখ, রাখ’। একটা লাইট পোস্টের পাশে রিকশাটা রাখলো রমজান আলী। লোকটা সিটেই বসে রইলো। তার গায়ে যাতে বৃষ্টির ছিটা না লাগে তাই পর্দাটা ঠিকমতো ধরে রাখতে সে ব্যস্ত। আবার ডান হাত দিয়ে সে মানিব্যাগটা বের করার চেষ্টা করছে। অবশেষে ২০ টাকার একটা নোট বের করতে লোকটার বেশ পরিশ্রমই হলো। ভাড়া এমনিতেই ২৫ টাকা। বৃষ্টির জন্য অন্তত ১০ টাকা বেশি হওয়ার কথা।


২০ টাকা কেন?
বিদ্ঘুটে মুখ করে তাকালো ভদ্রলোক। নাহ্, ভদ্রলোকদের রমজান এখনো ঠিক চিনে উঠতে পারেনি। অন্যদের মতো খেচখেচ করতে রমজানের ভালো লাগে না। যাক ভালোয় ভালোয় লোকটা নেমে পড়লেই বাঁচি।


রিকশা থেকে নেমেই লোকটা একটা ধূসর দালান লক্ষ্য করে দৌড়াতে লাগলো। বৃষ্টির মতো কত কিছু থেকেই না বাঁচতে ভদ্রলোককে এমনি দৌড়াতে হয়। রমজান তাকিয়ে তাকিয়ে তার দৌড় দেখলো। তার সুট-কোট, চকচকে জুতো, মাথা, গোটা ভদ্রলোকই ভিজে চুপ চুপ হয়ে যাচ্ছে।

বৃষ্টির তীব্রতা বাড়তে লাগলো। রিকশার হুডটা ফেলে দিল রমজান আলী। তীব্র গতিতে ছুটতে লাগলো সে। কিন্তু দুপুর গড়িয়ে গেলেও জমার টাকাও তো এখনো জোগাড় হয়নি তার। মুষলধারে বৃষ্টিতে ছুটতে লাগলো রমজান অন্য কোনো ভদ্রলোকের খোঁজে।


(মৃত্যুর ৬ মাস আগে লেখা ত্বকীর ছোটগল্প)