সঙ্গীত ভালবাসতেন বলেই হয়তো সঙ্গীতের মঞ্চ থেকেই শেষ বিদায় নিলেন চিত্রশিল্পী কাইয়ুম চৌধুরী। যে মঞ্চ থেকে নিভে গেছে এই নন্দিত চিত্রশিল্পীর জীবন-প্রদীপ সেই মঞ্চেই রোববার সারারাত চলেছে সুরের মূর্ছণা। শেষ রাতে বাঁশির সুরে ঝঙ্কার তুলেছেন ওস্তাদ হরিপ্রসাদ চৌরাসিয়া।

ভোর পর্যন্ত ৫৫ হাজারেরও বেশী দর্শক-শ্রোতা উপভোগ করেছেন ধ্রুপদী সঙ্গীতের এই মায়াবী খেলা। উৎসব মঞ্চ থেকে এক মিনিট নীরবতা পালন করে শ্রদ্ধা জানানো হয় শিল্পী কাইয়ুম চৌধুরীকে। মঞ্চ থেকেই জানানো হয় প্রিয় চিত্রশিল্পীর মৃত্যুতে শোকাহত হওয়ার খবর। তবে থেমে থাকেনি উৎসবের নিয়মিত আয়োজন।

অনুষ্ঠান মঞ্চ থেকেই অধ্যাপক আনিসুজ্জামান সমবেত সকলকে কাইয়ুম চৌধুরীর মৃত্যুর সংবাদ জানানোর পর বলেন, ‘অনুষ্ঠান চলবে, জীবন যেমন বয়ে চলে।’

এর পর সারারাত চলেছে ধ্রুপদী সঙ্গীতের উৎসব। অনেকেই আবার মন বসাতে পারেননি এই উৎসবে। তাদের মনের কোণে যে শুধুই প্রিয় চিত্রশিল্পীর ছবি।

নির্মাতা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী তার ফেসবুক স্ট্যাটাসে লেখেন, ‘চৌরাসিয়া শুনতে আর্মি স্টেডিয়ামের কাছাকাছি গিয়েছিলাম। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কেন জানি ঢুকতে পারলাম না। যারা রাত জেগে উচ্চাঙ্গ শুনছেন- এই স্ট্যাটাস তাদের ছোট করার জন্যে নয়। কিন্তু কেন জানি কাইয়ুম চৌধুরীর কথাটা মাথা থেকে ঝাড়তে পারছিলাম না। মনের মধ্যে অনেক প্রশ্নও উঁকি দিচ্ছিল। দেশের প্রধান শিল্পীদের একজন মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ল এই মঞ্চে, একটুও কি ছন্দপতন হতে পারত না? ফিল হিউজের জন্য নিজের দেশে না শুধু, অন্য দেশেও ক্রিকেট খেলা স্থগিত হয়েছে। চোখের সামনে কাইয়ুম চৌধুরী নাই হয়ে যাওয়ার পরও যে দৃঢ়তা আমরা দেখিয়েছি, সেটা পেশাদারিত্বের চরম উদাহরণ। সেটা আমি বুঝতে পারছি। কিন্তু আমার যে একটু ছিঁচকাঁদুনে আবেগও আছে। জীবন কি তবে এইমতোই চলিয়া যায় জগৎসভার কোনো তাল না কাটিয়াই? আমরা জানি জীবন বহিয়া চলে। কিন্তু জীবন যদি কোনো দাগ না কাটিয়াই বহিয়া চলে, তবে এই জীবন বড় বেদনার।’

ফারুকীর মতো আরও অনেকেই এই প্রশ্ন তুলেছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ফারিয়া বলেন, ‘জীবন কী অদ্ভুত! এই মঞ্চেই শেষ বিদায় নিলেন আমাদের দেশের অগ্রজ সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব। আবার এই মঞ্চেই সারারাত চলেছে উৎসব। পুরো আয়োজনে মনেই হয়নি এখানে আর ফিরবেন না কাইয়ুম চৌধুরী। প্রিয় চিত্রশিল্পীর জন্য একটা দিন কি স্থগিত করা যেত না?’

আরও অনেকেই এমন প্রশ্ন তুলেছেন আয়োজকদের কাছে। তাদের সবার জন্য আয়োজকদের উত্তর- ‘জীবন বহিয়া চলে।’

চতুর্থ দিনের আয়োজনে মূল আকর্ষণ ছিল প্রবাদপ্রতিম শিল্পী পণ্ডিত হরিপ্রসাদ চৌরাসিয়ার বংশীবাদন। অনেকেই চৌরাশিয়ার বাঁশি শুনতে ভোর পর্যন্ত ছিলেন উৎসবে। তিনি বাঁশিতে প্রথমে বাজান মত্ত তালে রাগ আহির ভৈরব। তার সঙ্গে তবলা সঙ্গত করেন ওস্তাদ যোগেশ শামসি। এর পরে পণ্ডিত চৌরাসিয়া বাঁশিতে তোলেন কীর্তনের সুর। রাগ ভৈরবী বাজিয়ে পরিবেশনা শেষ করেন তিনি। চৌরাসিয়ার বাঁশির সুরে মাতোয়ারা শ্রোতারা যেন ভুলে গেছেন কাইয়ুম চৌধুরীর বিদায়ের শোক।

জেআই