২০ মার্চ  বৃহস্পতিবার জাতীয় নাট্যশালার পরীক্ষণ থিয়েটার হলে সন্ধ্যা ৭.০০ মিনিটে মঞ্চস্থ হতে যাচ্ছে ঢাকা থিয়েটারের নাটক 'পঞ্চনারী আখ্যান'। হারুন রশীদের রচনায় নাটকটি নির্দেশনা দিয়েছেন শহীদুজ্জামান সেলিম। নাটকটিতে রোজী সিদ্দিকীর একক অভিনয় দেখা যাবে।                                
নাটকে দেখা যাবে, দানবের মৃত্যু গহ্বর থেকে পালিয়ে আসা জোলেখা যখন প্রকৃতির জগতে এসে মুক্ত বাতাসে প্রাণভরে নিঃশ্বাস নিতে চায়, তখন অনুভব করে, আর এক বন্দিশালায় বন্দি হয়ে গেছে সে। চলচ্চিত্রের অভিনয় শিল্পী অন্তরা শিল্পী হিসেবে নিজেকে প্রকাশ করতে গিয়ে বুঝতে পারে, পুরুষের আনন্দ আর বিনোদনের সেবাদাসী হয়ে গেছে সে। দারিদ্র এবং সামাজিক বঞ্চনা তাকে এমনভাবে বেঁধে রেখেছে যে, দাসত্বের অদৃশ্য শৃঙ্খলকে ভেঙ্গে ফেলার কল্পনা পর্যন্ত সে করতে পারে না।
স্বামী সংসার নিয়ে আপাতদৃষ্টিতে সুখ মনোরমার সংসারে প্রয়োজন একটি সন্তান। মাতৃত্বের আকাঙ্খা পূর্ণ না হওয়ার বেদনায় মুহ্যমান মনোরমা হতবাক হয়ে যায় যখন তার প্রিয়তম স্বামী সন্তান না হওয়ার সমুদয় দায় তুলে দেয় মনোরমার কাঁধে।
অথচ তারা উভয়েই জানে, ডাক্তারি পরীক্ষা অনুযায়ী মনোরমার সন্তান না হওয়ার কারণ তার স্বামী। স্বামীর সাথে সাথে পরিবার এবং সমাজও সন্তান জন্ম দিতে ব্যর্থতার দায়ে আসামির কাঠগড়ায় দাঁড় করায় মনোরমাকে।
বেদনায় ক্লিষ্ট, স্বপ্নহীন মনোরমা তারপরও সুখে থাকার ভান করে।মিথ্যে সুখাভিনয় দিয়ে মনোরমা সুখী রাখতে চায় পরিবারের সবাইকে। কিন্তু প্রকৃত সত্য বেরিয়ে আসে। তারপরও কি মুক্তি মেলে মনোরমার?
স্বামী দ্বিতীয় বিয়ে করার ফলে বাড়ি থেকে নির্বাসিত হয় মরিয়ম। কিন্তু এতে মরিয়মের কোনো সায় ছিল না। এই বিষয়টিকে কেন্দ্র করে এক আইনজীবীর পরামর্শে মামলা করে মরিয়ম। আদালত প্রথম স্ত্রী হিসেবে মরিয়মের অনুমতি না দিয়ে বিয়ে করায় মরিয়মের স্বামীকে জেল ও জরিমানা করে। জেল থেকে বেরিয়ে তার স্বামী দুই সন্তানসহ তাকে আর ঘরে তুলবে না, সে আর্থিকভাবেও কোনো সহায়তা পেলো না। জরিমানার টাকা পুরোটাই যাবে সরকারের কোষাগারে। বঞ্চিতা মরিয়মের ভেতরে প্রশ্ন জাগে, তবে এই বিচারে তার কী লাভ হলো?
ইতিহাস থেকে উঠে আসা মোঘল সম্রাট শামসুদ্দিন শাহজাহানের প্রিয়তম পত্মী মমতাজমহল বর্ণনা দেয় নিজের অবস্থানের। সম্রাট শাহজাহানের ভাললাগা-ভালবাসার অনুভূতি বাস্তবায়নের যন্ত্র ছিলো সে। জানতে চায় তার যে কিছু ভাললাগা, আকাঙ্খা, চাওয়া-পাওয়া থাকতে পারে, তার খবর কি রাখতেন মোঘল সম্রাট?
মা হতে চলেছিলো মমতাজ। প্রসব যন্ত্রণায় যখন সে ছটফট করছে যখন জঠরে বেড়ে ওঠা সন্তানকে পৃথিবীর আলো দেখার জন্য মরিয়া তখন রাজবৈদ্যদের কাউকে মমতাজের চিকিৎসার জন্য পাঠানো হয়নি। কেননা প্রসূতি মমতাজের অর্ধনগ্ন শরীর দেখে পুরুষ বৈদ্যরা চিকিৎসা করবেন এ বিষয়টির অনুমোদন দেননি সম্রাট।
আর মমতাজ অশিক্ষিত ধাত্রীদের হাতে আসন্ন সন্তানসহ মারা গেলেন। জীবিত অবস্থায় ভালবাসার নামধারী মহলে বন্দি ছিলেন মমতাজ। মৃত্যুর পরও মুক্তি মিললো না তার। আজো প্রেমের উপমা হিসেবে মমতাজের সমাধির ওপর শাহজাহানের তৈরি তাজমহলকে তুলে ধরে থাকেন। এই ভ্রান্তি থেকেও মুক্তি চান ইতিহাসের পাতা থেকে উঠে আসা মমতাজ।
সৃষ্টির সূচনা থেকে নারীর দাবি একটাই কেবল নারী নয়, তার পরিচিতি হোক মানুষ হিসেবে। বিত্তহীন, মধ্যবিত্ত, উচ্চবিত্ত শ্রেণী থেকে শুরু করে পেশাগত সব অবস্থানেই নারী সহস্র বছর ধরে পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থায় অন্যায়, বিভেদ আর বৈষম্যের শিকার হয়ে যাপন করছে মানবেতন জীবন। নারীর অধিকার নিয়ে কথা বলা হয় অনেক। কিন্তু পুরুষ শব্দের সমান অর্থবহ উচ্চারণে নারীর নামকরণ আদৌ হয় কি কোথাও?
নিপীড়ন আর নির্যাতনের যাঁতাকলে কোনো না কোনোভাবে পিষ্ট হচ্ছে প্রতিটি নারী। এ বন্দিদশা থেকে মুক্তি পেতে নিরন্তর সংগ্রামে লিপ্ত বিশ্বের নারী। বৈষম্যের হাহাকারকে অতিক্রম করে কবে তারা মানুষ হিসেবে নিজেকে অনুভব করতে পারবে এ আর্তনাদই ধ্বনিত হয়েছে পঞ্চনারী আখ্যান শীর্ষক নাট্যে।
ঢাকা, ১৮ মার্চ (টাইমনিউজবিডি.কম) // জেআই