এর আগে শুক্রবার ফিরেছিলেন আরও ৩৭ জন। এ নিয়ে গত দুদিনে ৯১ জন বাংলাদেশি দেশে ফিরলেন।
আজও ফেরত আসা সবাইকে বিমানবন্দরে জরুরী সহায়তা ও বাড়িতে পৌঁছানোর জন্য অর্থ সহায়তা করেছে ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রোগ্রাম।
বিদেশে ভালো চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর ছাড়পত্র দিয়ে তাদের সবাইকে কম্বোডিয়ায় পাঠানো হয়েছিল। তবে সেখানে পৌঁছানোর পর বাংলাদেশি দালাল চক্রের মাধ্যমে তাদেরকে অর্থের বিনিময়ে চীনা নিয়ন্ত্রিত বিভিন্ন সাইবার স্কাম কম্পাউন্ডে হস্তান্তর করা হয়।
শনিবার ফেরত আসা ভুক্তভোগীদের একজন জানান, জনশক্তি ব্যুরোর ছাড়পত্র দিয়ে ২০২৫ সালের ৫ ডিসেম্বর আমার ফ্লাইট হয়। দুই দিন মালয়েশিয়ায় ট্রানজিটে ছিলাম। এরপর ৭ ডিসেম্বর কম্বোডিয়া এয়ারপোর্টে পৌঁছাই।
ওই ভুক্তভোগী জানান, তিনি বিমানবন্দরের বাইরে এলে রবিন শেখ নামের এক বাংলাদেশি তাকে রিসিভ করে তার বাসায় নিয়ে যান। সেখানে কিছুদিন থাকার পর রবিন তাকে কাজ দেবে বলে নিয়ে য়ান। এরপর ২৩ ডিসেম্বর তাকে কম্পিউটারের কাজের কথা বলে সেখানে নিয়ে গিয়ে একটি কোম্পানিতে কাজ দেন।
পরের দিন কাজে যোগ দিলে বুঝতে পারেন, এটি একটি স্ক্যাম প্ল্যাটফর্ম, যেখানে মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করে টাকা আনা হয়। তিনি কাজ করতে না চাইলে সেখানকার চাইনিজ বস বলে, তুমি টাকা দিয়ে পাসপোর্ট নিয়ে চলে যাও। তখন কত টাকা জানতে চাইলে বলা হয়, তোমার দালাল রবিন শেখ তোমাকে আমার কাছে ২০৮৫ ডলারে বিক্রি করেছে। এই টাকা না দিলে কাজ করতে হবে।
আরেক ভুক্তভোগী জানান, সেদেশে থাকা বাংলাদেশি দালাল বিয়ে করে দীর্ঘ সময় ধরে কম্বোডিয়াতে থাকেন। তাকে কম্বোডিয়াতে সুপারশপে চাকরির কথা বলে নিয়ে ৫ মাস কাজও করান। মাসে বেতন দিতেন ৪০০ ডলার। থাকা খাওয়ায় তার কিছুই থাকতো না। তিনি ও তার পরিবারের সদস্যরা চাপ দিলে একদিন অন্য কোম্পানিতে চাকরির কথা বলে স্কাম সেন্টারে বিক্রি করে দেওয়া হয়।
ভুক্তভোগীরা জানান, এসব কম্পাউন্ডে তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে জোরপূর্বক অনলাইন প্রতারণামূলক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হতে বাধ্য করা হতো। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন উন্নত দেশের নাগরিকদের লক্ষ্য করে পরিচালিত সাইবার স্কাম কার্যক্রমে অংশ নিতে তাদের চাপ দেওয়া হতো। নির্ধারিত লক্ষ্য পূরণে ব্যর্থ হলে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হতে হতো।
এর আগে গতকাল (১২ জুন) কম্বোডিয়া থেকে ৩৭ জন দেশে ফেরত আসেন, একইভাবে এ বছরের ২২ জানুয়ারি মিয়ানমারের একটি সাইবার স্ক্যাম সেন্টার থেকে আটজন এবং ২০২৫ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর ১৮ জন বাংলাদেশি নাগরিক দেশে ফেরেন। তাদেরও ভালো কাজের প্রলোভন দেখিয়ে থাইল্যান্ডের সীমান্ত এলাকা মায়েসট হয়ে জোরপূর্বক মিয়ানমারে প্রবেশ করানো হয়। সেখানে পৌঁছানোর পরই তাদের পাসপোর্ট ও মোবাইল ফোন কেড়ে নিয়ে বিদেশের মাটিতে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে ফেলা হয়। ভয়াবহ নির্যাতন করে নানা ধরনের সাইবার জালিয়াতির কাজ করানো হয়।
ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রোগ্রাম ও ইয়ুথ প্ল্যাটফর্মের সহযোগী পরিচালক শরিফুল হাসান জানান, কম্বোডিয়ার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানের ফলে কয়েকটি স্ক্যাম কম্পাউন্ড থেকে এসব বাংলাদেশিকে উদ্ধার করা সম্ভব হয়। পরপর দুদিন মিলে ৯১ জন বাংলাদেশির ফেরত আসা প্রমাণ করে বিপুল সংখ্যক বাংলাদেশি এভাবে প্রতারণা ও নির্যাতনের শিকার।
শরিফুল হাসান জানান, সাইবার স্ক্যাম মানব পাচারের ভয়াবহ একটা ধরন। কম্পিউটার, কলসেন্টার অপারেটরসহ বিভিন্ন পদে আকর্ষণীয় বেতনের প্রলোভন দিয়ে নিয়োগের লক্ষ্যে বিভিন্ন অনলাইন মাধ্যমে (ভুয়া ওয়েবসাইট, ইমেইল, ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ, টেলিগ্রাম ইত্যাদি) প্রচার চলে। এরপর তাদের সুকৌশলে স্ক্যাম সেন্টারের ভেতরে নিয়ে গিয়ে অস্ত্রের মুখে জোরপূর্বক জিম্মি করে স্ক্যামের কাজে নিয়োজিত করা হয়।
তিনি বলেন, এ কারণেই সরকার এবং ব্র্যাকের পক্ষ থেকে একাধিকবার থাইল্যান্ড, মিয়ানমার, লাওস, ভিয়েতনাম ও কম্বোডিয়ায় যাওয়ার বিষয়ে সচেতন হতে সতর্কতা জারি করা হয়েছে। এসব বিষয়ে বিদেশগামীসহ সবার সচেতনতা প্রয়োজন।
এমএম