ইরাকের অর্থনীতির প্রধান ভিত্তি তেল। দেশটির সরকারি রাজস্বের প্রায় ৯০ শতাংশ আসে তেল বিক্রি থেকে। ফলে এই অর্থ কোথায় রাখা হচ্ছে এবং কীভাবে ব্যবস্থাপনা করা হচ্ছে, তা দেশটির অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
যেভাবে নিউইয়র্ক ফেডে গেল ইরাকের তেল আয়
২০০৩ সালে মার্কিন নেতৃত্বাধীন বাহিনী ইরাকে অভিযান চালানোর পর তেল বিক্রির অর্থ ব্যবস্থাপনা ও পুনর্গঠন কার্যক্রমে ব্যয়ের জন্য ‘ডেভেলপমেন্ট ফান্ড ফর ইরাক’ (ডিএফআই) গঠন করে কোয়ালিশন প্রভিশনাল অথরিটি (সিপিএ)।
এই তহবিল নিউইয়র্কের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকে রাখা হয়। একই সঙ্গে সাবেক প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেনের শাসনামলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মামলা, দাবি ও অন্যান্য আইনি জটিলতা থেকে ইরাকের তেল আয়ের অর্থ সুরক্ষিত রাখার বিষয়টিও বিবেচনায় ছিল।
তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ এ ব্যবস্থা চালুর জন্য নির্বাহী আদেশ জারি করেন। পরবর্তী মার্কিন প্রেসিডেন্টরাও বিভিন্ন সময়ে ওই ব্যবস্থা নবায়ন করেন। সময়ের সঙ্গে ডিএফআই ইরাকের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একটি হিসাবে রূপ নেয়। তবে সেটিও নিউইয়র্ক ফেডের মাধ্যমেই পরিচালিত হচ্ছে।
ইরাকের ওপর প্রভাব কতটা
ইরাকের তেল আয়ের ওপর নির্ভরশীলতা দেশটির অর্থনীতিতে এই ব্যবস্থার গুরুত্ব বাড়িয়েছে। ২০২০ সালে ইরাক সরকার মার্কিন সেনাদের প্রত্যাহারের দাবি তোলার পর নিউইয়র্ক ফেডে থাকা ইরাকের তহবিলে প্রবেশাধিকার বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দিয়েছিল ওয়াশিংটন—রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে এমন তথ্য উঠে এসেছে। শেষ পর্যন্ত বাগদাদ ওই অবস্থান থেকে সরে আসে।
তবে ২০০৩ সালের পরের সময়ের তুলনায় নিজেদের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় ইরাকের নিয়ন্ত্রণ অনেক বেড়েছে। তারপরও নিউইয়র্ক ফেডের সঙ্গে তেল আয়ের এই সম্পর্ক দেশটির অর্থনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘস্থায়ী প্রভাবের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
কেন এত বছরেও ব্যবস্থা বদলায়নি
রয়টার্সকে ইরাকি সরকারি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নিউইয়র্ক ফেডের মাধ্যমে তেল আয়ের অর্থ ব্যবস্থাপনা ইরাকের আর্থিক স্থিতিশীলতা ও রাষ্ট্রীয় অর্থ সুরক্ষায় ভূমিকা রাখছে। তাদের মতে, এতে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ইরাকের অর্থ ব্যবস্থাপনা নিয়ে আস্থা তৈরি হয় এবং বাণিজ্য ও আমদানির জন্য প্রয়োজনীয় মার্কিন ডলারে প্রবেশাধিকার সহজ থাকে।
ঋণদাতাদের দাবিও হলো, মামলা, আর্থিক দাবি ও অন্যান্য বহিরাগত ঝুঁকি থেকে তেল আয়ের অর্থ সুরক্ষিত রাখতে এই ব্যবস্থা সহায়ক। পাশাপাশি ইরাকি দিনারের বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখা এবং অর্থনীতির প্রতি আস্থা বজায় রাখতেও এটি ভূমিকা রাখে।
এ ব্যবস্থার মাধ্যমে ইরাক মার্কিন নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা পক্ষগুলোর সঙ্গে ডলারে লেনদেনের ঝুঁকিও নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। গত বছর ইরানের হয়ে অর্থপাচারে জড়িত থাকার অভিযোগে ইরাকের কয়েকটি ব্যাংক ও ব্যক্তির ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র।
ডলার সংকটে তৈরি হয়েছে কালোবাজার
তবে এই ব্যবস্থার কারণে ইরাকে ডলারের সরবরাহ নিয়ে চাপও তৈরি হয়েছে। মার্কিন ডলারের ওপর কঠোর বিধিনিষেধের ফলে দেশটিতে একটি অনানুষ্ঠানিক বা কালোবাজারি ডলার বাজার গড়ে উঠেছে।
এর ফলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্ধারিত সরকারি বিনিময় হার এবং কালোবাজারের দামের মধ্যে পার্থক্য দেখা দিয়েছে। আনুষ্ঠানিক আর্থিক ব্যবস্থার বাইরে লেনদেনের ঝুঁকির কারণে এই ব্যবধানকে অতিরিক্ত ‘রিস্ক প্রিমিয়াম’ হিসেবেও দেখা হয়।
এদিকে ইরানের ওপর মার্কিন চাপ এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইরান উত্তেজনার কারণে ইরাককে প্রায়ই দুই দেশের টানাপোড়েনের মধ্যে পড়তে হচ্ছে। ইরান তার অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের জন্য ইরাককে গুরুত্বপূর্ণ পথ হিসেবে ব্যবহার করে আসছে।
তেল বিক্রির টাকা এখন কোথায়
ইরাকের তেল বিক্রির অর্থ এখনো নিউইয়র্কের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকের ব্যবস্থার মধ্যেই রয়েছে। অর্থাৎ মার্কিন সেনা প্রত্যাহার শেষ হলেও দেশটির তেল আয়ের ডলার ব্যবস্থাপনায় নিউইয়র্ক ফেডের ভূমিকা অব্যাহত রয়েছে।
ইরাকের কেন্দ্রীয় ব্যাংক দীর্ঘদিন ধরে ডলার সরবরাহের জন্য ‘ডলার নিলাম’ বা ফরেন কারেন্সি উইন্ডো ব্যবহার করেছে। এর মাধ্যমে বেসরকারি ব্যাংক ও মানি এক্সচেঞ্জ প্রতিষ্ঠানগুলো ইরাকি দিনার দিয়ে মার্কিন ডলার কেনার জন্য আবেদন করতে পারত।
তবে ২০২৫ সালের শুরুতে ইরাক আনুষ্ঠানিকভাবে ডলার নিলাম ব্যবস্থা বন্ধ করে দেয়। রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, ইরানের মতো মার্কিন নিষেধাজ্ঞার আওতাভুক্ত পক্ষগুলোর কাছে ডলার পাচারের অভিযোগ এবং এ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের চাপের মধ্যে ব্যবস্থা পরিবর্তন করা হয়।
ফলে ইরাক থেকে মার্কিন সেনাদের প্রত্যাহার দেশটির মাটিতে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতির অবসান ঘটালেও তেল বিক্রির অর্থ ব্যবস্থাপনায় ওয়াশিংটনের দীর্ঘদিনের প্রভাব পুরোপুরি শেষ হয়নি। দেশটির অর্থনীতির অন্যতম প্রধান ভিত্তি তেল আয়ের অর্থ কোথায় রাখা হবে এবং কীভাবে তা ডলারে রূপান্তরিত হবে—সেই ব্যবস্থায় নিউইয়র্ক ফেড এখনো গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে।
সূত্র: রয়টার্স
এস











