ভারতের সরকারের সবচেয়ে রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল কিছু দায়িত্ব সামলানোর পরও দীর্ঘদিন জনসমক্ষের বাইরে কাটানো একজন আমলার জন্য এটি একটি অস্বাভাবিক পরিস্থিতি। প্রায় এক বছর ধরে ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) হিসেবে কুমার স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন (এসআইআর) বা ‘বিশেষ নিবিড় পুনর্বিবেচনা’ নামে দেশের ভোটার তালিকা সংশোধনের এক ব্যাপক উদ্যোগ নিয়ে তীব্র রাজনৈতিক চাপে রয়েছেন।
গত বছর বিহার থেকে শুরু হওয়া ভোটার তালিকা সংশোধনের এমন চর্চা বর্তমানে ভারতের অধিকাংশ স্থানে সম্প্রসারিত হয়েছে এবং ৩০টি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল জুড়ে খসড়া ভোটার তালিকা থেকে ১৩ কোটিরও বেশি নাম বাদ দেওয়া হয়েছে, যা ভারতের মোট ভোটারের প্রায় ১৩ শতাংশ। নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে যে, নকল এবং অযোগ্য প্রার্থীদের বাদ দিয়ে বৈধ ভোটারদের অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করতেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
তবে বিরোধী দলগুলো ও অধিকার কর্মীরা অভিযোগ করেছেন যে, এর ফলে বৈধ ভোটাররা ভোটাধিকার বঞ্চিত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ছেন। তবে কুমার এবং কমিশন রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে এই প্রক্রিয়াটি বিকৃত করার সমস্ত অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছেন।
চলতি সপ্তাহে বিতর্কটি কুমারের নিজের প্রতিষ্ঠানের ভেতরেই রূপ নেয়। ‘দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’-এর একটি তদন্তে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয় যে, তার দুই সহকর্মী নির্বাচন কমিশনার সুখবীর সিং সান্ধু এবং বিবেক জোশী তাদের অজান্তে গৃহীত সিদ্ধান্ত ও আদেশের বিরুদ্ধে ১০ মাসে অন্তত ১৪ বার আনুষ্ঠানিকভাবে আপত্তি জানিয়েছিলেন।
প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে যে, এই মতবিরোধগুলো এসআইআর-এর মূল বিষয়ের সাথে সম্পর্কিত ছিল— যার মধ্যে রয়েছে কীভাবে ভোটার তালিকায় নাম যোগ বা বাদ দেওয়া হচ্ছে, ভোটার নিবন্ধনের প্রক্রিয়ার পরিবর্তন এবং কোটি কোটি ভোটারের তথ্যভাণ্ডারে প্রবেশের সুযোগ।
তিন সদস্যের নির্বাচন কমিশনে এই ধরনের অভিযোগগুলো অত্যন্ত সংবেদনশীল, কারণ এখানে সিদ্ধান্ত সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে নেওয়া হয়। কুমার ব্যক্তিগতভাবে এই তদন্তের বিষয়ে কোনো প্রতিক্রিয়া জানাননি। তদন্তের পর প্রকাশিত এক বিবৃতিতে কমিশন প্রতিবেদনে উল্লিখিত মতবিরোধ অস্বীকার করেনি, তবে কোনো অভ্যন্তরীণ ফাটলের কথা প্রত্যাখ্যান করেছে এবং জানিয়েছে যে মতের পার্থক্য স্বাভাবিক আলোচনার অংশ এবং গত এক বছরের সিদ্ধান্তগুলো সর্বসম্মতভাবেই নেওয়া হয়েছিল।
পরবর্তীতে কুমার, সান্ধু এবং জোশী বৈঠক করেন এবং একটি যৌথ বিবৃতি প্রকাশ করেন। কমিশন তিন কমিশনারের একসাথে একটি ছবিও প্রকাশ করে। তবে এই প্রতিক্রিয়া বিতর্কটির অবসান ঘটাতে পারেনি। গণমাধ্যমের একাধিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিরোধী দলগুলো সংসদে কুমারের অপসারণের দাবিতে প্রস্তাব আনার প্রস্তুতি নিচ্ছে। যুব সংগঠন ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি) দেশব্যাপী আন্দোলনের হুমকি দিয়েছে। অন্যদিকে অন্ধ্রপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী এন চন্দ্রবাবু নাইডু নির্বাচন কমিশনের স্পষ্টীকরণকে স্বাগত জানিয়ে প্রতিষ্ঠানের সততার ওপর আস্থা প্রকাশ করেছেন।
কুমারের অতীত কর্মজীবন সম্পর্কে জানা যায়, তিনি উত্তরপ্রদেশে জন্মগ্রহণ করেন এবং আইআইটি কানপুরে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং নিয়ে পড়াশোনা করার পর ১৯৮৮ সালে আইএএস-এ যোগ দেন। কেরালা ক্যাডারে তাঁর প্রাথমিক কর্মজীবনে এর্নাকুলামের ডিস্ট্রিক্ট কালেক্টর হিসেবে কোচির ওয়াটারফ্রন্ট পুনর্বিকাশ অন্যতম একটি সফল প্রকল্প ছিল।
পরবর্তীতে ২০১৬ সালে তিনি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জম্মু ও কাশ্মীর বিভাগে যোগ দেন এবং ২০১৯ সালে জম্মু ও কাশ্মীর পুনর্গঠন বিলের খসড়া তৈরিতে জড়িত ছিলেন।
এছাড়া ২০১৯ সালে সুপ্রিম কোর্টের রায়ের পর অযোধ্যায় রাম মন্দির নির্মাণের তদারকি ট্রাস্ট গঠনে তিনি নেতৃত্ব দেন। প্রাক্তন সহকর্মীরা তাকে অত্যন্ত পরিশ্রমী, বিস্তারিত বিষয়ে গভীর মনোযোগী এবং চাপের মুখে শান্ত থাকার ক্ষমতার জন্য প্রশংসা করেছেন।
২০২৪ সালের জানুয়ারিতে অবসর নেওয়ার পর মার্চ মাসে তাকে নির্বাচন কমিশনার হিসেবে নিযুক্ত করা হয় এবং ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে তিনি প্রধান নির্বাচন কমিশনার হন। ২০২৩ সালের নতুন আইনের অধীনে তিনি নিযুক্ত প্রথম সিইসি, যে আইন নিয়ে বিরোধী দলগুলো আপত্তি তুলেছিল এবং বিষয়টি সুপ্রিম কোর্টে বিবেচনাধীন রয়েছে। দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনি প্রশাসনিক সংস্কার এবং ‘ইসি ২.০’ উদ্যোগের সূচনা করলেও এসআইআর সংক্রান্ত বিতর্কটিই তার মেয়াদকে বিশেষভাবে চিহ্নিত করেছে।
কমিশনের অভ্যন্তরে মতবিরোধ এবং এসআইআর সংশোধনের তদারকি নিয়ে প্রশ্ন উঠলেও কমিশন দাবি করেছে যে সিদ্ধান্তগুলো সর্বসম্মতিক্রমে নেওয়া হয়েছে এবং আগামীতে সভার এজেন্ডা ও কার্যবিবরণী পূর্বেই প্রকাশের নিয়ম চালু করা হচ্ছে। এই বিতর্ক কুমারের ভূমিকা ও ভারতের নির্বাচন কমিশনের মতো সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের ওপর নতুন করে আলোচনার সৃষ্টি করেছে।
সূত্র: বিবিসি
এস











