গত সোমবার তুরস্কের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়াসার গুলারের সঙ্গে এক ফোনালাপে এই প্রস্তাবটি উত্থাপন করেছেন ইরানের ভারপ্রাপ্ত প্রতিরক্ষামন্ত্রী ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সাইয়েদ মাজিদ ইবন রেজা।
ইরানের আধা-সরকারি বার্তা সংস্থা মেহের নিউজের প্রতিবেদনে বলা হয়, তেহরানের পক্ষ থেকে এই জোটের সম্ভাব্য সদস্য হিসেবে পাকিস্তান, তুরস্ক, সৌদি আরব এবং মিসরের মতো প্রধান প্রধান মুসলিম দেশগুলোর নাম জোরালোভাবে প্রস্তাব করা হয়েছে। ইরান, ওমান ও ইয়েমেন সংলগ্ন কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দুই সমুদ্রপথ—‘হরমুজ প্রণালি’ এবং ‘বাব আল-মান্দাব’ এর ওপর মুসলিম দেশগুলোর সম্মিলিত নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা এই পরিকল্পনার অন্যতম লক্ষ্য।
ইরানের ভারপ্রাপ্ত প্রতিরক্ষামন্ত্রী বলেছেন, ‘মধ্যপ্রাচ্যে বহিরাগত শক্তির- বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা দেশগুলোর সামরিক উপস্থিতি ও নির্ভরতা কমানোর কোনো বিকল্প নেই। কারণ সাম্প্রতিক যুদ্ধ দেখিয়ে দিয়েছে যে আঞ্চলিক নিরাপত্তা অবশ্যই এই অঞ্চলের দেশগুলোকেই নিশ্চিত করতে হবে’।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে এবং বন্ধুত্বপূর্ণ ও প্রতিবেশী দেশগুলোর অনুরোধে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি সমঝোতা স্মারকটি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। তবে ওয়াশিংটনের কথা ভঙ্গের দীর্ঘ ইতিহাস থাকায় অপর পক্ষের ওপর ইরানের কোনো আস্থা নেই। ফলে তাদের যেকোনো পদক্ষেপের যথাযথ জবাব দিতে পুরোপুরি থাকতে হবে।
গাজা, লেবানন, সিরিয়া ও ইরানে ইসরায়েলের সামরিক কর্মকাণ্ডেরও নিন্দা জানিয়ে ইরানের শীর্ষ প্রতিরক্ষা কর্মকর্তা বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন ইসরায়েলকে আরও সাহসী করে তুলেছে।
তিনি সতর্ক করে বলেন, হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে নতুন ফ্রন্ট খোলার বিষয়ে সাম্প্রতিক মার্কিন বিবৃতি পুরো অঞ্চলকে নতুন নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে এবং সিরিয়া ও লেবাননে তথাকথিত নিরাপত্তা অঞ্চল তৈরির ইসরায়েলি পরিকল্পনা একটি বৃহত্তর সংকটের পূর্বাভাস মাত্র।
এদিকে পাকিস্তান একমাত্র মুসলিম পরমাণু শক্তিধর দেশ হওয়ায় যেকোনো সম্ভাব্য ইসলামী প্রতিরক্ষা জোটে তাদের সামরিক সক্ষমতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পাকিস্তান ইতিমধ্যে সৌদি আরবের সাথে একটি দ্বিপাক্ষিক প্রতিরক্ষা চুক্তি করেছে, যাকে এই জোটের প্রাথমিক ভিত্তি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এছাড়াও পাকিস্তান নিজেও দীর্ঘদিন ধরে মুসলিম দেশগুলোর সমন্বয়ে একটি শক্তিশালী সামরিক জোট গড়ে তোলার জন্য পর্দার আড়ালে ও প্রকাশ্যে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালিয়ে আসছে। চলতি বছরের শুরু থেকেই তুরস্ক, সৌদি আরব এবং মিশরকে নিয়ে একটি চতুর্দেশীয় সামরিক ও কৌশলগত ব্লক গঠনের প্রক্রিয়া আরও জোরালো করে ইসলামাবাদ।
সম্প্রতি কাতারের দোহায় অনুষ্ঠিত শীর্ষ সম্মেলনে পাকিস্তানের উপ-প্রধানমন্ত্রী ইসহাক দার খোলাখুলিভাবেই মুসলিম দেশগুলোর জন্য ন্যাটোর মতো একটি যৌথ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার প্রস্তাব দেন।
পাকিস্তান এই জোটের মাধ্যমে দুটি বড় সুবিধা পেতে চায়—প্রথমত, সৌদি আরব ও কাতারের মতো ধনী দেশগুলো থেকে বড় অংকের অর্থনৈতিক ও প্রতিরক্ষা তহবিল নিশ্চিত করা; দ্বিতীয়ত, তুরস্কের উন্নত ড্রোন প্রযুক্তি এবং নিজেদের পারমাণবিক সক্ষমতাকে একত্রিত করে ভূ-রাজনীতিতে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করা।
তবে পাকিস্তানের এই দীর্ঘদিনের প্রচেষ্টায় মূল বাধা ছিল শিয়া-সংখ্যাগরিষ্ঠ ইরান এবং সুন্নি-সংখ্যাগরিষ্ঠ সৌদি আরবের মধ্যকার দীর্ঘদিনের আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং শীতল সম্পর্ক। বর্তমান পরিস্থিতিতে ইরান নিজেই যখন পাকিস্তানকে সাথে নিয়ে এই জোটে যোগ দেওয়ার আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব দিচ্ছে, তখন পাকিস্তানের দীর্ঘদিনের সেই ‘ইসলামী ন্যাটো’র স্বপ্ন এক নতুন ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণের দিকে মোড় নিল বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক সামরিক বিশ্লেষকরা।
সূত্র: মেহের নিউজ, মিডল ইস্ট মনিটর
এমএম