অজুর কোনো সময়সীমা নেই
অনেকের ধারণা, এক বা দুই ঘণ্টা পার হলে অজু এমনিতেই নষ্ট হয়ে যায়। কিন্তু ইসলামি শরিয়তে এমন কোনো বিধান নেই। মহান আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, ‘হে মুমিনগণ! তোমরা যখন সালাতের জন্য উঠবে, তখন তোমাদের মুখমণ্ডল এবং কনুই পর্যন্ত হস্তদ্বয় ধৌত করবে। আর মাথা মাসেহ করবে এবং পা গোড়ালি পর্যন্ত ধৌত করবে।’ (সুরা মায়েদা: ৬) অর্থাৎ, অজু বহাল থাকলে প্রতিটি সালাতের আগে নতুন করে অজু করা আবশ্যক নয়।
রাসুলুল্লাহ (স.)-এর আমল
রাসুলুল্লাহ (স.) অনেক সময় এক অজু দিয়েই একাধিক ওয়াক্তের সালাত আদায় করতেন। হজরত আনাস (রা.) বলেন, ‘রাসুলুল্লাহ (স.) অনেক সময় এক অজু দিয়ে একাধিক সালাত আদায় করতেন।’ (সহিহ বুখারি: ২১৪,২১৫)
এ বিষয়ে মক্কা বিজয়ের দিনের একটি ঘটনা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। সেদিন রাসুলুল্লাহ (স.) এক অজু দিয়ে কয়েক ওয়াক্ত সালাত আদায় করেন। তা দেখে হজরত ওমর (রা.) জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘হে ওমর, আমি ইচ্ছাকৃতভাবেই এটি করেছি।’ (সহিহ মুসলিম: ৫২৯)
এ হাদিস থেকে বোঝা যায়, অজু ভঙ্গ না হলে প্রতিটি সালাতের আগে নতুন করে অজু করা বাধ্যতামূলক নয়।
কখন নতুন অজু করা উত্তম?
অজু বহাল থাকলেও প্রতিটি সালাতের আগে নতুন করে অজু করা মোস্তাহাব। এতে পবিত্রতার প্রতি যত্ন প্রকাশ পায় এবং ইবাদতের প্রস্তুতিও নবায়ন হয়।
রাসুলুল্লাহ (স.) ইরশাদ করেন, ‘কেয়ামতের দিন আমার উম্মতকে এমন অবস্থায় ডাকা হবে যে, অজুর প্রভাবে তাদের হাত-পা ও মুখ উজ্জ্বল থাকবে। তাই তোমাদের যে এই উজ্জ্বলতা বাড়িয়ে নিতে পারে, সে যেন তা করে।’ (সহিহ বুখারি: ১৩৬)
এ কারণে অনেক সাহাবি (রা.) অজু অক্ষুণ্ণ থাকা সত্ত্বেও নতুন করে অজু করতেন।
কী কী কারণে অজু ভেঙে যায়?
অজু ভঙ্গের কারণ ৭টি। সেগুলো হলো-
১. পায়খানা ও পেশাবের রাস্তা দিয়ে কিছু বের হওয়া। যেমন বায়ু, পেশাব-পায়খানা, পোকা ইত্যাদি। (হেদায়া: ১/৭)
২. শরীরের কোনো স্থান থেকে রক্ত, পুঁজ, বা পানি বের হয়ে গড়িয়ে পড়া। (হেদায়া : ১/১০)
৩. মুখ ভরে বমি করা। (সুনানে ইবনে মাজাহ: ১২২১)
৪. থুথুর সঙ্গে রক্তের ভাগ সমান বা বেশি হওয়া (মুসান্নাফ ইবনে আবি শাইবা: ১৩৩০)
৫. চিৎ বা কাত হয়ে হেলান দিয়ে ঘুমানো। (মুসনাদে আহমদ: ২৩১৫; সুনানে আবু দাউদ: ২০২)
৬. পাগল, মাতাল ও বেহুঁশ হলে। (মুসান্নাফ আব্দুর রাজ্জাক: ৪৯৩; বুখারি: ৬৪৬; তিরমিজি: ৭২)
৭. নামাজে উচ্চৈঃস্বরে হাসি দিলে। (সুনানে দারা কুতনি: ৬১২)
এসবের কোনো একটি ঘটলে পুনরায় অজু করতে হবে।
অজু অবস্থায় থাকা কেন উত্তম?
অজু শুধু সালাতের জন্যই নয়, একজন মুসলিমের জন্য সবসময় পবিত্র থাকারও একটি উত্তম আমল। রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘কেবল মুমিন ব্যক্তিই যত্নসহ অজু করে।’ (সুনানে ইবনে মাজাহ: ২৭৭)
অজু বাহ্যিক পরিচ্ছন্নতার পাশাপাশি গুনাহ মাফেরও একটি মাধ্যম। রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘কোনো মুমিন অজুর সময় যখন মুখমণ্ডল ধৌত করে, তখন তার চোখের গুনাহ পানির সাথে বের হয়ে যায় এবং যখন সে দু’হাত ধৌত করে তখন তার দু’হাতের গুনাহ পানির সাথে ঝরে যায়। অতঃপর যখন সে পা দুটি ধৌত করে, তখন তার হাটার মাধ্যমে অর্জিত সব গুনাহ পানির সাথে ঝরে যায়, এমনকি সে যাবতীয় গুনাহ থেকে মুক্ত ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন হয়ে যায়।’ (সহিহ মুসলিম: ২৪৪)
ইসলামে অজুর জন্য ঘণ্টা বা দিনের কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা নেই। অজু ভঙ্গ না হওয়া পর্যন্ত একই অজু দিয়ে ইবাদত করা যায়। তবে সর্বদা অজু অবস্থায় থাকার চেষ্টা সুন্নাহসম্মত ও ফজিলতপূর্ণ। এটি একজন মুসলিমের পবিত্রতা ও ইবাদতের প্রতি যত্নের পরিচায়ক।
তথ্যসূত্র: সুরা মায়েদা: ৬; সহিহ বুখারি: ১৩৬, ২১৪; সহিহ মুসলিম: ৫২৯, ২৭৭, ৩৭৬; সুনানে ইবনে মাজাহ: ২৭৭
এমএম