বিহারের ক্ষমতাসীন জনতা দল-ইউনাইটেডের (জেডিইউ) জাতীয় কার্যকরী সভাপতি ও রাজ্যসভার সদস্য সঞ্জয় কুমার ঝা বর্তমান কাঠামোতে গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তি নবায়নের বিরোধিতা করেছেন। তাঁর দাবি, ১৯৯৬ সালে চুক্তি করার সময় বিহারের স্বার্থ যথেষ্ট গুরুত্ব পায়নি। গত তিন দশকের তথ্য পর্যালোচনা করে বিহারের পানি, কৃষি, সেচ ও বন্যা ব্যবস্থাপনার ওপর চুক্তির প্রভাব মূল্যায়নেরও দাবি জানিয়েছেন তিনি।

বিহারের আপত্তি কোথায়

বিহারের রাজনৈতিক নেতৃত্বের অভিযোগ, ফারাক্কা ব্যারাজ ও গঙ্গার পানি ব্যবস্থাপনার কারণে রাজ্যটি একদিকে শুষ্ক মৌসুমে পানির সংকটে পড়ে, অন্যদিকে বর্ষায় বন্যা ও নদীতে পলি জমার সমস্যার মুখোমুখি হয়।

গঙ্গার পানি বিহারের পানীয় জল, কৃষি, সেচ ও শিল্পের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তাই নতুন কোনো চুক্তি হলে রাজ্যের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ পানির চাহিদা বিবেচনায় নেওয়ার দাবি উঠেছে।

সঞ্জয় ঝার মতে, তিন দশক আগের পরিস্থিতির ভিত্তিতে বর্তমান সময়ের পানির চাহিদা নির্ধারণ যৌক্তিক নয়। জনসংখ্যা বৃদ্ধি, কৃষি ও শিল্পের সম্প্রসারণ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে গঙ্গা অববাহিকায় পানির চাহিদা ও প্রবাহের ধরন বদলেছে। তাই নতুন চুক্তির আগে অববাহিকার সংশ্লিষ্ট রাজ্যগুলোর পানির প্রয়োজন বৈজ্ঞানিকভাবে নিরূপণের দাবি জানিয়েছেন তিনি।

ফারাক্কায় পানি বণ্টনের নিয়ম

১৯৯৬ সালের চুক্তি অনুযায়ী, প্রতিবছর ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ মে পর্যন্ত শুষ্ক মৌসুমে ফারাক্কায় গঙ্গার প্রবাহের ভিত্তিতে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে পানি বণ্টন করা হয়।

প্রবাহ ৭০ হাজার কিউসেক বা তার কম হলে দুই দেশ সমান হারে পানি পায়। প্রবাহ ৭০ হাজার থেকে ৭৫ হাজার কিউসেকের মধ্যে থাকলে বাংলাদেশ পায় ৩৫ হাজার কিউসেক এবং বাকি পানি ভারত নেয়। আর প্রবাহ ৭৫ হাজার কিউসেক বা তার বেশি হলে ভারত পায় ৪০ হাজার কিউসেক এবং অবশিষ্ট পানি বাংলাদেশে যায়।

এ ছাড়া ১১ মার্চ থেকে ১০ মে পর্যন্ত বিশেষ ব্যবস্থায় নির্দিষ্ট ১০ দিনের পালাক্রমে দুই দেশকে ৩৫ হাজার কিউসেক করে পানি পাওয়ার নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশের জন্য শুষ্ক মৌসুমে এই পানি কৃষি, মৎস্য, নৌ চলাচল ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের পরিবেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

বন্যা ও পলি নিয়েও উদ্বেগ

বিহারের আপত্তি শুধু শুষ্ক মৌসুমের পানি বণ্টনেই সীমাবদ্ধ নয়। রাজ্যটির রাজনৈতিক নেতৃত্বের একাংশের দাবি, ফারাক্কা ব্যারাজের কারণে গঙ্গায় পলি জমার সমস্যা বেড়েছে। এতে নদীর পানি ধারণক্ষমতা কমে বর্ষাকালে বন্যার ঝুঁকি বাড়ছে।

সঞ্জয় ঝাও ফারাক্কা ও গঙ্গা ব্যবস্থাপনার সঙ্গে বিহারের পলি জমা, বন্যা ও পানির সংকটের বিষয়গুলো সামনে এনেছেন। নতুন ব্যবস্থায় সেচ, কৃষি, পানীয় জল, শিল্প ও বন্যা নিয়ন্ত্রণকে গুরুত্ব দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তিনি।

বিহারের দাবিতে দিল্লির সাড়া

বিহারের এই উদ্বেগ ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের কাছেও গুরুত্ব পাচ্ছে বলে রাজ্যটির নেতারা জানিয়েছেন। গত ২০ আগস্ট ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের সঙ্গে বৈঠক করেন বিহারের মুখ্যমন্ত্রী সম্রাট চৌধুরী, উপমুখ্যমন্ত্রী ও পানি সম্পদমন্ত্রী বিজয় কুমার চৌধুরী এবং জেডিইউ নেতা সঞ্জয় ঝা।

বৈঠকের পর বিজয় কুমার চৌধুরী জানান, গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তি নবায়নের আলোচনায় ফারাক্কা ও বিহারের দীর্ঘদিনের উদ্বেগগুলো তুলে ধরার বিষয়ে কেন্দ্র ইতিবাচক মনোভাব দেখিয়েছে।

বাংলাদেশের জন্য কেন গুরুত্বপূর্ণ

গঙ্গার নিম্ন অববাহিকায় অবস্থিত বাংলাদেশ শুষ্ক মৌসুমে এই নদীর পানির ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। গঙ্গার প্রবাহ কমে গেলে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কৃষি, মৎস্য, নৌ চলাচল ও পরিবেশে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

এ কারণে ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজ্য বিহারের পানির চাহিদা ও ফারাক্কা ব্যারাজ পরিচালনা নিয়ে কোনো নতুন সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে তার প্রভাব বাংলাদেশের ওপরও পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ফলে চুক্তির নবায়ন শুধু ভারতের অভ্যন্তরীণ পানি ব্যবস্থাপনার বিষয় নয়, বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ক্ষেত্রেও এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু।

পুরোনো তথ্য নিয়ে নতুন প্রশ্ন

১৯৯৬ সালের চুক্তি প্রণয়নের সময় ১৯৪৯ থেকে ১৯৮৮ সাল পর্যন্ত গঙ্গার প্রবাহসংক্রান্ত তথ্য বিবেচনায় নেওয়া হয়েছিল। এরপর জলবায়ু পরিবর্তন, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, খরা ও বন্যার প্রবণতা এবং জনসংখ্যা ও কৃষিতে পানির চাহিদায় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে।

তাই কয়েক দশক আগের তথ্যের ভিত্তিতে বর্তমান ও ভবিষ্যৎ পানি বণ্টন নির্ধারণ কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ভারতের একটি সংসদীয় কমিটির নথিতেও নতুন চুক্তির ক্ষেত্রে হালনাগাদ জলবিদ্যাগত তথ্য, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এবং সংশ্লিষ্ট রাজ্যগুলোর সঙ্গে পরামর্শের প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

নতুন চুক্তিতে বিহারের প্রত্যাশা

বিহারের দাবিগুলো মূলত তিনটি বিষয়ের ওপর কেন্দ্রীভূত- পানির ন্যায্য হিস্যা, বন্যা ও পলি ব্যবস্থাপনা এবং গঙ্গার পানির দীর্ঘমেয়াদি ব্যবহার।

রাজ্যটির রাজনৈতিক নেতৃত্ব চায়, নতুন চুক্তির আগে গঙ্গা অববাহিকার ভারতীয় রাজ্যগুলোর বর্তমান ও ভবিষ্যৎ পানির চাহিদা নির্ধারণ করা হোক। পাশাপাশি ফারাক্কা ব্যারাজের কারণে পলি জমা, নদীভাঙন, বন্যা ও নৌ চলাচলের ওপর প্রভাবও নতুন করে পর্যালোচনা করা হোক।

দিল্লির সামনে কঠিন সমীকরণ

গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তি নবায়নের ক্ষেত্রে ভারতকে একদিকে বাংলাদেশের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক, অন্যদিকে বিহারসহ গঙ্গা অববাহিকার অন্যান্য রাজ্যের পানির চাহিদা ও স্বার্থ বিবেচনায় নিতে হবে। ফলে নতুন চুক্তির আলোচনা শুধু পানি ভাগাভাগির হিসাবেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; এর সঙ্গে ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি, নদী ব্যবস্থাপনা ও আঞ্চলিক কূটনীতিও যুক্ত হবে।

অন্যদিকে বাংলাদেশের প্রধান স্বার্থ হলো শুষ্ক মৌসুমে গঙ্গার পানির একটি ন্যায্য, স্থিতিশীল ও পূর্বানুমানযোগ্য প্রবাহ নিশ্চিত করা।

চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে ঢাকা-দিল্লির আলোচনায় বিহারের দাবিগুলো কতটা প্রভাব ফেলবে এবং শেষ পর্যন্ত ১৯৯৬ সালের কাঠামোই নবায়ন হবে, নাকি নতুন কোনো পানি বণ্টন ব্যবস্থা তৈরি হবে- এখন সেদিকেই নজর দুই দেশের।

তথ্যসূত্র: নিউজ১৮, ভারতীয় ও সরকারি সূত্র।

এনএইচ